বেলুচিস্তানে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ঘটে যাওয়া একের পর এক রক্তক্ষয়ী ঘটনার সর্বশেষ সংযোজন হলো মাস্তুংয়ে এক বিচারক ও তাঁর নিরাপত্তারক্ষীকে নির্মমভাবে হত্যা। চলতি মাসের শুরু থেকে প্রদেশটিতে ধারাবাহিক সন্ত্রাসী হামলায় রাষ্ট্রের কর্মকর্তা-কর্মচারী যেমন নিহত হয়েছেন, তেমনি প্রাণ হারিয়েছেন সাধারণ নাগরিকরাও।
বিচারক আবদুল হাকিম কাকার কোয়েটা থেকে মাস্তুংয়ের উদ্দেশে আরেকজন বিচারক ও নিরাপত্তা সদস্যদের সঙ্গে ভ্রমণ করছিলেন। পথে তাঁদের গাড়ি সশস্ত্র হামলার শিকার হয়। হামলায় বিচারক কাকার এবং তাঁর নিরাপত্তারক্ষী মুহাম্মদ জামান নিহত হন। কিছু অযাচাইকৃত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসলামিক স্টেট–খোরাসান (আইএস-কে) এ হামলার দায় স্বীকার করেছে। গত কয়েক বছর ধরে আইএস-কে বেলুচিস্তানে সক্রিয় রয়েছে। যদি তাদের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত হয়, তবে তা ইঙ্গিত করবে যে সংগঠনটি এখন আরও বিস্তৃত পরিসরে হামলার লক্ষ্য নির্ধারণ করছে।
এই হত্যাকাণ্ডের আগে মাঙ্গি বাঁধে নিষিদ্ধ তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) দাবি করা হামলা, খুদ কোচা এলাকায় করাচিগামী একটি বাসে প্রাণঘাতী আক্রমণ এবং মাশখেলে পাঞ্জাব থেকে আসা শ্রমিকদের হত্যার মতো ঘটনাও ঘটেছে।
সাম্প্রতিক সহিংসতার ঢেউ স্পষ্ট করে যে বেলুচিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল। ভিন্ন ভিন্ন আদর্শিক অবস্থানের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সাধারণ মানুষ, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং সরকারি কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে সন্ত্রাস চালিয়ে যাচ্ছে। পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইঙ্গিত দিয়েছেন, বেলুচিস্তানভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে টিটিপির একটি সমন্বয় রয়েছে।

এই সমীকরণে আইএস-কের ভূমিকা আরও জটিল, কারণ অতীতে সংগঠনটির সঙ্গে বেলুচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)-এর সম্পর্ক ভালো ছিল না। তাহলে কি এসব সশস্ত্র গোষ্ঠী পুরোনো বিরোধ ভুলে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একসঙ্গে কাজ শুরু করেছে? এ ধরনের সম্ভাব্য যোগসূত্র উদ্ঘাটনে আরও কার্যকর গোয়েন্দা তৎপরতা জরুরি। পাশাপাশি অন্য সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর সম্ভাব্য পুনরুত্থানের আশঙ্কাও রাষ্ট্রকে সতর্ক থাকতে বাধ্য করছে।
মাঙ্গি বাঁধে হামলার পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান এবং অন্যান্য শীর্ষ বেসামরিক ও সামরিক নেতৃত্ব কোয়েটায় বৈঠক করে প্রাদেশিক নেতৃত্বের সঙ্গে সন্ত্রাসবাদ দমনের অঙ্গীকার করেছিলেন। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহ দেখিয়েছে, সন্ত্রাসীরা এখনো নির্বিঘ্নে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে বেলুচিস্তানে শান্তি ফিরিয়ে আনতে নতুন ও কার্যকর কৌশল গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান বৃহস্পতিবার আবারও বেলুচিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন মাত্রায় সহিংসতা চললেও স্থায়ী শান্তি এখনো অধরাই রয়ে গেছে। তাই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো সব ধরনের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে এমনভাবে নিষ্ক্রিয় করা, যাতে তারা আর রাষ্ট্র বা সাধারণ মানুষের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে না পারে। একই সঙ্গে যেসব বিদেশি শক্তি এসব গোষ্ঠীকে সহায়তা বা আশ্রয় দিয়ে থাকতে পারে, তাদের ভূমিকাও প্রকাশ্যে আনতে হবে।
তবে শুধু সামরিক অভিযান দিয়ে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এর পাশাপাশি একটি কার্যকর রাজনৈতিক উদ্যোগও অপরিহার্য। এ উদ্যোগে প্রদেশের প্রকৃত রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের এবং সহিংসতা পরিত্যাগে আগ্রহী সব পক্ষকে সম্পৃক্ত করতে হবে। সন্ত্রাসবিরোধী পদক্ষেপের পাশাপাশি বেলুচিস্তানে রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যকার আস্থার সম্পর্ক পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজন সহমর্মিতা, সংলাপ এবং রাজনৈতিক সমঝোতা।
সারাক্ষণ ডেস্ক 



















