অনেক সামাজিক সংকটের মতো এই সমস্যাটিও প্রথমে চোখে পড়ে না। কারণ এটি রাস্তায় বিক্ষোভ সৃষ্টি করে না, অর্থনীতির সূচকে ধরা পড়ে না, কিংবা সংবাদ শিরোনামও হয় না। অথচ বিশ্বের অসংখ্য তরুণ পুরুষ এমন এক মানসিক নিঃসঙ্গতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, যা কেবল ব্যক্তিগত কষ্টের বিষয় নয়; এটি ধীরে ধীরে সামাজিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক আচরণ এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকেও প্রভাবিত করছে।
সমস্যার মূল জায়গাটি বিষণ্নতা বা একাকীত্ব নয়, বরং এমন এক সামাজিক পরিবেশ যেখানে ছেলেদের ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয় নিজের দুর্বলতা আড়াল করতে। কষ্টকে ভাষা দেওয়ার বদলে সেটিকে চেপে রাখা যেন পরিণত পুরুষ হওয়ার শর্ত। ফলে বন্ধুত্ব থাকে, আড্ডা থাকে, কাজের সম্পর্ক থাকে—কিন্তু হৃদয়ের গভীর উদ্বেগ, ভয় বা ব্যর্থতার কথা বলার মতো নিরাপদ সম্পর্ক গড়ে ওঠে না।
এই নীরবতার মূল্য পরে অনেক বড় হয়ে ফিরে আসে। যখন কেউ অনুভব করে যে তার কথা শোনার মানুষ নেই, তখন সে এমন জায়গার খোঁজ করে যেখানে অন্তত তাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। বাস্তব জীবনে সেই জায়গা না পেলে ডিজিটাল দুনিয়াই হয়ে ওঠে আশ্রয়। আর সেখানেই অপেক্ষা করে থাকে নানা ধরনের অনলাইন গোষ্ঠী, যারা একাকীত্বকে পুঁজি করে নিজেদের মতাদর্শ ছড়ায়।
আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনেক প্রভাবশালী মুখ নিজেদের এমনভাবে উপস্থাপন করেন যেন তারাই একমাত্র মানুষ, যারা তরুণদের যন্ত্রণা বুঝতে পারেন। আত্মবিশ্বাস, শৃঙ্খলা কিংবা সাফল্যের ভাষণ দিয়ে তারা প্রথমে আকর্ষণ তৈরি করেন। এরপর ধীরে ধীরে সেই আলোচনার সঙ্গে যুক্ত হয় নারী বিদ্বেষ, ষড়যন্ত্র তত্ত্ব, সামাজিক বিভাজন এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক এক ধরনের বিকৃত পৌরুষের ধারণা। ফলে যিনি সম্পর্ক খুঁজতে এসেছিলেন, তিনি শেষ পর্যন্ত আরও সংকীর্ণ এবং আরও বিচ্ছিন্ন এক মানসিক জগতে আটকে পড়েন।
এই প্রবণতা কেবল সামাজিক আচরণে সীমাবদ্ধ নয়। অনেক দেশে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পেছনেও তরুণ পুরুষদের এই বিচ্ছিন্নতার ছাপ স্পষ্ট। যারা দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে অবহেলিত বা উপেক্ষিত মনে করেছে, তাদের কাছে এমন রাজনৈতিক ভাষা আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে, যা শক্তি, আধিপত্য কিংবা প্রতিশোধের প্রতিশ্রুতি দেয়। অন্যদিকে, মূলধারার রাজনীতি অনেক সময় তাদের সমস্যাকে গুরুত্ব না দিয়ে কেবল সমালোচনার ভাষায় কথা বলে। ফলে একটি শূন্যস্থান তৈরি হয়, আর সেই শূন্যস্থান চরমপন্থী বয়ান সহজেই দখল করে ফেলে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তরুণদের এই সংকটকে ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। কেউ একদিন হঠাৎ করে একাকী হয়ে যায় না। পরিবার, শিক্ষা ব্যবস্থা, সামাজিক সংস্কৃতি এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়েই এই বাস্তবতা তৈরি হয়। যদি একটি ছেলে শৈশব থেকে শুনে আসে যে কান্না দুর্বলতার লক্ষণ, সাহায্য চাওয়া লজ্জার এবং আবেগ প্রকাশ পুরুষোচিত নয়, তাহলে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর সে কীভাবে নিজের কষ্টের ভাষা খুঁজে পাবে?

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও এই ঘাটতি পূরণ করতে খুব একটা সফল নয়। পরীক্ষার ফল, প্রতিযোগিতা ও দক্ষতার ওপর গুরুত্ব থাকলেও আবেগ বোঝা, দ্বন্দ্ব সামলানো কিংবা সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তোলার মতো জীবনঘনিষ্ঠ দক্ষতা শেখানোর সুযোগ খুবই সীমিত। অথচ মানসিক দৃঢ়তা কেবল চাপ সহ্য করার ক্ষমতা নয়; নিজের অনুভূতি বোঝা, অন্যের কথা শোনা এবং প্রয়োজনে সহায়তা চাইতেও সমান সাহস লাগে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো ইতিবাচক পুরুষ আদর্শের অভাব। তরুণদের সামনে এমন মানুষের উপস্থিতি কম, যিনি দেখাতে পারেন যে শক্তিশালী হওয়ার অর্থ কঠোর হওয়া নয়; বরং দায়িত্বশীল, সংবেদনশীল এবং আত্মসচেতন হওয়াও শক্তির অংশ। যখন এই ধরনের বাস্তব উদাহরণ অনুপস্থিত থাকে, তখন ভার্চুয়াল দুনিয়ার অতিরঞ্জিত চরিত্রগুলো সহজেই তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।
এই বাস্তবতা শুধু একটি দেশের নয়। ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন অর্থনীতি বা ভিন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থার দেশগুলোতেও একই ধরনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, দ্রুত বদলে যাওয়া সামাজিক সম্পর্ক এবং প্রযুক্তিনির্ভর জীবন তরুণদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে এটি এখন জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সামাজিক নীতির যৌথ চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।
সমাধানের পথও তাই বহুমাত্রিক হতে হবে। প্রথমত, ছেলেদের আবেগ প্রকাশকে দুর্বলতা নয়, স্বাভাবিক মানবিক আচরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সামাজিক-আবেগিক শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে হবে, যাতে যোগাযোগ, সহমর্মিতা এবং মানসিক স্থিতিশীলতা গড়ে ওঠে। তৃতীয়ত, তরুণদের জন্য সহজলভ্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে চিকিৎসা নেওয়া সামাজিক লজ্জার কারণ না হয়। পাশাপাশি কমিউনিটি পর্যায়ে এমন উদ্যোগ দরকার, যেখানে প্রজন্মের অভিজ্ঞ মানুষ ও তরুণদের মধ্যে অর্থবহ সম্পর্ক তৈরি হয়।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি অবশ্য সাংস্কৃতিক। আমাদের এমন একটি সমাজ দরকার, যেখানে একজন তরুণ তার কষ্টের কথা বলতে ভয় পাবে না, বন্ধুর কাছে সাহায্য চাইতে সংকোচ বোধ করবে না এবং ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা লুকিয়ে রাখাকে সাহসের পরিচয় বলে মনে করবে না।
একজন একাকী তরুণ কেবল একজন মানুষের গল্প নয়; তিনি একটি সমাজের প্রতিচ্ছবি। আমরা যদি তাদের অনুভূতিকে অস্বীকার করি, তবে সেই শূন্যস্থান অন্য কেউ পূরণ করবে—এবং সব সময় সেই বিকল্পটি মানবিক হবে না। কিন্তু যদি আমরা এমন পরিবেশ তৈরি করতে পারি, যেখানে সংযোগ, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক আস্থাই সম্পর্কের ভিত্তি হয়, তাহলে শুধু তরুণ পুরুষরাই নয়, পুরো সমাজই আরও সুস্থ, স্থিতিশীল এবং সহনশীল হয়ে উঠবে।
এই সংকটের সমাধান কঠোরতার ভাষায় নয়, মানবিকতার ভাষায়। কারণ মানুষকে শক্তিশালী করে তার নীরবতা নয়, বরং এমন সম্পর্ক, যেখানে সে নিশ্চিন্তে বলতে পারে—‘আমি ভালো নেই।’
থিলিনা ওয়ালপোলা 



















