দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কূটনীতিতে নতুন এক বাস্তবতা দ্রুত স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলকারী মিন অং হ্লাইং, যিনি দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কার্যত একঘরে ছিলেন, এখন আবার আঞ্চলিক কূটনীতির কেন্দ্রে ফিরে আসার পথে। বিতর্কিত নির্বাচনের পর নিজেকে বেসামরিক রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা, ভারত ও চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক, লাওস সফর এবং থাইল্যান্ডের সম্ভাব্য আমন্ত্রণ—সব মিলিয়ে তিনি এমন একটি রাজনৈতিক বার্তা দিতে চাইছেন যে, মিয়ানমারের সামরিক শাসন এখন নতুন স্বাভাবিক বাস্তবতা।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বাস্তবতাকে দ্রুত মেনে নেওয়া কি আসিয়ানের জন্য কৌশলগত প্রজ্ঞার পরিচয় হবে, নাকি তা সংগঠনটির বিশ্বাসযোগ্যতাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে?
মিয়ানমার সংকটে আসিয়ানের অবস্থানের ভিত্তি ছিল ২০২১ সালের ‘ফাইভ-পয়েন্ট কনসেনসাস’। সহিংসতা বন্ধ, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সংলাপ, মানবিক সহায়তা এবং আসিয়ানের বিশেষ দূতের মধ্যস্থতার মতো মৌলিক প্রতিশ্রুতির ওপর দাঁড়িয়েছিল এই উদ্যোগ। কিন্তু সেই চুক্তিতে সম্মতি দেওয়ার পরও মিন অং হ্লাইং কার্যত এর কোনো গুরুত্বপূর্ণ দিক বাস্তবায়ন করেননি। বরং দেশজুড়ে প্রতিরোধ আন্দোলন দমনে সামরিক অভিযান আরও বিস্তৃত হয়েছে, হাজার হাজার মানুষ নিহত ও বাস্তুচ্যুত হয়েছে, আর গৃহযুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিয়েছে।
এই অভিজ্ঞতা আসিয়ানের সামনে একটি মৌলিক শিক্ষা রেখে গেছে। কোনো প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন ছাড়াই যদি এখন আবার সামরিক নেতৃত্বকে পূর্ণ স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আঞ্চলিক কূটনীতিতে আসিয়ানের নিজস্ব নীতিগত অবস্থান কতটা গুরুত্ব পাবে, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠবে।
অন্যদিকে, মিয়ানমারের প্রতিরোধ আন্দোলনের ব্যর্থতাও বর্তমান পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন এবং পিপলস ডিফেন্স ফোর্স (পিডিএফ) একাধিক ফ্রন্টে উল্লেখযোগ্য সামরিক অগ্রগতি অর্জন করেছিল। বিশেষ করে ২০২৩ সালের পর বিভিন্ন অভিযানে জান্তা বাহিনী বড় ধরনের চাপের মুখে পড়ে।
কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের সাফল্য রাজনৈতিক বিকল্পে রূপ নিতে পারেনি। ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট (এনইউজি) প্রতিরোধ আন্দোলনের কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব হিসেবে ঐক্যবদ্ধ ও কার্যকর ভূমিকা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়। সামরিক অগ্রযাত্রার সঙ্গে সমান্তরালে একটি সুসংগঠিত প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি না হওয়ায় প্রতিরোধ আন্দোলন সেই মুহূর্তকে কাজে লাগাতে পারেনি, যখন জান্তা সরকার সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে ছিল।
এই রাজনৈতিক দুর্বলতাই বহিরাগত শক্তিগুলোর হিসাব বদলে দেয়।
চীন শুরু থেকেই দ্বিমুখী কৌশল অনুসরণ করেছিল। একদিকে জান্তা সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা, অন্যদিকে সীমান্তবর্তী জাতিগত গোষ্ঠী এবং এনইউজির সঙ্গেও সম্পর্ক রক্ষা—বেইজিং মূলত নিজের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দিয়েছিল। সীমান্ত নিরাপত্তা, জ্বালানি করিডর, বন্দর, খনিজ সম্পদ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা—এসব কারণে তারা কোনো পক্ষের ওপর সম্পূর্ণ বাজি ধরতে চায়নি।
কিন্তু যখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে প্রতিরোধ আন্দোলন দ্রুত সামরিক সরকারকে উৎখাত করতে পারবে না, তখন চীনের অবস্থান পরিবর্তিত হয়। সীমান্তবর্তী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি, জান্তা বাহিনীকে পুনর্গঠনের সুযোগ এবং স্থিতিশীলতার নামে সামরিক সরকারের জন্য কৌশলগত অবকাশ তৈরি—এসবের ফলে যুদ্ধের ভারসাম্য বদলে যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় রাশিয়ার সামরিক সহায়তা, বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগ এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর জান্তার নিয়ন্ত্রণ।
ফলে যে সরকার কয়েক বছর আগে টিকে থাকার লড়াই করছিল, সেটিই এখন আবার রাজনৈতিক উদ্যোগ নিজের হাতে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে।
বিতর্কিত নির্বাচন এই কৌশলেরই অংশ। নির্বাচনটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্য না হলেও এর মূল উদ্দেশ্য ছিল গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা নয়; বরং ক্ষমতাকে নতুন সাংবিধানিক রূপ দেওয়া। সামরিক পোশাক ছেড়ে রাষ্ট্রপতির পোশাক পরা মূলত রাজনৈতিক বৈধতার একটি নতুন আবরণ তৈরি করার প্রচেষ্টা। এর মাধ্যমে মিন অং হ্লাইং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বোঝাতে চাইছেন যে তিনি আর কেবল অভ্যুত্থানের নেতা নন, বরং একটি নির্বাচিত সরকারের প্রধান।
এই পরিবর্তিত বাস্তবতাকে সামনে রেখে ভারত, চীন, লাওস কিংবা থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলো যদি ধীরে ধীরে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে, তবে পরবর্তী লক্ষ্য হবে আসিয়ানের পূর্ণাঙ্গ স্বীকৃতি, এরপর জাতিসংঘে মিয়ানমারের প্রতিনিধিত্ব পুনর্দখলের চেষ্টা। অর্থাৎ সামরিক টিকে থাকাকে ধাপে ধাপে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বৈধতায় রূপান্তর করাই এখন জান্তা নেতৃত্বের কৌশল।
এখানেই আসিয়ানের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা।
একদিকে, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অনেকেই বাস্তববাদী কূটনীতির পক্ষে। তাদের যুক্তি, প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে অনির্দিষ্টকাল বিচ্ছিন্ন রেখে সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। অন্যদিকে, কোনো দৃশ্যমান রাজনৈতিক ছাড়, সহিংসতা হ্রাস বা অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপ ছাড়াই পুনরায় সম্পৃক্ত হওয়া আসিয়ানের ঘোষিত নীতিকেই অকার্যকর করে তুলতে পারে।
বিশেষত অং সান সু চির ভবিষ্যৎ, রাজনৈতিক বন্দিদের নিরাপত্তা এবং দীর্ঘ গৃহযুদ্ধে নিহত হাজারো মানুষের প্রশ্ন এখনো অনিরসিত। এসব বিষয় উপেক্ষা করে যদি জান্তা সরকারকে দ্রুত স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তাহলে আসিয়ানের নৈতিক অবস্থান দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি পশ্চিমা অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কেও নতুন জটিলতা তৈরি হতে পারে। ভবিষ্যতের আঞ্চলিক সম্মেলনগুলোর গ্রহণযোগ্যতাও তখন প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
অন্যদিকে প্রতিরোধ আন্দোলনের সামনেও সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। যদি তারা রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক পুনর্গঠন করতে না পারে, নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতাকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করতে না পারে, তবে আন্তর্জাতিক পরিসরে তাদের অবস্থান আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। কেবল সামরিক প্রতিরোধ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রক্ষমতার বিকল্প তৈরি করা সম্ভব নয়।
সব মিলিয়ে আসিয়ানের সামনে বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কোনো এক সময় মিয়ানমারের সঙ্গে পুনরায় সম্পৃক্ত হওয়া হয়তো অনিবার্য হবে। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া যদি শর্তহীন, অকাল এবং রাজনৈতিক জবাবদিহিতা ছাড়াই শুরু হয়, তাহলে তা শুধু মিন অং হ্লাইংয়ের অবস্থানকেই শক্তিশালী করবে না; বরং আসিয়ানের নিজস্ব বিশ্বাসযোগ্যতা, আঞ্চলিক নেতৃত্ব এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার দাবিকেও দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল করে দিতে পারে।
থিতিনান পংসুধিরাক 


















