ডোনাল্ড ট্রাম্পের মালিকানাধীন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান এবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গণ্ডি পেরিয়ে পরমাণু সংযোজন শক্তির ব্যবসায় ঢুকতে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যে পরমাণু সংযোজন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান টিএই টেকনোলজিসের সঙ্গে একীভূত হওয়ার চুক্তি করেছে ট্রাম্প মিডিয়া অ্যান্ড টেকনোলজি। চুক্তিটি সম্পন্ন হলে প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের একটি নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি হতে পারে।
এই উদ্যোগের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন নিউ জার্সিভিত্তিক বিনিয়োগকারী মার্ক অ্যাঞ্জেলো। তার প্রতিষ্ঠান ইয়র্কভিল অ্যাডভাইজার্স দীর্ঘদিন ধরে ট্রাম্পের গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন ও বিভিন্ন ব্যবসায়িক চুক্তিতে যুক্ত রয়েছে। লোকসানে থাকা ট্রাম্প মিডিয়ার ব্যবসা ঘুরিয়ে দাঁড় করাতে নতুন পথ খোঁজার সময়ই পরমাণু সংযোজন শক্তিতে প্রবেশের পরিকল্পনা সামনে আসে।
পরমাণু সংযোজন শক্তিতে বড় বাজি
চুক্তি অনুযায়ী, টিএই টেকনোলজিস নতুন প্রতিষ্ঠানে প্রবেশের পাশাপাশি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে ট্রাম্প মিডিয়ার কাছ থেকে সর্বোচ্চ ৩০ কোটি ডলার নগদ অর্থ পাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
পরমাণু সংযোজন প্রযুক্তিকে ভবিষ্যতের শক্তির অন্যতম সম্ভাবনাময় উৎস হিসেবে দেখা হলেও এটি এখনো বাণিজ্যিকভাবে পুরোপুরি সফল হয়নি। তাই এই ব্যবসায় ট্রাম্প মিডিয়ার প্রবেশকে বড় ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
শেয়ারের দরপতনের পর নতুন কৌশল
ট্রাম্প মিডিয়ার জন্য এই চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির দুর্বল আর্থিক অবস্থার কারণে। ২০২৪ সালের মার্চে শেয়ারের সর্বোচ্চ দরের তুলনায় প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের মূল্য ৮০ শতাংশের বেশি কমেছে। এতে ৬০০ কোটি ডলারের বেশি বাজারমূল্য হারিয়েছে কোম্পানিটি।
চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে প্রতিষ্ঠানটির বিক্রি ১০ লাখ ডলারেরও কম ছিল। একই সময়ে বিটকয়েনের দরপতনসহ বিভিন্ন কারণে প্রায় ৪০ কোটি ৬০ লাখ ডলার নিট লোকসান হয়েছে। ফলে নতুন ব্যবসায় প্রবেশের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির মূল্য বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসা ছড়িয়ে পড়ছে
ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসা সাম্প্রতিক সময়ে শুধু গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সীমাবদ্ধ নেই। ক্রিপ্টোকারেন্সি, ড্রোন, খনিজ সম্পদ এবং এখন পরমাণু সংযোজন শক্তির মতো বিভিন্ন খাতে তাদের ব্যবসায়িক উপস্থিতি বাড়ছে।
এ ধরনের সম্প্রসারণে একটি নির্দিষ্ট কৌশলও দেখা যাচ্ছে। নতুন করে কোনো শিল্প গড়ে তোলার বদলে আগে থেকেই ওই খাতে থাকা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত হয়ে নতুন ব্যবসায় প্রবেশের চেষ্টা করা হচ্ছে। ট্রাম্প পরিবারের পারিবারিক ট্রাস্ট ট্রাম্প মিডিয়ার প্রায় ৪১ শতাংশের মালিক এবং একীভূত প্রতিষ্ঠানে বড় অংশীদারিত্ব ধরে রাখবে।
স্বার্থের সংঘাত নিয়ে প্রশ্ন
ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড যত বিস্তৃত হচ্ছে, ততই স্বার্থের সংঘাত নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট একই সময়ে ক্রিপ্টোকারেন্সি, পরমাণু শক্তি ও অন্যান্য শিল্পে পারিবারিক বিনিয়োগের সঙ্গে যুক্ত থাকায় বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
তবে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্টের সম্পদ স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনায় রয়েছে এবং এতে কোনো স্বার্থের সংঘাত নেই।
ইয়র্কভিলের ভূমিকা ঘিরেও নজরদারি
ট্রাম্প মিডিয়ার সঙ্গে চুক্তিটি সফল হলে ইয়র্কভিল অ্যাডভাইজার্সকে প্রায় ৬০ লাখ শেয়ার দেওয়ার কথা রয়েছে। বর্তমান মূল্য অনুযায়ী এসব শেয়ারের দাম ৫ কোটি ডলারের বেশি হতে পারে।
ইয়র্কভিল এর আগেও ট্রাম্প মিডিয়ার সঙ্গে বড় ধরনের অর্থায়ন চুক্তিতে যুক্ত ছিল। প্রতিষ্ঠানটি ট্রাম্প মিডিয়ার প্রায় ৪৫ কোটি ডলারের শেয়ার ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ ছাড়ে কিনেছিল। পরে ক্রিপ্টোকারেন্সি-ভিত্তিক ব্যবসায়ও বিনিয়োগ বাড়ায়।
এদিকে ইয়র্কভিলের সঙ্গে ট্রাম্প পরিবারের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়িক সম্পর্ক নিয়েও মার্কিন কংগ্রেসে প্রশ্ন উঠেছে। একটি বিশেষ উদ্দেশ্যভিত্তিক অধিগ্রহণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায় শত শত কোটি ডলার প্রবাহিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে কি না, তা নিয়ে তদন্তের জন্য তথ্য চাওয়া হয়েছে।
সফল হলে বড় অঙ্কের লাভের আশা
মার্ক অ্যাঞ্জেলোর দৃষ্টিতে টিএই টেকনোলজিসের সঙ্গে চুক্তিটি সফল হলে এর আর্থিক ফল অত্যন্ত বড় হতে পারে। তবে পরমাণু সংযোজন প্রযুক্তি এখনো বাণিজ্যিক সাফল্যের পরীক্ষায় পুরোপুরি উত্তীর্ণ হয়নি। ফলে ট্রাম্প মিডিয়ার জন্য এটি যেমন নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলতে পারে, তেমনি বড় ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।
ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য নতুন নতুন খাতে ছড়িয়ে পড়ার এই প্রবণতা ভবিষ্যতে আরও কতটা বিস্তৃত হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
ট্রাম্প মিডিয়ার পরমাণু সংযোজন শক্তিতে প্রবেশ নতুন ব্যবসার সম্ভাবনা তৈরি করলেও প্রযুক্তির অনিশ্চয়তা ও স্বার্থের সংঘাত নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
Sarakhon Report 



















