০৩:১৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬
ভালোবাসার টানে শহর বদল, বিচ্ছেদের পরও থেকে যাওয়া—শেষ পর্যন্ত বদলে গেল পুরো জীবন  অজান্তেই চারমাত্রিক প্রদর্শনীতে, ‘ওডিসি’ দেখে বিস্ময় আর ভোগান্তিতে দর্শক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে? নতুন বিতর্কে বাড়ছে বৈশ্বিক উদ্বেগ যৌন অসদাচরণের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রধান কৌঁসুলিকে অপসারণ বিশ্বকাপের বাঁশি বাজে মাঠে, কিন্তু খেলা চলে রাজনীতির অঙ্গনেও বেলুচিস্তানে বিচারক হত্যাকাণ্ডের নিন্দা পাকিস্তান বার কাউন্সিলের, শোক জানালেন প্রধান বিচারপতি বেলুচিস্তান: শুধু নিরাপত্তা দিয়ে কি একটি সংকটের সমাধান সম্ভব? ডনের সম্পাদকীয়ঃ সন্ত্রাস দমনের পাশাপাশি বেলুচিস্তানে রাষ্ট্র-জনগণের আস্থা পুনর্গঠনই শান্তির একমাত্র পথ ওয়াংচুকের অনশন শেষ, আন্দোলন চলছেই: শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে আজও কেন্দ্রের সঙ্গে বৈঠক সাফদারজং হাসপাতালে পুলিশের সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডার ভিডিও ভাইরাল: ‘মানসিক চাপে মারা গেলে দায় আপনাদের’, বললেন সোনম ওয়াংচুক

বিশ্বকাপের বাঁশি বাজে মাঠে, কিন্তু খেলা চলে রাজনীতির অঙ্গনেও

ফুটবলকে দীর্ঘদিন ধরে এমন এক বৈশ্বিক ভাষা হিসেবে দেখা হয়েছে, যা রাষ্ট্র, মতাদর্শ ও সীমান্তের বিভাজন অতিক্রম করে মানুষকে একত্রিত করতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিশ্বকাপের মতো বিশাল আন্তর্জাতিক আসর কখনোই কেবল একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়। এটি একই সঙ্গে ক্ষমতার প্রদর্শন, কূটনৈতিক বার্তা, অর্থনৈতিক স্বার্থ, জাতীয় ভাবমূর্তি নির্মাণ এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির সূক্ষ্ম প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র। ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ সেই সত্যকে আরও স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে।

এবারের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা বেড়ে ৪৮-এ পৌঁছেছে। ভবিষ্যতে সেটি আরও বাড়িয়ে ৬৪ করার চিন্তাভাবনাও চলছে। এই সম্প্রসারণ নিঃসন্দেহে ফুটবলের বিস্তারকে নতুন মাত্রা দিচ্ছে। কিন্তু বিশ্বকাপ যত বড় হচ্ছে, ততই এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের প্রতিফলনের ক্ষেত্রেও পরিণত হচ্ছে। খেলার বাইরের বিতর্ক যেন অনেক সময় খেলার ফলাফলকেও ছাপিয়ে যাচ্ছে।

অনেকে মনে করেন, সাম্প্রতিক বিশ্বকাপ প্রমাণ করেছে যে খেলাধুলা ও রাজনীতিকে আলাদা রাখার ধারণা বাস্তবে টেকে না। তবে এই উপলব্ধি নতুন নয়। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, খেলাধুলাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার নজির বহু পুরোনো। কখনো শাসকগোষ্ঠী নিজেদের আদর্শ প্রচারে খেলাকে কাজে লাগিয়েছে, কখনো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাকে জাতীয় শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ, মাঠের প্রতিযোগিতা বহুবার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্প্রসারিত রূপে আবির্ভূত হয়েছে।

বিশ শতকের ইতিহাসে এর সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণগুলোর মধ্যে রয়েছে ইতালিতে ১৯৩৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ এবং জার্মানিতে ১৯৩৬ সালের অলিম্পিক। দুটি আসরই তৎকালীন শাসকদের রাজনৈতিক প্রচারণার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল। খেলার সাফল্যকে ব্যবহার করা হয়েছিল রাষ্ট্রের আদর্শিক শক্তি ও শাসনব্যবস্থার শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরতে। ফলে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আর কেবল ক্রীড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।

World Cup stunning moments: Austria's Wunderteam go close | World Cup | The  Guardian

পরবর্তী সময়ে শীতল যুদ্ধের যুগেও একই চিত্র দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী বিশ্ব এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক ব্লক আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনকে নিজেদের রাজনৈতিক সক্ষমতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছে। অলিম্পিকের পদকজয় কিংবা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সাফল্যকে কেবল খেলাধুলার অর্জন হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার কার্যকারিতার প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হতো। খেলোয়াড়দের সাফল্যের পেছনে তখন জাতীয় মর্যাদার লড়াইও সমানভাবে কাজ করত।

ফুটবল বিশ্বকাপে অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘ সময় প্রধান শক্তি হয়ে উঠতে পারেনি। ফলে বিশ্বকাপের শিরোপা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা মূলত ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবু বিশ্বকাপের প্রতিটি আসর আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতাকে কোনো না কোনোভাবে প্রতিফলিত করেছে।

২০২৬ সালের আসরে সেই প্রবণতা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই আয়োজক দেশের নানা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বিতর্কের জন্ম দেয়। বিশেষ করে কয়েকটি আফ্রিকান দেশের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আচরণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সেনেগাল দলের সদস্যদের কঠোর নিরাপত্তা তল্লাশি, কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের প্রতিনিধিদের ভিসা জটিলতা এবং ফিফা মনোনীত সোমালি রেফারিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা না দেওয়ার ঘটনাগুলো ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

সমালোচকদের মতে, এসব সিদ্ধান্তে বৈষম্যের ইঙ্গিত ছিল এবং আফ্রিকান প্রতিনিধিদের ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় কঠোরতা দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সমর্থকেরা যুক্তি দেন, ১১ সেপ্টেম্বরের পর গড়ে ওঠা নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হিসেবেই এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাদের মতে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য, বৈষম্য নয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এমন ব্যাখ্যা সব পক্ষকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি।

Iran ready to focus on football amid political tensions as World Cup  campaign begins in US | The Business Standard

ইরানের জাতীয় দলকে ঘিরেও আরেক দফা রাজনৈতিক বিতর্ক দেখা দেয়। দলটির অবস্থান, প্রতিনিধি দলের আকার এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমের ওপর আরোপিত বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা তেহরানের তীব্র অসন্তোষের কারণ হয়। এসব পদক্ষেপের জন্য শুধু আয়োজক দেশ নয়, ফিফাও সমালোচনার মুখে পড়ে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে এসব অভিযোগের বিস্তারিত জবাব দেয়নি, অনেক পর্যবেক্ষক দুই দেশের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনাকেই এই ব্যবস্থার পেছনের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

বিশ্বকাপ চলাকালে আরেক ধরনের বিতর্কও সামনে আসে। বিভিন্ন মহলে অভিযোগ ওঠে, টুর্নামেন্টের ফলাফল প্রভাবিত করার চেষ্টা হয়েছে এবং নির্দিষ্ট একটি দলকে সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। যদিও শেষ পর্যন্ত সেই দল শিরোপা জিততে না পারায় অভিযোগগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়ে। তবু এমন বিতর্ক দেখিয়ে দেয়, বিশ্বকাপে কেবল খেলার বিশ্লেষণই নয়, রাজনৈতিক সন্দেহ ও ষড়যন্ত্রের আলোচনাও সমান গুরুত্ব পায়।

সবচেয়ে বেশি আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে ফিফা সভাপতির কাছে একটি লাল কার্ড বাতিলের অনুরোধ। বিষয়টি পরে ফিফার সংশ্লিষ্ট কমিটিতে পাঠানো হয় এবং নজিরবিহীনভাবে সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনও করা হয়। এই ঘটনায় অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, আন্তর্জাতিক ফুটবলের নিয়মকানুন কি রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে থাকতে পারছে? যদিও সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড়ের অংশগ্রহণ শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজয় ও বিদায় থেকে রক্ষা করতে পারেনি, তবু ঘটনাটি খেলাধুলার স্বাধীনতা নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করে।

Saudi Arabia officially announced as host for Fifa World Cup 2034 | FIFA World  Cup 2022 News - Business Standard

এসব ঘটনার প্রতিটিই আলাদা। কোথাও নিরাপত্তা, কোথাও কূটনৈতিক বৈরিতা, কোথাও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, আবার কোথাও ক্ষমতার প্রভাবের অভিযোগ। কিন্তু সবকটির কেন্দ্রে একটি সাধারণ বাস্তবতা রয়েছে—বিশ্বকাপ এখন আর কেবল ফুটবল নয়। এটি এমন একটি বৈশ্বিক মঞ্চ, যেখানে রাষ্ট্রের স্বার্থ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, কূটনৈতিক বার্তা এবং রাজনৈতিক অবস্থান অনিবার্যভাবে উপস্থিত থাকে।

তাই খেলাধুলাকে রাজনীতি থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করার দাবি যত আকর্ষণীয়ই শোনাক না কেন, বাস্তব অভিজ্ঞতা ভিন্ন কথা বলে। সংগঠিত আন্তর্জাতিক ক্রীড়ার ইতিহাস দেখায়, রাজনীতি ও খেলাধুলা দীর্ঘদিন ধরেই একে অপরকে প্রভাবিত করে এসেছে। সময়ের সঙ্গে সেই প্রভাবের ধরন বদলেছে, বিতর্কের বিষয় পরিবর্তিত হয়েছে, কিন্তু সম্পর্কটি কখনো বিচ্ছিন্ন হয়নি।

ভবিষ্যতের বিশ্বকাপ আরও বড় হবে, আরও বেশি দেশ অংশ নেবে এবং বৈশ্বিক গুরুত্বও বাড়বে। ফলে রাজনৈতিক বিতর্কও যে আরও জটিল রূপ নেবে, সে সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ফুটবলের আসল লড়াই অবশ্যই মাঠে নির্ধারিত হওয়া উচিত। কিন্তু বিশ্ব রাজনীতির বাস্তবতায় সেই মাঠের চারপাশে যে আরেকটি অদৃশ্য প্রতিযোগিতা সবসময় চলতে থাকে, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ তা আবারও মনে করিয়ে দিল।

জনপ্রিয় সংবাদ

ভালোবাসার টানে শহর বদল, বিচ্ছেদের পরও থেকে যাওয়া—শেষ পর্যন্ত বদলে গেল পুরো জীবন 

বিশ্বকাপের বাঁশি বাজে মাঠে, কিন্তু খেলা চলে রাজনীতির অঙ্গনেও

০১:৪৭:৪৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬

ফুটবলকে দীর্ঘদিন ধরে এমন এক বৈশ্বিক ভাষা হিসেবে দেখা হয়েছে, যা রাষ্ট্র, মতাদর্শ ও সীমান্তের বিভাজন অতিক্রম করে মানুষকে একত্রিত করতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিশ্বকাপের মতো বিশাল আন্তর্জাতিক আসর কখনোই কেবল একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়। এটি একই সঙ্গে ক্ষমতার প্রদর্শন, কূটনৈতিক বার্তা, অর্থনৈতিক স্বার্থ, জাতীয় ভাবমূর্তি নির্মাণ এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির সূক্ষ্ম প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র। ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ সেই সত্যকে আরও স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে।

এবারের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা বেড়ে ৪৮-এ পৌঁছেছে। ভবিষ্যতে সেটি আরও বাড়িয়ে ৬৪ করার চিন্তাভাবনাও চলছে। এই সম্প্রসারণ নিঃসন্দেহে ফুটবলের বিস্তারকে নতুন মাত্রা দিচ্ছে। কিন্তু বিশ্বকাপ যত বড় হচ্ছে, ততই এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের প্রতিফলনের ক্ষেত্রেও পরিণত হচ্ছে। খেলার বাইরের বিতর্ক যেন অনেক সময় খেলার ফলাফলকেও ছাপিয়ে যাচ্ছে।

অনেকে মনে করেন, সাম্প্রতিক বিশ্বকাপ প্রমাণ করেছে যে খেলাধুলা ও রাজনীতিকে আলাদা রাখার ধারণা বাস্তবে টেকে না। তবে এই উপলব্ধি নতুন নয়। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, খেলাধুলাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার নজির বহু পুরোনো। কখনো শাসকগোষ্ঠী নিজেদের আদর্শ প্রচারে খেলাকে কাজে লাগিয়েছে, কখনো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাকে জাতীয় শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ, মাঠের প্রতিযোগিতা বহুবার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্প্রসারিত রূপে আবির্ভূত হয়েছে।

বিশ শতকের ইতিহাসে এর সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণগুলোর মধ্যে রয়েছে ইতালিতে ১৯৩৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ এবং জার্মানিতে ১৯৩৬ সালের অলিম্পিক। দুটি আসরই তৎকালীন শাসকদের রাজনৈতিক প্রচারণার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল। খেলার সাফল্যকে ব্যবহার করা হয়েছিল রাষ্ট্রের আদর্শিক শক্তি ও শাসনব্যবস্থার শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরতে। ফলে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আর কেবল ক্রীড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।

World Cup stunning moments: Austria's Wunderteam go close | World Cup | The  Guardian

পরবর্তী সময়ে শীতল যুদ্ধের যুগেও একই চিত্র দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী বিশ্ব এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক ব্লক আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনকে নিজেদের রাজনৈতিক সক্ষমতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছে। অলিম্পিকের পদকজয় কিংবা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সাফল্যকে কেবল খেলাধুলার অর্জন হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার কার্যকারিতার প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হতো। খেলোয়াড়দের সাফল্যের পেছনে তখন জাতীয় মর্যাদার লড়াইও সমানভাবে কাজ করত।

ফুটবল বিশ্বকাপে অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘ সময় প্রধান শক্তি হয়ে উঠতে পারেনি। ফলে বিশ্বকাপের শিরোপা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা মূলত ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবু বিশ্বকাপের প্রতিটি আসর আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতাকে কোনো না কোনোভাবে প্রতিফলিত করেছে।

২০২৬ সালের আসরে সেই প্রবণতা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই আয়োজক দেশের নানা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বিতর্কের জন্ম দেয়। বিশেষ করে কয়েকটি আফ্রিকান দেশের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আচরণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সেনেগাল দলের সদস্যদের কঠোর নিরাপত্তা তল্লাশি, কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের প্রতিনিধিদের ভিসা জটিলতা এবং ফিফা মনোনীত সোমালি রেফারিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা না দেওয়ার ঘটনাগুলো ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

সমালোচকদের মতে, এসব সিদ্ধান্তে বৈষম্যের ইঙ্গিত ছিল এবং আফ্রিকান প্রতিনিধিদের ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় কঠোরতা দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সমর্থকেরা যুক্তি দেন, ১১ সেপ্টেম্বরের পর গড়ে ওঠা নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হিসেবেই এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাদের মতে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য, বৈষম্য নয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এমন ব্যাখ্যা সব পক্ষকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি।

Iran ready to focus on football amid political tensions as World Cup  campaign begins in US | The Business Standard

ইরানের জাতীয় দলকে ঘিরেও আরেক দফা রাজনৈতিক বিতর্ক দেখা দেয়। দলটির অবস্থান, প্রতিনিধি দলের আকার এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমের ওপর আরোপিত বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা তেহরানের তীব্র অসন্তোষের কারণ হয়। এসব পদক্ষেপের জন্য শুধু আয়োজক দেশ নয়, ফিফাও সমালোচনার মুখে পড়ে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে এসব অভিযোগের বিস্তারিত জবাব দেয়নি, অনেক পর্যবেক্ষক দুই দেশের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনাকেই এই ব্যবস্থার পেছনের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

বিশ্বকাপ চলাকালে আরেক ধরনের বিতর্কও সামনে আসে। বিভিন্ন মহলে অভিযোগ ওঠে, টুর্নামেন্টের ফলাফল প্রভাবিত করার চেষ্টা হয়েছে এবং নির্দিষ্ট একটি দলকে সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। যদিও শেষ পর্যন্ত সেই দল শিরোপা জিততে না পারায় অভিযোগগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়ে। তবু এমন বিতর্ক দেখিয়ে দেয়, বিশ্বকাপে কেবল খেলার বিশ্লেষণই নয়, রাজনৈতিক সন্দেহ ও ষড়যন্ত্রের আলোচনাও সমান গুরুত্ব পায়।

সবচেয়ে বেশি আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে ফিফা সভাপতির কাছে একটি লাল কার্ড বাতিলের অনুরোধ। বিষয়টি পরে ফিফার সংশ্লিষ্ট কমিটিতে পাঠানো হয় এবং নজিরবিহীনভাবে সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনও করা হয়। এই ঘটনায় অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, আন্তর্জাতিক ফুটবলের নিয়মকানুন কি রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে থাকতে পারছে? যদিও সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড়ের অংশগ্রহণ শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজয় ও বিদায় থেকে রক্ষা করতে পারেনি, তবু ঘটনাটি খেলাধুলার স্বাধীনতা নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করে।

Saudi Arabia officially announced as host for Fifa World Cup 2034 | FIFA World  Cup 2022 News - Business Standard

এসব ঘটনার প্রতিটিই আলাদা। কোথাও নিরাপত্তা, কোথাও কূটনৈতিক বৈরিতা, কোথাও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, আবার কোথাও ক্ষমতার প্রভাবের অভিযোগ। কিন্তু সবকটির কেন্দ্রে একটি সাধারণ বাস্তবতা রয়েছে—বিশ্বকাপ এখন আর কেবল ফুটবল নয়। এটি এমন একটি বৈশ্বিক মঞ্চ, যেখানে রাষ্ট্রের স্বার্থ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, কূটনৈতিক বার্তা এবং রাজনৈতিক অবস্থান অনিবার্যভাবে উপস্থিত থাকে।

তাই খেলাধুলাকে রাজনীতি থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করার দাবি যত আকর্ষণীয়ই শোনাক না কেন, বাস্তব অভিজ্ঞতা ভিন্ন কথা বলে। সংগঠিত আন্তর্জাতিক ক্রীড়ার ইতিহাস দেখায়, রাজনীতি ও খেলাধুলা দীর্ঘদিন ধরেই একে অপরকে প্রভাবিত করে এসেছে। সময়ের সঙ্গে সেই প্রভাবের ধরন বদলেছে, বিতর্কের বিষয় পরিবর্তিত হয়েছে, কিন্তু সম্পর্কটি কখনো বিচ্ছিন্ন হয়নি।

ভবিষ্যতের বিশ্বকাপ আরও বড় হবে, আরও বেশি দেশ অংশ নেবে এবং বৈশ্বিক গুরুত্বও বাড়বে। ফলে রাজনৈতিক বিতর্কও যে আরও জটিল রূপ নেবে, সে সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ফুটবলের আসল লড়াই অবশ্যই মাঠে নির্ধারিত হওয়া উচিত। কিন্তু বিশ্ব রাজনীতির বাস্তবতায় সেই মাঠের চারপাশে যে আরেকটি অদৃশ্য প্রতিযোগিতা সবসময় চলতে থাকে, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ তা আবারও মনে করিয়ে দিল।