ইউক্রেনের সেনাবাহিনীতে বড় ধরনের নেতৃত্ব পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে মেজর জেনারেল মিখাইলো দ্রাপাতিকে দায়িত্ব দিয়েছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে বাস্তব অভিজ্ঞতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা এবং পুরোনো আমলাতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিরোধিতার জন্য তিনি দীর্ঘদিন ধরেই সেনাদের কাছে পরিচিত।
দায় স্বীকার করে নজির গড়েছিলেন
গত বছর রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় একটি সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ১২ ইউক্রেনীয় সেনা নিহত হওয়ার পর দ্রাপাতি একটি ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ঘটনার দায় নিজের কাঁধে নিয়ে পদত্যাগ করেন।
তিনি জানিয়েছিলেন, প্রশিক্ষণের পুরোনো পদ্ধতি পরিবর্তনের চেষ্টা করলেও তা পুরোপুরি সফল হয়নি। খোলা জায়গায় মহড়া কমানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন, কারণ এ ধরনের ব্যবস্থা রুশ হামলার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছিল। তাঁর মতে, এমন ঘটনার জন্য সর্বাগ্রে দায়িত্ব কমান্ডারদেরই।
এই পদক্ষেপ সেনাদের মধ্যে তাঁর প্রতি সম্মান আরও বাড়িয়ে দেয় এবং ইউক্রেনের সামরিক কাঠামো আধুনিক করার দাবি নতুন করে জোরালো হয়ে ওঠে।
নেতৃত্বে পরিবর্তনের পেছনের কারণ
জেলেনস্কি দেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওলেক্সান্দর সিরস্কিকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেন। সামরিক নেতৃত্বে নতুন মুখ আনার দাবিতে দেশজুড়ে চলা বিক্ষোভের পর এই সিদ্ধান্ত আসে।
সমালোচকদের অভিযোগ ছিল, পুরোনো সোভিয়েত ধাঁচের কেন্দ্রীভূত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যবস্থা সেনাবাহিনীর কার্যকারিতা কমিয়ে দিচ্ছে এবং যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করছে।
যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জনেই পরিচিত দ্রাপাতি
মাত্র ৪৩ বছর বয়সী দ্রাপাতি ২০১৪ সালে রাশিয়ার সঙ্গে সংঘাতের শুরু থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মারিউপোলে রুশপন্থী বাহিনীর প্রতিরোধ ভেঙে শহরের প্রতিরক্ষা জোরদারে তিনি নেতৃত্ব দেন।
একই বছরের জুলাইয়ে রুশ বাহিনীর অবরোধের মধ্যে আটকে পড়া ২৬০ সেনাকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার অভিযানও তাঁর নেতৃত্বে সফল হয়। এই ঘটনাগুলো তাঁকে ইউক্রেনের সেনাদের মধ্যে একজন দক্ষ ও সাহসী কমান্ডার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হলে তিনি খারকিভসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় প্রতিরক্ষা পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন।

আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সেনাবাহিনী গড়ার চ্যালেঞ্জ
বর্তমানে ইউক্রেনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সীমিত জনবল নিয়ে দীর্ঘ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া। এ কারণে নতুন সেনাপ্রধানের অন্যতম লক্ষ্য হবে যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন, চালকবিহীন স্থলযান এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়ানো।
বিশ্লেষকদের মতে, এতে সামনের সারির সেনাদের ওপর চাপ কমবে এবং অভিযানের কার্যকারিতা বাড়বে।
কমাতে চান আমলাতান্ত্রিক জট
ইউক্রেনের অনেক সামরিক কর্মকর্তা অভিযোগ করছেন, অতিরিক্ত কাগজপত্র এবং দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বিলম্ব হচ্ছে।
দ্রাপাতির ঘনিষ্ঠদের বিশ্বাস, তিনি এই জটিলতা কমিয়ে মাঠপর্যায়ের কমান্ডারদের আরও স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ তৈরি করবেন। একই সঙ্গে শীর্ষ নেতৃত্ব ও বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি গড়ে তুলবেন।
ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর জন্য এই নেতৃত্ব পরিবর্তন শুধু একজন নতুন প্রধান নিয়োগ নয়, বরং যুদ্ধের বাস্তবতা মাথায় রেখে আরও আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং কার্যকর বাহিনী গড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















