মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে নিরাপত্তা সংকট এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচলে বিঘ্নের কারণে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ আরও চাপে পড়েছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান অপরিশোধিত তেলের স্পট প্রিমিয়াম দুই মাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন ও ভারতের শোধনাগারগুলো বিকল্প উৎস থেকে তেল সংগ্রহের চেষ্টা জোরদার করেছে।
বিশেষ করে লোহিত সাগরে দুটি তেলবাহী জাহাজে হামলা এবং হরমুজ প্রণালিতে চলাচল ধীর হয়ে যাওয়ায় সৌদি আরবের কিছু তেলবাহী জাহাজকে আফ্রিকার দক্ষিণ দিক ঘুরে দীর্ঘ পথ ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে সরবরাহে বিলম্ব এবং পরিবহন ব্যয়—দুটিই বেড়েছে।
সরবরাহ সংকটে দ্রুত বাড়ছে প্রিমিয়াম
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের দুবাই বেঞ্চমার্ক অপরিশোধিত তেলের স্পট প্রিমিয়াম বৃহস্পতিবার বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১২ দশমিক ৭৪ ডলারে পৌঁছেছে। একই দিনে ওমান অপরিশোধিত তেলের প্রিমিয়াম বেড়ে হয়েছে ১২ দশমিক ৬২ ডলার। উভয় ক্ষেত্রেই এটি মে মাসের শেষ দিকের পর সর্বোচ্চ অবস্থান।
জ্বালানি বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান এনার্জি অ্যাসপেক্টস জানিয়েছে, লোহিত সাগরে জাহাজে হামলার কারণে আরও বেশি কার্গো বিকল্প পথে ঘুরে যেতে পারে। একই সঙ্গে বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ায় মধ্যপ্রাচ্যের তেলের প্রিমিয়াম আরও বাড়তে পারে।
ব্রেন্ট-দুবাই ব্যবধানেও পরিবর্তন
বাজারের তথ্য অনুযায়ী, ব্রেন্টের তুলনায় দুবাই অপরিশোধিত তেলের প্রিমিয়াম ব্যারেলপ্রতি ১৩ দশমিক ২২ ডলারে পৌঁছেছে, যা মে মাসের শুরুর পর সর্বোচ্চ।
অন্যদিকে আবুধাবির প্রধান মুরবান অপরিশোধিত তেলের প্রিমিয়াম বেড়ে ১৯ দশমিক ৪ ডলারে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ সংকটের পাশাপাশি কৃষ্ণ সাগর অঞ্চলেও জাহাজ চলাচল ও তেল রপ্তানিতে সমস্যা দেখা দেওয়ায় এই মূল্যবৃদ্ধি আরও ত্বরান্বিত হয়েছে।
কাজাখস্তানও জানিয়েছে, সন্দেহভাজন ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার কারণে কৃষ্ণ সাগরে তাদের প্রধান রপ্তানি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশটি তেল উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছে।

এশিয়ার ক্রেতাদের বিকল্প উৎসের খোঁজ
নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়তে থাকায় সৌদি আরব ভূমধ্যসাগরের মিশরের সিদি কেরির বন্দর থেকে অতিরিক্ত তেলের কার্গো সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে বলে একাধিক বাণিজ্যিক সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে এশিয়ার বিভিন্ন শোধনাগার ওই বন্দর থেকে তেল সংগ্রহ এবং জাহাজ বুকিংয়ের চেষ্টা করছে। দক্ষিণ কোরিয়ার বৃহত্তম শোধনাগার এসকে এনার্জি আগস্টের ১৮ থেকে ২০ তারিখের মধ্যে সিদি কেরির বন্দর থেকে ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উলসানে পরিবহনের জন্য একটি ভিএলসিসি সুপারট্যাঙ্কার ভাড়া করেছে। এ জন্য পরিবহন ব্যয় ধরা হয়েছে এককালীন ১ কোটি ৮৫ লাখ ডলার।
বাজারে বাড়ছে প্রতিযোগিতা
বাজারসংশ্লিষ্ট এক ব্যবসায়ীর ভাষ্য, সরবরাহ নিশ্চিত করতে এখন ক্রেতাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। বিশেষ করে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার শোধনাগারগুলো দ্রুত নতুন কার্গো সংগ্রহে নেমেছে। একই সঙ্গে উত্তর এশিয়ার অনেক ক্রেতা আটলান্টিক অববাহিকার তেলের দিকেও নজর দিচ্ছে।
অন্যদিকে চীনের দুটি বড় শোধনাগার রাশিয়ার কোজমিনো বন্দর থেকে সেপ্টেম্বরে লোড হওয়ার অধিকাংশ ইএসপিও ব্লেন্ড তেল কিনে নিয়েছে। ভারতীয় শোধনাগারগুলিও সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার তেল আমদানি বাড়িয়েছে, যা বিকল্প সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রচেষ্টারই অংশ।
মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে চলাচলের অনিশ্চয়তা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন করে চাপ সৃষ্টি করেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে এশিয়ার তেল আমদানিকারক দেশগুলোর ক্রয় কৌশল ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায়।
মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সংকট ও লোহিত সাগরে হামলার প্রভাবে অপরিশোধিত তেলের প্রিমিয়াম দুই মাসের সর্বোচ্চে, বিকল্প উৎসে ঝুঁকছে এশিয়ার শোধনাগারগুলো।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















