দিল্লির হাউজ রানি এলাকায় গত ৩ জুন ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ২৩ জনের মৃত্যুর ঘটনায় ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ের তদন্তে উঠে এসেছে একের পর এক প্রশাসনিক ব্যর্থতার চিত্র। ১১১ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একাধিক সরকারি সংস্থার অবহেলা, নজরদারির ঘাটতি এবং দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়ম উপেক্ষা করার কারণেই অবৈধভাবে সম্প্রসারিত একটি ভবন বেড অ্যান্ড ব্রেকফাস্ট (বি অ্যান্ড বি) হিসেবে পরিচালিত হতে পেরেছিল। প্রতিবেদনে এমনও অভিযোগ করা হয়েছে যে, কিছু কর্মকর্তা ইচ্ছাকৃতভাবে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করেছেন।
দিল্লি সরকারের প্রধান সচিবের দপ্তরে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে দিল্লি পুলিশ, মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন অব দিল্লি (এমসিডি), দিল্লি সরকারের পর্যটন বিভাগ এবং বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থা বিএসইএস রাজধানি পাওয়ার লিমিটেড (বিআরপিএল)-এর বিভিন্ন ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভবনের মালিক, ব্যবস্থাপনা ও কর্মীদেরও অবৈধ নির্মাণ এবং নিরাপত্তাবিধি উপেক্ষার জন্য দায়ী করা হয়েছে।
অবৈধ নির্মাণ থামানোর সুযোগ হারায় কর্তৃপক্ষ
তদন্তে বলা হয়েছে, একাধিক পর্যায়ে অবৈধ নির্মাণ বন্ধ করার সুযোগ থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। বিশেষ করে দিল্লি পুলিশ, পর্যটন বিভাগ এবং এমসিডির ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে। প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, বছরের পর বছর ধরে চলা বিভিন্ন আইন লঙ্ঘনের ঘটনা উপেক্ষা করা হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে কর্মকর্তারা তথ্য গোপন করেছেন।
পুলিশের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ
মালব্য নগর থানার অধীন এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এমসিডি ২০১৯ সালের নভেম্বর এবং ২০২০ সালের জানুয়ারিতে নির্মাণকাজ বন্ধের নির্দেশ দিলেও তা কার্যকর হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ করা হয়েছে, তৎকালীন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (এসএইচও) ২০১৯ সালের অবৈধ নির্মাণসংক্রান্ত অভিযোগ এবং ২০২০ সালে ভবনমালিকের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া এফআইআরের তথ্যও গোপন করেছিলেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুলিশ জানার পরও অবৈধ নির্মাণ চলতে দিয়েছে এবং বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছেও তোলা হয়নি। এমনকি বিট পর্যায়ের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ভবনমালিকের সঙ্গে যোগসাজশের ইঙ্গিতও দেওয়া হয়েছে।
পর্যটন বিভাগের পরিদর্শনেও অনিয়ম
তদন্তে পর্যটন বিভাগের পরিদর্শন কমিটির ভূমিকাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভবনটিতে বেজমেন্ট না থাকার তথ্য দেখিয়ে এবং মাত্র চারতলা নির্মিত হয়েছে বলে উল্লেখ করে লাইসেন্স অনুমোদন দেওয়া হয়, যদিও পরিদর্শন নথিতেই ভূগর্ভস্থ অংশে যাওয়ার সিঁড়ির নকশা ছিল।
এছাড়া ভবনটিতে অগ্নিনিরাপত্তা সনদ (ফায়ার এনওসি) না থাকা সত্ত্বেও নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, অগ্নিনিরাপত্তা ও বায়ু চলাচলের মান পূরণ হয়েছে বলে চেকলিস্টে উল্লেখ করা হয়। তদন্তে বলা হয়েছে, কয়েকটি অতিথিকক্ষে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা না থাকায় শ্বাসরোধে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
এমসিডি ও বিদ্যুৎ সংস্থার ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে
এমসিডি একাধিকবার নোটিশ জারি, অভিযোগ দায়ের এবং আইনগত পদক্ষেপ নিলেও অবৈধ নির্মাণ শেষ পর্যন্ত সম্পন্ন হয়। ২০২০ সালে এমসিডি ভবনের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার অনুরোধ জানালেও বিআরপিএল তা কার্যকর না করে ভবন ভাঙার সময়সূচি জানতে চেয়েছিল। তদন্তে এই পদক্ষেপকে নির্দেশনার ভুল ব্যাখ্যা এবং ইচ্ছাকৃত অবহেলা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
তবে প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়েছে, বিদ্যুৎ সংযোগ, মিটার বা বিতরণব্যবস্থায় শর্ট সার্কিটের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ বিদ্যুৎ অবকাঠামোকে অগ্নিকাণ্ডের উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি।
কীভাবে আগুন ছড়ায়
তদন্ত অনুযায়ী, ৩ জুন সকাল সাড়ে ৮টার দিকে রান্নাঘরে একটি বৈদ্যুতিক এয়ার ফ্রায়ারের কাছ থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। পরে এলপিজি পাইপে আগুন ধরে গ্যাস লিকেজ সৃষ্টি হলে দ্রুত ধোঁয়া ভবনের নিচতলা, প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় ছড়িয়ে পড়ে।
সাক্ষ্য অনুযায়ী, সকাল ৮টা ১৫ থেকে ৮টা ৪৫ মিনিটের মধ্যে জরুরি নম্বরে ফোন করা হলেও দমকলের গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছায় সকাল ৯টা ১৫ থেকে ৯টা ৩০ মিনিটের মধ্যে।
ভবনমালিকের বিরুদ্ধে মামলা
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূলত আড়াই তলা ভবনটি ২০২৩ সালে কেনার পর মালিক লাভকেশ বাজাজ অনুমোদন ছাড়াই চারতলা পর্যন্ত সম্প্রসারণ করেন। একই বছর নিচতলায় একটি রেস্তোরাঁ চালু করা হয় এবং ছাদে আরও দুটি কক্ষ নির্মাণ করা হয়।
ঘটনার পর ভবনমালিক লাভকেশ বাজাজ, রাঁধুনি কেশব নেগি এবং জয় মিশ্রকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে মানবজীবন বিপন্ন করা, হত্যাসদৃশ অপরাধ এবং অগ্নিসংক্রান্ত অপরাধসহ একাধিক ধারায় মামলা হয়েছে।
সংস্কারের সুপারিশ
ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে তদন্ত প্রতিবেদনে বাণিজ্যিক ভবনের নিয়মিত কাঠামোগত নিরীক্ষা, পর্যায়ক্রমিক নিরাপত্তা পরিদর্শন, ঝুঁকি মানচিত্র তৈরি, মহড়া পরিচালনা এবং অগ্নিনিরাপত্তা বিধি কঠোরভাবে বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া, দিল্লি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে আধুনিক সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষিত জনবল দিয়ে শক্তিশালী করা এবং সংশ্লিষ্ট এলাকায় অতিরিক্ত দমকলের গাড়ি মোতায়েনেরও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















