মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। লোহিত সাগরে সৌদি আরবের একটি তেলবাহী ট্যাংকারে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পাশাপাশি ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সময়ে ইরানে টানা ১২তম রাতের মতো মার্কিন হামলা, কুয়েতে ড্রোন হামলার দাবি এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ঘটনায় আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
হুথিদের হামলায় সৌদি তেলবাহী ট্যাংকার
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠী লোহিত সাগরে দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার দায় স্বীকার করেছে। এর মধ্যে সৌদি আরবের উপকূলের আল শুকাইক এলাকার দক্ষিণ-পশ্চিমে একটি ট্যাংকারে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পর সেটিতে আগুন ধরে যায় বলে জানানো হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস সেন্টারও একটি ট্যাংকারে হামলার তথ্য নিশ্চিত করেছে। হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক নৌযান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে লোহিত সাগরের রুটের গুরুত্ব বেড়েছে। ফলে এই অঞ্চলে ধারাবাহিক হামলা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে নতুন সংকট সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ইরানে টানা ১২তম রাতের মার্কিন হামলা
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ইরানের সামরিক সক্ষমতা লক্ষ্য করে নতুন দফা হামলা চালিয়েছে। অভিযানে সামুদ্রিক সক্ষমতা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সংরক্ষণাগার, উপকূলীয় নজরদারি কেন্দ্র এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
সেন্টকমের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় পাঁচ ঘণ্টাব্যাপী সর্বশেষ অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল আঞ্চলিক জলপথে বেসামরিক জাহাজ ও বাণিজ্যিক নৌযানের জন্য ইরানের হুমকি কমিয়ে আনা। জুলাইজুড়ে ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় একাধিক হামলা চালানো হয়েছে বলেও জানানো হয়।
এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, আহভাজ, রামশির, আন্দিমেশক, আবদানান ও চোভার এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে। তেহরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও সক্রিয় করা হয়। ইরাক সীমান্তসংলগ্ন শালামচেহ এলাকায় একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুইজন নিহত হওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
ট্রাম্পের নতুন হুমকি
ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সতর্ক করে বলেন, হরমুজ প্রণালিতে ইরান যদি কোনো জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র, রকেট, ড্রোন বা অন্য কোনো অস্ত্র দিয়ে হামলা চালায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের একটি সেতু অথবা বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস করবে।

পরে জর্জিয়ায় এক সমাবেশে তিনি বলেন, ইরান প্রবল চাপের মুখে থাকলেও এখনো কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে প্রস্তুত নয়। তবে তাঁর দাবি, খুব শিগগিরই তেহরান আলোচনায় রাজি হবে। বর্তমান মূল্যবৃদ্ধি সত্ত্বেও ভবিষ্যতে তেলের দাম কমবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ইরানের পাল্টা সতর্কবার্তা
ট্রাম্পের বক্তব্যের পর ইরান জানিয়ে দিয়েছে, দেশটির বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা হলে তার জবাব দেওয়া হবে। ইরানের যৌথ সামরিক কমান্ড বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র এমন পদক্ষেপ নিলে তারা অঞ্চলের তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করবে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাগচি বলেন, ইরান ‘চোখের বদলে চোখ’ নীতিতে প্রতিক্রিয়া জানাবে। একই সঙ্গে দেশটির সামরিক সূত্র জানিয়েছে, প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট জ্বালানি স্থাপনাসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
কুয়েতে ড্রোন হামলার দাবি

কুয়েত জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একাধিক ‘শত্রু ড্রোন’ প্রতিহত করেছে। দেশটির সেনাবাহিনী বলেছে, আকাশে শোনা বিস্ফোরণের শব্দ মূলত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে ড্রোন ধ্বংস করার ফল।
অন্যদিকে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড দাবি করেছে, তারা আলি আল সালেম ঘাঁটি, ক্যাম্প উদাইরি এবং একটি টেলিযোগাযোগ টাওয়ার লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। পৃথক বিবৃতিতে ক্যাম্প দোহা ও ক্যাম্প আরিফজানেও হামলার কথা বলা হয়েছে।
তেলের বাজারে চাপ
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৩ ডলারের ওপরে উঠে যায় এবং লেনদেন-পরবর্তী সময়ে তা সাময়িকভাবে ৯৫ ডলার অতিক্রম করে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের দামও ব্যারেলপ্রতি ৮৮ ডলারের ওপরে উঠে যায়, যা বাজারে নতুন উদ্বেগের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















