ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত ১৯৭৫ সালের ২৫ জুন দিল্লির রামলীলা ময়দানে বিশাল জনসমাবেশ করেছিলেন সর্বোদয় নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণ (জেপি)। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে আন্দোলন আরও জোরদার করতে আয়োজিত ওই সমাবেশে তিনি ইন্দিরা গান্ধীর পদত্যাগ দাবি করেন এবং আলাহাবাদ হাইকোর্টের নির্বাচনী অনিয়মসংক্রান্ত রায়ের বিরুদ্ধে তাঁর করা আপিলের শুনানি থেকে প্রধান বিচারপতি এ.এন. রায়কে বিরত থাকার আহ্বান জানান।
হিন্দুস্তান টাইমসের সংরক্ষিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, অল্প সময়ের নোটিশে কোনো বড় ধরনের জনসমাগমের প্রস্তুতি ছাড়াই অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে বিপুল মানুষের উপস্থিতি সে সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতির গুরুত্বকেই তুলে ধরেছিল।
বিচারপতির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন
জয়প্রকাশ নারায়ণ বলেন, প্রধান বিচারপতি এ.এন. রায়ের বিচারিক যোগ্যতা বা নিরপেক্ষতা নিয়ে তাঁর কোনো সন্দেহ নেই। তবে তিনি উল্লেখ করেন, তিনজন জ্যেষ্ঠ বিচারপতিকে উপেক্ষা করে এ.এন. রায়কে প্রধান বিচারপতি করা হয়েছিল। ফলে ইন্দিরা গান্ধীর মামলায় তাঁর রায় নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
তিনি বলেন, বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা বজায় রাখলেও বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতি মানুষের বিশ্বাস অটুট রাখা সমানভাবে জরুরি।

পদত্যাগের দাবিতে ধারালো বক্তব্য
প্রায় ৯০ মিনিটের বক্তব্যে জেপি মূলত ইন্দিরা গান্ধীর পদত্যাগের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। তিনি সুপ্রিম কোর্টের অন্তর্বর্তী আদেশ, আলাহাবাদ হাইকোর্টের রায় এবং কংগ্রেসের ভূমিকা নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেন।
তিনি ব্রিটিশ সংবিধান বিশেষজ্ঞ আইভার জেনিংসের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেন, একজন মন্ত্রীর শুধু সৎ হওয়াই যথেষ্ট নয়, তাঁকে সৎ বলেও জনগণের কাছে প্রতীয়মান হতে হবে।
জেপির দাবি ছিল, হাইকোর্ট শুধু নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগই প্রমাণ করেনি, রায়ে একাধিক ক্ষেত্রে ইন্দিরা গান্ধীর মৌখিক ও লিখিত সাক্ষ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। তাঁর ভাষায়, এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে বহাল থাকা উচিত কি না—এই প্রশ্নের জবাব জনতাই উচ্চস্বরে “না” বলে দিয়েছিল।
কংগ্রেসের ভেতরে ভিন্নমতের প্রতি আহ্বান
জেপি কংগ্রেসের তথাকথিত ‘ইয়াং টার্কস’ নেতাদের সাহসিকতার প্রশংসা করেন এবং অন্য কংগ্রেস নেতাদেরও তাঁদের পথ অনুসরণের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ইন্দিরা গান্ধীর বিরোধিতা করলে ভবিষ্যতে নির্বাচনে মনোনয়ন বা মন্ত্রিত্ব না পাওয়ার ভয় করা উচিত নয়। তাঁর মতে, ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেসের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সংকটের মুখে পড়েছে।

প্রশাসন, শিক্ষার্থী ও জনগণের প্রতি আহ্বান
সমাবেশে জয়প্রকাশ নারায়ণ সেনাবাহিনী, পুলিশ ও সরকারি কর্মচারীদের এমন কোনো নির্দেশ পালন না করার আহ্বান জানান, যা তাঁদের কাছে বেআইনি বলে মনে হয়। একই সঙ্গে তিনি বলেন, এই বক্তব্যের জন্য রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনা হলে তিনি বিচারের মুখোমুখি হতেও প্রস্তুত।
তিনি শিক্ষার্থীদেরও প্রস্তুত থাকতে বলেন, প্রয়োজনে ক্লাস বর্জন করে কারাবরণ করতে হলেও আন্দোলনে অংশ নিতে হবে। পাশাপাশি সরকারের সঙ্গে অসহযোগিতা এবং কর পরিশোধ থেকে বিরত থাকার সম্ভাবনাও তিনি উল্লেখ করেন, যদিও এর গুরুতর পরিণতির জন্য সবাইকে প্রস্তুত থাকার কথা বলেন।
সংসদ, গণমাধ্যম ও গণতন্ত্র নিয়ে সতর্কবার্তা
জেপি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, ইন্দিরা গান্ধী সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন এড়িয়ে যেতে পারেন, কারণ তিনি সংসদের মুখোমুখি হতে চাইবেন না। তাঁর মতে, যদি তা ঘটে, তবে সেটি হবে গণতান্ত্রিক রীতি ভেঙে কর্তৃত্ববাদী পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার শামিল।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, অল ইন্ডিয়া রেডিওকে সরকারি অর্থে পরিচালিত হলেও তা ইন্দিরা গান্ধীর ব্যক্তিগত প্রচারণার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এ অবস্থায় তথ্যমন্ত্রী আই.কে. গুজরালের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ গড়ে তোলার আহ্বানও জানান তিনি।
জয়প্রকাশ নারায়ণ তাঁর বক্তব্যের শেষদিকে বলেন, কেবল সচেতন জনমতই দেশকে সম্ভাব্য গণতান্ত্রিক সংকট থেকে রক্ষা করতে পারে।
ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশের কয়েক ঘণ্টা পরই ভারতে জরুরি অবস্থা জারি হয়, যা দেশের রাজনৈতিক গতিপথে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।
জরুরি অবস্থার আগে রামলীলা ময়দানে জয়প্রকাশ নারায়ণের ঐতিহাসিক সমাবেশে ইন্দিরা গান্ধীর পদত্যাগের দাবি ও গণতন্ত্র রক্ষার আহ্বান ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়কে স্মরণ করিয়ে দেয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















