ডেঙ্গুর ভয়াবহ বিস্তার ঠেকাতে এবার নতুন কৌশল নিয়েছে শ্রীলঙ্কা। দেশটির বিভিন্ন এলাকায় ভবনের ছাদ, নির্মাণাধীন স্থাপনা ও অন্য সম্ভাব্য মশার প্রজননস্থল শনাক্ত করতে ব্যবহার করা হচ্ছে সামরিক ড্রোন। চলতি বছরে ডেঙ্গুতে দেশটিতে ৫৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আক্রান্তের সংখ্যা ৭৭ হাজার ছাড়িয়েছে। শুধু চলতি মাসেই মোট আক্রান্তের এক-চতুর্থাংশের বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে।
কেন বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ
ডেঙ্গু একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা এডিস মশার কামড়ে মানুষের শরীরে ছড়ায়। জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে এই মশা দ্রুত বংশবিস্তার করে। ফুলের টবের নিচের পাত্র, বালতি, ভাঙা পাত্র কিংবা ছাদের জমে থাকা পানিই হয়ে ওঠে তাদের নিরাপদ প্রজননক্ষেত্র।
শ্রীলঙ্কার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের মতে, গত বছরের শেষ দিকে ঘূর্ণিঝড়ের পর বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা আবর্জনা ও পানির কারণে মশার বিস্তার অনেক বেড়ে গেছে। এর ফলে সংক্রমণও দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে।
ড্রোন, অভিযান ও জরিমানা
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকার সেনাবাহিনীকে ড্রোন ব্যবহারের দায়িত্ব দিয়েছে। একই সঙ্গে পুলিশ ও স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সম্ভাব্য মশার প্রজননস্থল খুঁজে দেখছেন।
চলতি মাসেই প্রায় ১১ হাজার মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা হয়েছে। এছাড়া যেসব স্থানে এমন পরিবেশ পাওয়া গেছে, সেসবের মধ্যে চার হাজারের বেশি স্থাপনার বিরুদ্ধে জরিমানার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ডেঙ্গুর লক্ষণ ও ঝুঁকি
অনেকের শরীরে ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা না দিলেও সাধারণভাবে উচ্চ জ্বর, মাথাব্যথা, শরীর ও গাঁটে ব্যথা, বমিভাব এবং ত্বকে র্যাশ দেখা দিতে পারে। অধিকাংশ রোগী এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে সুস্থ হয়ে ওঠেন।
তবে গুরুতর ডেঙ্গু হলে শরীরের ভেতরে রক্তক্ষরণ, শকের মতো জটিলতা এমনকি মৃত্যুও ঘটতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু দ্বিতীয়বার হলে গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। কারণ ডেঙ্গু ভাইরাসের একাধিক ধরন রয়েছে এবং এক ধরনের সংক্রমণ অন্য ধরনের বিরুদ্ধে পূর্ণ সুরক্ষা দেয় না।
চিকিৎসা ও প্রতিরোধ
ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট কোনো সর্বজনীন প্রতিষেধক এখনো নেই। চিকিৎসায় মূলত জ্বর ও ব্যথা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি রোগীর অবস্থার নিবিড় পর্যবেক্ষণ করা হয়। গুরুতর রোগীদের হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া প্রয়োজন হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাড়ির আশপাশে কোথাও পানি জমতে না দেওয়াই ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং সম্ভাব্য প্রজননস্থল ধ্বংস করলে সংক্রমণের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
বিশ্বজুড়ে কেন বাড়ছে ডেঙ্গু
উষ্ণতা বৃদ্ধি, দীর্ঘস্থায়ী বর্ষা এবং জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে এডিস মশার বিস্তারের এলাকা ক্রমেই বাড়ছে। আগে যেখানে ডেঙ্গু প্রধানত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল, এখন ইউরোপ ও ভূমধ্যসাগরীয় এলাকাতেও সংক্রমণ বাড়তে শুরু করেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, গত কয়েক দশকে ডেঙ্গুর প্রকোপ বহুগুণ বেড়েছে এবং বর্তমানে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক মানুষ কোনো না কোনোভাবে এই রোগের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। ফলে ডেঙ্গু এখন শুধু একটি দেশের নয়, বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।
ডেঙ্গুর ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবে শ্রীলঙ্কার ড্রোন অভিযান নতুন নজির। মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও জনসচেতনতাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর পথ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















