০৯:৫৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬
হাফিজ উদ্দিন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিলেন, পদত্যাগ করলেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন এশিয়ান গেমসে সরাসরি কোয়ার্টার ফাইনালে বাংলাদেশ, টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের সূচি ঘোষণা বাংলায় ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে নতুন বিতর্ক, মধ্যপন্থার বার্তা দিল প্রেসবাইটেরিয়ান চার্চ কিশোরগঞ্জে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় স্কুলছাত্র ও মাইক্রোবাসচালক নিহত, আহত ৬ মতিঝিল বিএনপির সভাপতিকে লাঞ্ছিত করা ও ইউনূসের দৈত্যরা ইরানের দ্রুত পুনর্গঠনে নতুন উদ্বেগ, যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত প্রশ্নফাঁস রোধে আরও কঠোর আইন আনছে ভারত, দ্রুত বিচার আদালতের ঘোষণা মোদির চার্লি এক্সসির নতুন অ্যালবাম ঘিরে আলোড়ন, নাচের সুর ছেড়ে নতুন পথে জনপ্রিয় তারকা লোহিত সাগরে হুতিদের নতুন তৎপরতা, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও তেলের বাজারে বাড়ছে অনিশ্চয়তা সৌদি পরমাণু চুক্তিতে নতুন শর্ত ট্রাম্পের, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক না হলে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

ক্ষমতার বলয়ে আটকে পড়া পরিবর্তনের রাজনীতি

নেপালের রাজনীতিতে সাম্প্রতিক পরিবর্তন ছিল এক অর্থে প্রচলিত দলীয় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ভোটারদের প্রতিবাদ। নতুন নেতৃত্ব, নতুন ভাষা এবং প্রযুক্তিনির্ভর রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতিশ্রুতি বহু নাগরিকের কাছে পুরোনো ক্ষমতার কাঠামোর বিকল্প হিসেবে ধরা দিয়েছিল। কিন্তু সরকার গঠনের মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই যে সংকট সামনে এসেছে, তা কেবল ব্যক্তিগত মতবিরোধের নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার ধরন, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা সরকারকে শক্তি দেয়, কিন্তু সেই শক্তির কার্যকারিতা নির্ভর করে অভ্যন্তরীণ সমন্বয়, নীতিগত ঐকমত্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার ওপর। যখন প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভা, সংসদীয় দল এবং দলীয় নেতৃত্ব একই রাজনৈতিক ছাতার নিচে থেকেও ভিন্ন ভিন্ন দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে, তখন প্রশাসনিক সক্ষমতার চেয়ে বিভ্রান্তিই বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

নেপালের বর্তমান পরিস্থিতি সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন। বাজেট প্রণয়ন থেকে করনীতি—গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোকে ঘিরে প্রকাশ্য মতপার্থক্য দেখিয়েছে যে সরকারের ভেতরে নীতিনির্ধারণের কোনো সুসংহত প্রক্রিয়া গড়ে ওঠেনি। বিশেষ করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে আরোপিত কর নিয়ে বিতর্ক এবং পরে জনরোষের মুখে তা প্রত্যাহারের ঘটনা শুধু নীতিগত দুর্বলতাই প্রকাশ করেনি, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্র কোথায়—সে প্রশ্নও সামনে এনেছে। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সরাসরি হস্তক্ষেপ প্রশাসনিক শৃঙ্খলা সম্পর্কে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

এই ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ এগুলো এমন একটি প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়, যেখানে নির্বাচিত মন্ত্রীদের চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টারা রাষ্ট্র পরিচালনায় বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠছেন। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উপদেষ্টাদের ভূমিকা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তারা কখনোই সাংবিধানিকভাবে জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিকল্প হতে পারেন না। যদি সিদ্ধান্তের উৎস ধীরে ধীরে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের বাইরে সরে যায়, তাহলে ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হওয়া অবশ্যম্ভাবী।

এ ধরনের প্রবণতা নতুন নয়। দক্ষিণ এশিয়ার বহু দেশে দেখা গেছে, ক্ষমতায় আসার আগে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া রাজনৈতিক শক্তিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সীমিত কয়েকজন বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে ঘিরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি গড়ে তোলে। ফলাফল হয় এক ধরনের ‘ইকো চেম্বার’, যেখানে ভিন্নমতকে সমালোচনা নয়, বরং প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা হয়। এতে নীতিগত ভুল সংশোধনের সুযোগ কমে যায় এবং রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা বাড়তে থাকে।

গণতন্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হলো মতবিরোধকে গ্রহণ করার ক্ষমতা। একটি কার্যকর সরকার জানে যে সমালোচনা সব সময় দুর্বলতার লক্ষণ নয়; অনেক সময় সেটিই নীতিকে আরও বাস্তবসম্মত করে তোলে। কিন্তু যদি বিরোধিতা এড়িয়ে যাওয়া, প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনা পাশ কাটানো কিংবা প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অতিক্রম করে সিদ্ধান্ত নেওয়া অভ্যাসে পরিণত হয়, তাহলে তা ধীরে ধীরে কর্তৃত্ববাদী মানসিকতার জন্ম দেয়। এই পরিবর্তন অনেক সময় আনুষ্ঠানিকভাবে নয়, বরং প্রশাসনিক আচরণের মধ্য দিয়েই দৃশ্যমান হয়।

Making Sense of Nepal's Pro-monarchy Protests – The Diplomat

সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়েও একই ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। ভূমিহীনদের উচ্ছেদ, ট্রাফিক জরিমানার বড় বৃদ্ধি, তরুণ আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশের কঠোরতা কিংবা মূলধারার সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে সংঘাত—এসব বিষয় নিয়ে সরকারের ভেতর থেকেও অস্বস্তির ইঙ্গিত মিলছে। অর্থাৎ শুধু বিরোধী পক্ষ নয়, ক্ষমতাসীন দলের প্রতিনিধিদের মধ্যেও যোগাযোগের ঘাটতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণের অভাব নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে।

রাজনৈতিক দল হিসেবে নতুন শক্তিগুলোর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো তারা কি পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে সত্যিই বেরিয়ে আসতে পারবে। নতুন মুখ, নতুন স্লোগান কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় উপস্থিতি এক ধরনের রাজনৈতিক পুঁজি তৈরি করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সরকারকে টিকিয়ে রাখে কার্যকর প্রতিষ্ঠান, নীতিগত স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি। যদি একই সঙ্গে দলের ভেতরে যোগাযোগ দুর্বল হয় এবং সিদ্ধান্ত কয়েকজন ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, তাহলে সেই রাজনৈতিক পুঁজি দ্রুত ক্ষয় হতে শুরু করে।

অবশ্য এই মুহূর্তে ক্ষমতাসীন দলের ভাঙনের আশঙ্কা খুব প্রবল নয়। রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলীয় নেতৃত্ব ও সরকারের প্রধান এখনও একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু নির্ভরশীলতা সব সময় স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা দেয় না। ব্যক্তিগত সম্পর্ক দিয়ে সাময়িক সংকট সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও, প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যার সমাধান কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমেই সম্ভব।

নেপালের রাজনৈতিক ইতিহাস দেখিয়েছে, সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও বহু সরকার অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, ব্যক্তিগত অহমিকা এবং নেতৃত্বের সংঘাতের কারণে পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেনি। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার বদলে যদি নতুন রাজনৈতিক শক্তিও একই পথ অনুসরণ করে, তাহলে তাদের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা দ্রুত হতাশায় পরিণত হবে।

বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের সমর্থনই ছিল এই রাজনৈতিক উত্থানের প্রধান ভিত্তি। তারা শুধু দ্রুত সিদ্ধান্ত নয়, ভিন্ন ধরনের শাসনব্যবস্থা দেখতে চেয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় উপস্থিতি এবং শক্তিশালী রাজনৈতিক বর্ণনা কিছু সময়ের জন্য জনসমর্থন ধরে রাখতে পারে, কিন্তু বাস্তব জীবনের জবাবদিহি, প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা এবং কার্যকর প্রশাসনের বিকল্প হতে পারে না।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি কোনো ব্যক্তি বা একটি সরকারের নয়। এটি সেই মৌলিক নীতির প্রশ্ন, যেখানে গণতন্ত্র ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্বের ওপর নয়, বরং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, উন্মুক্ত বিতর্ক এবং অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি তখনই বিশ্বাসযোগ্য হয়, যখন ক্ষমতায় গিয়েও সেই প্রতিশ্রুতির রাজনৈতিক সংস্কৃতি অক্ষুণ্ন রাখা যায়। নচেৎ নতুন নেতৃত্বও একসময় পুরোনো ব্যবস্থারই আরেকটি সংস্করণ হয়ে ওঠে।

জনপ্রিয় সংবাদ

হাফিজ উদ্দিন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিলেন, পদত্যাগ করলেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন

ক্ষমতার বলয়ে আটকে পড়া পরিবর্তনের রাজনীতি

০৮:৩১:২৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬

নেপালের রাজনীতিতে সাম্প্রতিক পরিবর্তন ছিল এক অর্থে প্রচলিত দলীয় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ভোটারদের প্রতিবাদ। নতুন নেতৃত্ব, নতুন ভাষা এবং প্রযুক্তিনির্ভর রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতিশ্রুতি বহু নাগরিকের কাছে পুরোনো ক্ষমতার কাঠামোর বিকল্প হিসেবে ধরা দিয়েছিল। কিন্তু সরকার গঠনের মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই যে সংকট সামনে এসেছে, তা কেবল ব্যক্তিগত মতবিরোধের নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার ধরন, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা সরকারকে শক্তি দেয়, কিন্তু সেই শক্তির কার্যকারিতা নির্ভর করে অভ্যন্তরীণ সমন্বয়, নীতিগত ঐকমত্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার ওপর। যখন প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভা, সংসদীয় দল এবং দলীয় নেতৃত্ব একই রাজনৈতিক ছাতার নিচে থেকেও ভিন্ন ভিন্ন দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে, তখন প্রশাসনিক সক্ষমতার চেয়ে বিভ্রান্তিই বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

নেপালের বর্তমান পরিস্থিতি সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন। বাজেট প্রণয়ন থেকে করনীতি—গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোকে ঘিরে প্রকাশ্য মতপার্থক্য দেখিয়েছে যে সরকারের ভেতরে নীতিনির্ধারণের কোনো সুসংহত প্রক্রিয়া গড়ে ওঠেনি। বিশেষ করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে আরোপিত কর নিয়ে বিতর্ক এবং পরে জনরোষের মুখে তা প্রত্যাহারের ঘটনা শুধু নীতিগত দুর্বলতাই প্রকাশ করেনি, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্র কোথায়—সে প্রশ্নও সামনে এনেছে। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সরাসরি হস্তক্ষেপ প্রশাসনিক শৃঙ্খলা সম্পর্কে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

এই ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ এগুলো এমন একটি প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়, যেখানে নির্বাচিত মন্ত্রীদের চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টারা রাষ্ট্র পরিচালনায় বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠছেন। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উপদেষ্টাদের ভূমিকা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তারা কখনোই সাংবিধানিকভাবে জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিকল্প হতে পারেন না। যদি সিদ্ধান্তের উৎস ধীরে ধীরে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের বাইরে সরে যায়, তাহলে ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হওয়া অবশ্যম্ভাবী।

এ ধরনের প্রবণতা নতুন নয়। দক্ষিণ এশিয়ার বহু দেশে দেখা গেছে, ক্ষমতায় আসার আগে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া রাজনৈতিক শক্তিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সীমিত কয়েকজন বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে ঘিরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি গড়ে তোলে। ফলাফল হয় এক ধরনের ‘ইকো চেম্বার’, যেখানে ভিন্নমতকে সমালোচনা নয়, বরং প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা হয়। এতে নীতিগত ভুল সংশোধনের সুযোগ কমে যায় এবং রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা বাড়তে থাকে।

গণতন্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হলো মতবিরোধকে গ্রহণ করার ক্ষমতা। একটি কার্যকর সরকার জানে যে সমালোচনা সব সময় দুর্বলতার লক্ষণ নয়; অনেক সময় সেটিই নীতিকে আরও বাস্তবসম্মত করে তোলে। কিন্তু যদি বিরোধিতা এড়িয়ে যাওয়া, প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনা পাশ কাটানো কিংবা প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অতিক্রম করে সিদ্ধান্ত নেওয়া অভ্যাসে পরিণত হয়, তাহলে তা ধীরে ধীরে কর্তৃত্ববাদী মানসিকতার জন্ম দেয়। এই পরিবর্তন অনেক সময় আনুষ্ঠানিকভাবে নয়, বরং প্রশাসনিক আচরণের মধ্য দিয়েই দৃশ্যমান হয়।

Making Sense of Nepal's Pro-monarchy Protests – The Diplomat

সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়েও একই ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। ভূমিহীনদের উচ্ছেদ, ট্রাফিক জরিমানার বড় বৃদ্ধি, তরুণ আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশের কঠোরতা কিংবা মূলধারার সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে সংঘাত—এসব বিষয় নিয়ে সরকারের ভেতর থেকেও অস্বস্তির ইঙ্গিত মিলছে। অর্থাৎ শুধু বিরোধী পক্ষ নয়, ক্ষমতাসীন দলের প্রতিনিধিদের মধ্যেও যোগাযোগের ঘাটতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণের অভাব নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে।

রাজনৈতিক দল হিসেবে নতুন শক্তিগুলোর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো তারা কি পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে সত্যিই বেরিয়ে আসতে পারবে। নতুন মুখ, নতুন স্লোগান কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় উপস্থিতি এক ধরনের রাজনৈতিক পুঁজি তৈরি করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সরকারকে টিকিয়ে রাখে কার্যকর প্রতিষ্ঠান, নীতিগত স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি। যদি একই সঙ্গে দলের ভেতরে যোগাযোগ দুর্বল হয় এবং সিদ্ধান্ত কয়েকজন ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, তাহলে সেই রাজনৈতিক পুঁজি দ্রুত ক্ষয় হতে শুরু করে।

অবশ্য এই মুহূর্তে ক্ষমতাসীন দলের ভাঙনের আশঙ্কা খুব প্রবল নয়। রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলীয় নেতৃত্ব ও সরকারের প্রধান এখনও একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু নির্ভরশীলতা সব সময় স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা দেয় না। ব্যক্তিগত সম্পর্ক দিয়ে সাময়িক সংকট সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও, প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যার সমাধান কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমেই সম্ভব।

নেপালের রাজনৈতিক ইতিহাস দেখিয়েছে, সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও বহু সরকার অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, ব্যক্তিগত অহমিকা এবং নেতৃত্বের সংঘাতের কারণে পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেনি। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার বদলে যদি নতুন রাজনৈতিক শক্তিও একই পথ অনুসরণ করে, তাহলে তাদের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা দ্রুত হতাশায় পরিণত হবে।

বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের সমর্থনই ছিল এই রাজনৈতিক উত্থানের প্রধান ভিত্তি। তারা শুধু দ্রুত সিদ্ধান্ত নয়, ভিন্ন ধরনের শাসনব্যবস্থা দেখতে চেয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় উপস্থিতি এবং শক্তিশালী রাজনৈতিক বর্ণনা কিছু সময়ের জন্য জনসমর্থন ধরে রাখতে পারে, কিন্তু বাস্তব জীবনের জবাবদিহি, প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা এবং কার্যকর প্রশাসনের বিকল্প হতে পারে না।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি কোনো ব্যক্তি বা একটি সরকারের নয়। এটি সেই মৌলিক নীতির প্রশ্ন, যেখানে গণতন্ত্র ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্বের ওপর নয়, বরং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, উন্মুক্ত বিতর্ক এবং অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি তখনই বিশ্বাসযোগ্য হয়, যখন ক্ষমতায় গিয়েও সেই প্রতিশ্রুতির রাজনৈতিক সংস্কৃতি অক্ষুণ্ন রাখা যায়। নচেৎ নতুন নেতৃত্বও একসময় পুরোনো ব্যবস্থারই আরেকটি সংস্করণ হয়ে ওঠে।