চীনের দ্রুত বিকাশমান ডিজিটাল অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছেন খাদ্য সরবরাহকারী ডেলিভারি রাইডাররা। প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষের কাছে খাবার পৌঁছে দেওয়া এই কর্মীদের জীবন, সংগ্রাম, পারিবারিক বাস্তবতা এবং স্বপ্নকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত হয়েছে নতুন বই ড্রিমস অন স্কুটার্স: আ ক্যালাইডোস্কোপ অব ডেলিভারি রাইডার্স ইন চায়না। লেখক ইয়াং লিপিংয়ের এই সাহিত্যধর্মী অনুসন্ধানী গ্রন্থটি প্রায় দুই বছরের মাঠপর্যায়ের গবেষণা এবং প্রায় ১০০ জন ডেলিভারি রাইডারের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে রচিত।
ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজেস প্রেস থেকে প্রকাশিত ৩৩৯ পৃষ্ঠার বইটি চীনের ডেলিভারি শিল্পের বিস্তারের পাশাপাশি এই খাতের মানুষের জীবনকে কাছ থেকে তুলে ধরেছে।
ডেলিভারি সেবার দীর্ঘ ইতিহাস
চীনে খাবার সরবরাহের ধারণা নতুন নয়। সং রাজবংশের (৯৬০–১২৭৯) সময়েও নগরাঞ্চলের রেস্তোরাঁগুলোতে অনুরোধের ভিত্তিতে খাবার পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। দ্বাদশ শতকের বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘অ্যালং দ্য রিভার ডিউরিং দ্য ছিংমিং ফেস্টিভ্যাল’-এ এমন একটি দৃশ্য দেখা যায়, যেখানে এক কিশোর রেস্তোরাঁ থেকে হাতে বাটি ও চপস্টিক নিয়ে বের হচ্ছে। এটিকে প্রাচীন যুগের টেকঅ্যাওয়ে সেবার অন্যতম নিদর্শন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বর্তমানে সেই সেবা বিশাল ডিজিটাল শিল্পে পরিণত হয়েছে। ২০২৫-২০৩০ সময়কালের শিল্প প্রবণতা নিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চীনে তাৎক্ষণিক খুচরা সরবরাহ এখন পারিবারিক ভোগব্যয়ের ১৮.৭ শতাংশের সমান। একই সঙ্গে খাদ্য সরবরাহ খাতে কর্মরত মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ৫০ লাখেরও বেশি।
বিস্তৃত হচ্ছে ডেলিভারি অর্থনীতি
২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত চীনে প্রতিদিন গড়ে ২৩ কোটির বেশি খাদ্য সরবরাহের অর্ডার সম্পন্ন হয়েছে। একই সময়ে ডেলিভারি রাইডারদের মাসিক মধ্যম আয় দাঁড়ায় ৬,৮০০ ইউয়ান, যা ২০২০ সালের তুলনায় ৪৭ শতাংশ বেশি।
এই খাতে কর্মরতদের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই ১৯৯০-এর দশকে জন্মগ্রহণ করেছেন। প্রায় ২৪.৭ শতাংশের কলেজ বা তার বেশি শিক্ষাগত যোগ্যতা রয়েছে। আবার ৩৫.২ শতাংশ আগে কারখানায় কাজ করতেন, ৩১.৪ শতাংশ নিজস্ব ব্যবসা পরিচালনা করেছেন এবং প্রায় ৪০ শতাংশ খণ্ডকালীন রাইডার হিসেবে কাজ করেন।
তবে পরিসংখ্যানের বাইরেও রয়েছে তাদের ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক দায়িত্ব, সুখ-দুঃখ এবং প্রতিদিনের সংগ্রামের বাস্তব চিত্র। বইটি মূলত সেই অদেখা গল্পগুলোই সামনে এনেছে।

মানুষের গল্পেই জীবন্ত বই
ড্রিমস অন স্কুটার্স বইটি নয়টি বিষয়ভিত্তিক অধ্যায়ে সাজানো হয়েছে। এখানে পেশায় আসার কারণ, কাজের চ্যালেঞ্জ, পারিবারিক সম্পর্ক, ভালোবাসা, দৈনন্দিন জীবন এবং কোভিড-১৯ মহামারির সময় রাইডারদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার মতো নানা বিষয় উঠে এসেছে।
বইটিতে বেশ কয়েকজন রাইডারের বাস্তব জীবন তুলে ধরা হয়েছে। কেউ দিনে ৭০ থেকে ৮০টি অর্ডার সম্পন্ন করেন, কেউ স্বামী-স্ত্রী মিলে ডেলিভারি দেন। একজন ডেলিভারির ফাঁকে কবিতা লেখেন, কেউ সন্তানের চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে নিরলস কাজ করেন। আবার দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে কেউ দুটি অ্যাপার্টমেন্ট কিনতে সক্ষম হয়েছেন। তিন ভাই একসঙ্গে ডেলিভারির কাজ করে আয় ভাগাভাগি করেন, আরেকজন কখনও নিজের সন্তানকে পিঠে নিয়ে কাজ করেন। এমনও একজন রয়েছেন, যিনি এক পায়ে ভর করে মাত্র ৪১ সেকেন্ডে সাততলা সিঁড়ি ভেঙে একজন গর্ভবতী গ্রাহকের কাছে খাবার পৌঁছে দিয়েছিলেন। আরেকজন সাধারণ রাইডার থেকে স্টেশন ম্যানেজার এবং পরে জাতীয় পর্যায়ের আদর্শ কর্মীর স্বীকৃতি অর্জন করেছেন।
বিশ্বাস অর্জনের কঠিন পথ
লেখক ইয়াং লিপিং জানান, শুরুতে অধিকাংশ রাইডার কথা বলতে আগ্রহী ছিলেন না। কারণ, কথোপকথনে ব্যয় হওয়া প্রতিটি মিনিট মানে একটি সম্ভাব্য অর্ডার হারানো। তাদের উপার্জনের ওপর নির্ভর করে পরিবারের নিত্যপ্রয়োজন, সন্তানের খরচ, বয়স্ক বাবা-মায়ের চিকিৎসা এবং বাসাভাড়ার মতো ব্যয়।
তাদের জীবনকে আরও গভীরভাবে বোঝার জন্য লেখক এক পর্যায়ে একজন রাইডারের সঙ্গে সকাল সাতটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত পুরো কর্মদিবস কাটান এবং তার পরিবারের সঙ্গেও সময় কাটিয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করেন।
শ্রমের মর্যাদার দলিল
বইটি শুধু কঠোর পরিশ্রমের গল্প নয়; বরং মানবিকতা, আত্মমর্যাদা, সহনশীলতা এবং দায়িত্ববোধেরও একটি দলিল। এতে দেখানো হয়েছে, ডেলিভারি রাইডাররা শুধু নিজেদের পরিবারকেই সহায়তা করেন না, প্রয়োজনে অপরিচিত মানুষেরও পাশে দাঁড়ান এবং জরুরি পরিস্থিতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
প্রায় ১০০ জন রাইডারের জীবনকাহিনি তুলে ধরে বইটি চীনের ডিজিটাল অর্থনীতিকে সচল রাখা লাখো শ্রমজীবী মানুষের বাস্তবতা ও অবদানকে নতুনভাবে তুলে ধরেছে।
চীনের ডেলিভারি রাইডারদের জীবন নিয়ে নতুন বই; ১০০ কর্মীর গল্পে উঠে এসেছে সংগ্রাম, স্বপ্ন ও ডিজিটাল অর্থনীতির মানবিক বাস্তবতা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















