বিশ্বজুড়ে পাখির গানের বিস্ময়কর বৈচিত্র্যের পেছনে রয়েছে মাত্র আটটি মৌলিক শব্দধারা। ফ্রান্সের একদল গবেষক এমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করেছেন। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, হাজারো প্রজাতির পাখি ভিন্ন ভিন্ন সুরে গান গাইলেও সেসব গান মূলত আট ধরনের মৌলিক শব্দ-নকশা বা ‘মোটিফ’-এর সমন্বয়ে তৈরি।
গবেষণাটি পরিচালনা করতে বিজ্ঞানীরা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের স্বেচ্ছাসেবকদের আপলোড করা পাখির গানের বৈশ্বিক ডেটাবেস থেকে ৩ হাজারের বেশি প্রজাতির ১ লাখ ১৬ হাজারেরও বেশি অডিও রেকর্ডিং বিশ্লেষণ করেন।
প্রকৃতির জটিল যোগাযোগব্যবস্থা
পাখির গানকে প্রকৃতির সবচেয়ে উন্নত শব্দভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থার একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে বিভিন্ন অঞ্চল ও প্রজাতিভেদে এর ব্যাপক বৈচিত্র্যের কারণে এতদিন বৈশ্বিক পরিসরে এই যোগাযোগব্যবস্থার সাধারণ বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করা গবেষকদের জন্য কঠিন ছিল।

গবেষণার প্রধান গবেষক এবং ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট-এতিয়েনের পিএইচডি শিক্ষার্থী কুয়েন্টিন বাকেলে জানান, পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের পাখি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের গান গায়। ফলে সবার মধ্যে মিল খুঁজে বের করা দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় বৈজ্ঞানিক চ্যালেঞ্জ ছিল।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় মিলল সাধারণ কাঠামো
গবেষক দল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সহায়তায় হাজার হাজার রেকর্ডিং তুলনা করে দেখতে পান, সব পাখির গানই মূলত আটটি মৌলিক শব্দ-মোটিফের বিভিন্ন সমন্বয়ে গঠিত।
এই আটটি মোটিফের মধ্যে রয়েছে তিন ধরনের ট্রিল, তিন ধরনের হুইসেল, বিশৃঙ্খল বা অনিয়মিত স্বর এবং হারমনি। বিভিন্ন প্রজাতি এই মৌলিক ধরণগুলোর ভিন্ন ভিন্ন সংমিশ্রণ ব্যবহার করে নিজেদের স্বতন্ত্র গান তৈরি করে।
পরিবেশের প্রভাব স্পষ্ট
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, যে পরিবেশে পাখির বিবর্তন হয়েছে, সেটি তাদের গানের ধরন নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

উষ্ণমণ্ডলীয় ঘন বনাঞ্চলে বসবাসকারী পাখিরা সাধারণত অপেক্ষাকৃত সরল সুর, বিশেষ করে সমতল হুইসেল ব্যবহার করে। ঘন গাছপালা ও প্রাকৃতিক শব্দপূর্ণ পরিবেশে এ ধরনের সুর বেশি কার্যকরভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
অন্যদিকে নাতিশীতোষ্ণ বনাঞ্চলের পাখিরা তুলনামূলকভাবে দ্রুত ট্রিল ও জটিল সুরের সমন্বয়ে গান গায়, যা স্বল্প দূরত্বে আরও বেশি তথ্য আদান-প্রদানে সহায়তা করে।
সংরক্ষণের গুরুত্ব বাড়ল
গবেষকদের মতে, এটি বিবর্তনের একটি ভারসাম্যপূর্ণ অভিযোজনের উদাহরণ। জটিল গান বেশি তথ্য বহন করতে পারলেও ঘন পরিবেশে তা দীর্ঘ দূরত্বে কার্যকরভাবে পৌঁছাতে পারে না।
কুয়েন্টিন বাকেলে বলেন, মানুষের কর্মকাণ্ড এবং ক্রমবর্ধমান শব্দদূষণের কারণে প্রাকৃতিক শব্দপরিবেশ বদলে গেলে পাখিরা কীভাবে নিজেদের মানিয়ে নেবে, তা বোঝার ক্ষেত্রেও এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি আরও বলেন, পাখির গান তাদের বিবর্তিত আবাসস্থলের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। কোনো বনভূমি ধ্বংস হয়ে গেলে সেই পরিবেশের জন্য অভিযোজিত গান নতুন পরিবেশে আর কার্যকর নাও হতে পারে। তাই প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণ শুধু জীববৈচিত্র্যের জন্য নয়, প্রকৃতির এই অনন্য শব্দঐতিহ্য রক্ষার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















