পাকিস্তানের বেলুচিস্তান আবারও রক্তাক্ত। নিরাপত্তা বাহিনী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। কিন্তু এই মৃত্যুর হিসাব বেলুচিস্তানের বাস্তবতার কেবল একটি অংশ তুলে ধরে। প্রকৃত সংকট আরও গভীর—এটি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় আস্থার সংকট। বহু দশক ধরে জমে ওঠা অসন্তোষ আজ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে কেবল সামরিক অভিযান চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের আশা করা বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
সরকারি বক্তব্যে প্রায়ই সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ‘শেষ পর্যন্ত লড়াই’ করার অঙ্গীকার শোনা যায়। কিন্তু একই ধরনের ঘোষণা বছরের পর বছর ধরে দেওয়া হলেও সহিংসতা কমার বদলে আরও বিস্তৃত হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, যদি কেবল শক্তি প্রয়োগই সমাধান হতো, তবে এত দীর্ঘ সময় পরও কেন সংকট আরও জটিল হয়ে উঠছে?
বেলুচিস্তানের ঘটনাপ্রবাহ দেখায়, নিরাপত্তা-ভিত্তিক নীতি রাজনৈতিক সমস্যার বিকল্প হতে পারে না। বরং যখন রাজনৈতিক অভিযোগ, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং প্রতিনিধিত্বের সংকটকে উপেক্ষা করা হয়, তখন নিরাপত্তা অভিযান অনেক সময় পরিস্থিতিকে আরও উত্তেজনাপূর্ণ করে তোলে।
সংকটের শিকড় বহু পুরোনো
বেলুচিস্তানের অস্থিরতা নতুন নয়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এই প্রদেশে বিভিন্ন সময়ে সশস্ত্র বিদ্রোহ দেখা গেছে। তবে বর্তমান সংকটের মোড় ঘুরে যায় প্রায় দুই দশক আগে। তৎকালীন সামরিক সরকারের সময়ে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ জোরদার করার উদ্যোগ এবং পরবর্তী ঘটনাবলি প্রদেশজুড়ে অসন্তোষকে নতুন মাত্রা দেয়।

এর আগে গণতান্ত্রিক শাসনের সময়ে বেলুচ জাতীয়তাবাদী দলগুলো রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। তাদের অনেক দাবি—বিশেষ করে প্রাকৃতিক সম্পদের রয়্যালটি ও ন্যায্য সম্পদ বণ্টন—বাস্তবায়িত হয়নি, কিন্তু অন্তত রাজনৈতিক অংশগ্রহণের একটি পথ খোলা ছিল। সেই পথ সংকুচিত হওয়ার পর হতাশা ধীরে ধীরে সংঘাতে রূপ নেয়।
অতিরিক্ত কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের মূল্য
বেলুচিস্তানের দীর্ঘদিনের অভিযোগগুলোর একটি হলো, দেশের সবচেয়ে সম্পদসমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোর একটি হওয়া সত্ত্বেও উন্নয়নের সুফল স্থানীয় জনগণ পায়নি। প্রাকৃতিক গ্যাস, খনিজ সম্পদ এবং কৌশলগত অবস্থান থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তানের সবচেয়ে অনুন্নত অঞ্চলগুলোর তালিকায় আজও বেলুচিস্তান রয়েছে।
এই বৈপরীত্য কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি রাজনৈতিক আস্থারও প্রশ্ন। যখন মানুষ মনে করে তাদের সম্পদ অন্যরা ব্যবহার করছে, অথচ তাদের জীবনযাত্রার উন্নতি হচ্ছে না, তখন রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বাস ক্ষয় হতে থাকে। সেই শূন্যস্থানই ধীরে ধীরে অসন্তোষের রাজনীতিকে শক্তিশালী করে।
অপূর্ণ সংলাপের মূল্য
বেলুচিস্তানের ইতিহাসে এমন অনেক সময় এসেছে, যখন আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসনের সুযোগ ছিল। সম্পদ বণ্টন, রয়্যালটি বৃদ্ধি কিংবা সামাজিক উন্নয়ন নিয়ে বিভিন্ন সুপারিশও উঠে এসেছিল। কিন্তু সেসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখা যায়নি।
ফলে সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা দুর্বল হয়েছে, আর নিরাপত্তা অভিযান হয়ে উঠেছে প্রধান নীতি। কিন্তু ইতিহাস বলছে, যেখানে আলোচনার সুযোগ নষ্ট হয়, সেখানে সংঘাত আরও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
বিচ্ছিন্নতা কীভাবে সহিংসতাকে শক্তিশালী করে
দীর্ঘদিন ধরে বলপ্রয়োগ, গুম ও নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ, রাজনৈতিক মতপ্রকাশের সীমাবদ্ধতা এবং প্রতিনিধিত্বের সংকট অনেক মানুষের মধ্যে গভীর হতাশা সৃষ্টি করেছে। এই পরিস্থিতিতে বিশেষ করে শিক্ষিত তরুণদের একটি অংশ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা হারিয়ে উগ্রপন্থী সংগঠনের দিকে ঝুঁকেছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়।
এটি কোনোভাবেই সহিংসতার নৈতিক বা রাজনৈতিক বৈধতা দেয় না। কারণ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও অসংখ্য নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাকে ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তবে এটাও সত্য, একটি বিচ্ছিন্ন ও হতাশ জনগোষ্ঠী উগ্রবাদী সংগঠনগুলোর জন্য তুলনামূলকভাবে সহজ নিয়োগক্ষেত্রে পরিণত হয়।
বাহ্যিক হস্তক্ষেপের অজুহাত নয়
পাকিস্তান প্রায়ই অভিযোগ করে যে, বেলুচিস্তানের অস্থিরতায় বিদেশি শক্তির ভূমিকা রয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তের অস্থিতিশীলতা এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতিও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। আফগানিস্তানের সীমান্ত, ইরানকে ঘিরে অনিশ্চয়তা এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তবে সম্ভাব্য বাহ্যিক হস্তক্ষেপের প্রশ্ন অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমস্যাকে আড়াল করার অজুহাত হতে পারে না। যদি স্থানীয় জনগণের আস্থা পুনর্গঠন না করা যায়, তবে বাইরের যেকোনো প্রভাব আরও সহজে শিকড় গেড়ে বসতে পারে।
দুর্নীতি ও পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতি
বেলুচিস্তানের রাজনীতিতে উপজাতীয় নেতাদের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার প্রায়ই তাদের উন্নয়নবিরোধী বা চাপ সৃষ্টিকারী হিসেবে চিত্রিত করে। কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল। বহু ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন ব্যবস্থার সঙ্গে আপস, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং দুর্নীতির সংস্কৃতি স্থানীয় নেতৃত্ব ও রাষ্ট্র—উভয় পক্ষের মধ্যেই বিস্তার লাভ করেছে।
ফলে জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব দুর্বল হয়েছে, আর রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
শুধু শক্তি নয়, প্রয়োজন রাজনৈতিক সাহস
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বেলুচিস্তানে সামরিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু সহিংসতা থামেনি; বরং অনেক ক্ষেত্রেই তা আরও বিস্তৃত হয়েছে। এতে বোঝা যায়, কেবল নিরাপত্তা অভিযান দিয়ে এমন সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব কেবল অস্ত্রের শক্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয় না; তা টিকে থাকে নাগরিকের আস্থা, ন্যায়বিচার এবং অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির ওপর। বেলুচিস্তানে এই তিনটির ঘাটতি যতদিন থাকবে, ততদিন নতুন অভিযান পুরোনো সমস্যার পুনরাবৃত্তিই ঘটাবে।
সময়ের গুরুত্ব
বেলুচিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতি পাকিস্তানের জন্য শুধু একটি আইনশৃঙ্খলা সমস্যা নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার একটি মৌলিক পরীক্ষা। যদি রাজনৈতিক সংলাপ, ন্যায্য সম্পদ বণ্টন, সাংবিধানিক অধিকার এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার উদ্যোগ দ্রুত গ্রহণ না করা হয়, তাহলে সহিংসতার চক্র আরও গভীর হতে পারে।
শক্তি প্রয়োগ তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠা করে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, ন্যায়সঙ্গত শাসন এবং জনগণের বিশ্বাস। বেলুচিস্তানের অভিজ্ঞতা আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে—রাষ্ট্র যখন সংকটকে শুধু নিরাপত্তার চোখে দেখে, তখন প্রকৃত সমস্যাগুলো আরও দীর্ঘস্থায়ী হয়ে ওঠে।
জাহিদ হুসেইন 


















