ভারতের রাজনীতিতে নতুন এক প্রতীক হাজির হয়েছে—‘ককরোচ’। সুপ্রিম কোর্টের এক বিচারপতির মন্তব্যে অপমানের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত শব্দটিকেই নিজেদের পরিচয়ে রূপ দিয়েছে একদল তরুণ। তারা নিজেদের বলছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। কিন্তু এই নামের চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, এই আন্দোলন কি কেবল ক্ষুব্ধ তরুণদের ক্ষণস্থায়ী প্রতিবাদ, নাকি এটি ভারতের রাজনৈতিক ভারসাম্যে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের সূচনা?
এটি শুধু একটি ছাত্র বা চাকরিপ্রার্থী আন্দোলনের গল্প নয়। এটি সেই প্রজন্মের গল্প, যারা নরেন্দ্র মোদির ক্ষমতায় আসার সময় ছিল শিশু, আর এখন কর্মসংস্থান, ভবিষ্যৎ ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজেদের রাজনৈতিক ভাষা তৈরি করছে। ফলে আন্দোলনের তাৎপর্য বোঝার জন্য শুধু স্লোগান নয়, এর সামাজিক ভিত্তি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং বিরোধী রাজনীতির সম্ভাবনাকেও একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
ভারতের গণতন্ত্রে জনঅসন্তোষ নতুন কিছু নয়। সময়ে সময়ে মূল্যস্ফীতি, দুর্নীতি, নিরাপত্তাহীনতা কিংবা প্রশাসনিক ব্যর্থতার বিরুদ্ধে জনরোষ তৈরি হয়েছে। কিন্তু সব প্রতিবাদ রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্ম দেয় না। কিছু আন্দোলন নির্বাচনী ফলাফলকে বদলে দেয়, আবার কিছু আন্দোলন প্রতিবাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।
২০১১ সালের অন্না হাজারের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন শেষ পর্যন্ত কংগ্রেসের বিরুদ্ধে জনমতকে সুসংগঠিত করেছিল। সেই পরিবেশ থেকেই বিজেপি এবং নরেন্দ্র মোদির উত্থান আরও শক্তিশালী হয়। অন্যদিকে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) বিরোধী আন্দোলন কিংবা কৃষক আন্দোলন ব্যাপক আলোড়ন তুললেও জাতীয় নির্বাচনে সেগুলোর প্রভাব সীমিত ছিল। কারণ ক্ষমতাসীন বিজেপি সেসব আন্দোলনকে নির্দিষ্ট সামাজিক বা আঞ্চলিক গোষ্ঠীর দাবি হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছিল।
এবারের পরিস্থিতি সেই দিক থেকে ভিন্ন।

বর্তমান আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে এমন এক তরুণ জনগোষ্ঠী, যাদের অসন্তোষের মূল উৎস প্রশ্নপত্র ফাঁস নয়, বরং ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা। কর্মসংস্থানের সংকট, আয়ের সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক অগ্রগতির পথ সংকুচিত হয়ে যাওয়ার অনুভূতি তাদের ক্ষোভকে বিস্তৃত করেছে। পরীক্ষা কেবল সেই জমে থাকা হতাশার একটি উপলক্ষ।
এই আন্দোলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর সামাজিক বিস্তার। এটি কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম, জাতি বা কৃষিভিত্তিক গোষ্ঠীর আন্দোলন নয়। বরং উত্তর ভারতের হিন্দি ভাষাভাষী, তরুণ এবং সামাজিকভাবে বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর মধ্যে এর প্রভাব বেশি। ফলে এটিকে আগের মতো সহজে ‘অন্যের আন্দোলন’ হিসেবে চিহ্নিত করা বিজেপির জন্য কঠিন।
এ কারণেই বিরোধী শিবিরের ভেতরে কৌশলগত বিতর্ক শুরু হয়েছে। সমাজবাদী পার্টি এবং বামপন্থীদের একটি অংশ মনে করে, এই আন্দোলনের সঙ্গে রাজনৈতিক সমন্বয় গড়ে তোলা গেলে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষকে আরও সংগঠিত করা সম্ভব। কিন্তু কংগ্রেসের ভেতরে মতভেদ রয়েছে। কেউ মনে করেন, আন্দোলনের পাশে দাঁড়ানো উচিত; আবার কেউ আশঙ্কা করছেন, অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কংগ্রেসকেই আরও দুর্বল করে দিতে পারে।
এই দ্বিধার পেছনে বাস্তব কারণ রয়েছে। ভারতের সাম্প্রতিক ইতিহাস দেখিয়েছে, তথাকথিত ‘অরাজনৈতিক’ আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সবসময় বিরোধী দলগুলোর উপকারে আসেনি। অনেক সময় সেগুলো বিদ্যমান বিরোধী শক্তিকেই দুর্বল করেছে এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তির জন্ম দিয়েছে।
তবু বর্তমান বাস্তবতায় বিজেপির সামনে নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। কারণ দলটি অতীতে যেসব কৌশলে আন্দোলন মোকাবিলা করেছে, সেগুলো এখন আগের মতো কার্যকর নাও হতে পারে। এই প্রজন্মের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, যোগাযোগের মাধ্যম এবং মানসিক গঠন ভিন্ন।

মোদির প্রথম ক্ষমতায় আসার সময় যারা শিশু ছিল, তারা আজ ভোটার। তাদের রাজনৈতিক স্মৃতি কংগ্রেসের দুর্বলতা নয়; বরং তারা বড় হয়েছে বিজেপির দীর্ঘ শাসন দেখেই। ফলে তাদের হতাশার লক্ষ্যও স্বাভাবিকভাবেই বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার।
এই প্রজন্মের রাজনৈতিক যোগাযোগও আলাদা। এক সময় হোয়াটসঅ্যাপভিত্তিক রাজনৈতিক প্রচারণা বিজেপির উত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। এখন ইনস্টাগ্রাম, শর্ট ভিডিও এবং ডিজিটাল সামাজিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নতুন ধরনের রাজনৈতিক ভাষা তৈরি হচ্ছে। সংগঠন দুর্বল হলেও বার্তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, যা প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে নতুন জনমত গঠনের সুযোগ সৃষ্টি করছে।
তবে এটিও মনে রাখতে হবে, কোনো আন্দোলন একা ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিতে পারে না। জনঅসন্তোষকে টেকসই রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে সংগঠন, নেতৃত্ব এবং সুস্পষ্ট রাজনৈতিক কর্মসূচি অপরিহার্য। সিজেপির মতো প্রতিবাদী প্ল্যাটফর্মের সেই সক্ষমতা এখনো প্রমাণিত নয়।

সেখানেই বিরোধী দলগুলোর ভূমিকা নির্ধারক হয়ে ওঠে। তারা যদি আন্দোলনের শক্তিকে নিজেদের সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করতে গিয়ে বিভ্রান্ত করে, তাহলে সুযোগ হাতছাড়া হবে। আবার যদি জনগণের বাস্তব সমস্যাকে রাজনৈতিক বিকল্পে রূপ দিতে পারে, তাহলে ভারতের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হওয়া অসম্ভব নয়।
বিজেপির অবস্থানও সহজ নয়। দলটি জানে, আন্দোলন যদি নির্দিষ্ট কোনো সম্প্রদায় বা অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা সামাল দেওয়া সম্ভব। কিন্তু এই ক্ষোভ যদি বিভিন্ন সামাজিক স্তরে ছড়িয়ে পড়ে এবং বৃহত্তর রাজনৈতিক ভাষা পায়, তাহলে তা ক্ষমতাসীনদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
ভারতের রাজনীতির ইতিহাসে অরাজনৈতিক জনআন্দোলন বহুবার ক্ষমতার পালাবদলের পথ তৈরি করেছে। তবে সেগুলোর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শেষ পর্যন্ত লাভবান হয়েছে বিজেপি। এবার প্রথমবারের মতো একই ধরনের সামাজিক শক্তি বিজেপিকেই চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত কত দূর যাবে, তা এখনই বলা সম্ভব নয়। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—এটি শুধু ক্ষুব্ধ তরুণদের প্রতিবাদ নয়, বরং ভারতের পরিবর্তিত সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন। এই বাস্তবতা বিজেপির জন্য যেমন সতর্কবার্তা, তেমনি বিরোধীদের জন্যও একটি কঠিন পরীক্ষা। কারণ আন্দোলনের শক্তি নিজে থেকে রাজনৈতিক পরিবর্তন আনে না; সেই শক্তিকে কে, কীভাবে এবং কতটা দক্ষতার সঙ্গে রাজনৈতিক রূপ দিতে পারে, শেষ পর্যন্ত সেটিই ইতিহাস নির্ধারণ করে।
ভার্গিস কে. জর্জ 


















