কেরালায় সংশোধিত ওয়াক্ফ আইন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে। বিরোধী দলনেতা পিনারাই বিজয়ন অভিযোগ করেছেন, সংশোধিত আইনের আওতায় ওয়াক্ফ বোর্ডে অমুসলিম সদস্য নিয়োগের বিষয়টি মেনে নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী ভি ডি সতীশন এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন জোট কার্যত সংঘ পরিবারের অবস্থানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে।
শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে বিজয়ন বলেন, বর্তমান সরকার ওয়াক্ফ আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যে অবস্থান নিয়েছে, তা আগের বাম গণতান্ত্রিক জোট সরকারের অবস্থান থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তাঁর দাবি, আগের সরকার ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সংবিধানের অধিকারকে গুরুত্ব দিয়ে সংশোধিত আইনের বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু এখন সেই অবস্থান থেকে সরে এসে বর্তমান সরকার নতুন আইন কার্যকর করার দিকে এগোচ্ছে।
বিজয়নের এই বক্তব্যের পর কেরালার রাজনীতিতে ওয়াক্ফ আইনকে ঘিরে পুরোনো বিতর্ক নতুন করে সামনে এসেছে। বিশেষ করে ওয়াক্ফ বোর্ডে অমুসলিম সদস্য রাখার বিষয়টি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ আরও স্পষ্ট হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগের জবাব দিলেন বিজয়ন
সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী ভি ডি সতীশন অভিযোগ করেছিলেন, ওয়াক্ফ বোর্ডে সদস্য নিয়োগের বিষয়টি নিয়ে পিনারাই বিজয়ন এমন বক্তব্য দিচ্ছেন, যা মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ তৈরি করতে পারে।
মুখ্যমন্ত্রীর এই অভিযোগের জবাবে বিজয়ন বলেন, তিনি কোনো সম্প্রদায়ের মানুষকে অন্য কারও বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছেন না। তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় হলো ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সংশোধিত ওয়াক্ফ আইনের বিরুদ্ধে আগের অবস্থান।
বিজয়নের দাবি, কেরালায় বাম গণতান্ত্রিক জোট সরকার যখন ক্ষমতায় ছিল, তখনও তিনি একই অবস্থান নিয়েছিলেন। এখন বিরোধী দলনেতা হিসেবেও তিনি সেই অবস্থানই ধরে রেখেছেন। তাঁর ভাষায়, ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষার প্রশ্নে তাঁর অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি।

ওয়াক্ফ বোর্ডে অমুসলিম সদস্য নিয়ে বিতর্ক
সংশোধিত ওয়াক্ফ আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বোর্ডে অমুসলিম সদস্য রাখার সুযোগ। এই বিষয়টিই কেরালার রাজনৈতিক বিতর্কের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
বিজয়ন বলেন, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নতুন ওয়াক্ফ বোর্ড গঠনের সময় অমুসলিমদের জন্য নির্ধারিত দুটি পদ খালি রাখা হয়েছিল। তাঁর দাবি, আগের বাম সরকার চাইলে ওই পদগুলোতে অমুসলিম সদস্য নিয়োগ করতে পারত। কিন্তু সরকার তা করেনি।
তিনি বলেন, শুধু পদ খালি রাখাই নয়, সংশোধিত ওয়াক্ফ আইনের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইও চালানো হয়েছিল। একই সঙ্গে কেরালা বিধানসভায় আইনটির বিরোধিতা করে একটি প্রস্তাবও নেওয়া হয়েছিল।
বিজয়নের বক্তব্য, এসব সিদ্ধান্তই প্রমাণ করে আগের সরকার কী অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার সেই অবস্থান থেকে সরে গেছে।
‘কংগ্রেসের মুখ্যমন্ত্রী কি বিজেপির মতো অবস্থান নেবেন?’
সংবাদ সম্মেলনে বিজয়ন সরাসরি প্রশ্ন তোলেন, একজন কংগ্রেসের মুখ্যমন্ত্রী কি বিজেপির অবস্থানের সঙ্গে একইভাবে চলবেন?
তাঁর অভিযোগ, সংশোধিত ওয়াক্ফ আইন নিয়ে বর্তমান সরকারের অবস্থান আগের অবস্থানের সঙ্গে মিলছে না। আগে যে আইনের বিরোধিতা করা হয়েছিল, এখন সেটিই বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
বিজয়ন বলেন, একটি রাজনৈতিক দলের ক্ষমতায় যাওয়ার পর তার অবস্থানে পরিবর্তন আসতেই পারে। কিন্তু ওয়াক্ফ আইন ও ধর্মীয় স্বাধীনতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অবস্থান বদলের বিষয়টি মানুষের সামনে পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করা দরকার।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী তাঁর বিরুদ্ধে এমন কিছু কথা বলেছেন, যা বাস্তব ঘটনার সঙ্গে মেলে না। তাঁর মতে, একজন মুখ্যমন্ত্রীর কাছ থেকে এমন বক্তব্য কাম্য নয়।
‘বিরোধিতা করলেই কি সাম্প্রদায়িক?’
ওয়াক্ফ বোর্ডে অমুসলিম সদস্য রাখার বিরোধিতা করাকে সাম্প্রদায়িক বক্তব্য হিসেবে দেখা হচ্ছে কি না, সে প্রশ্নও তোলেন বিজয়ন।
তিনি বলেন, কেউ যদি সংশোধিত ওয়াক্ফ আইনের কোনো নির্দিষ্ট বিধানের বিরোধিতা করেন, তাহলে শুধু সেই কারণে তাঁকে সাম্প্রদায়িক বলা যায় কি না, সেটি ভাবা দরকার।
বিজয়নের বক্তব্য, তিনি যে অবস্থান তুলে ধরছেন, সেটি নতুন কোনো অবস্থান নয়। কেরালায় ক্ষমতায় আসার আগেও কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোট সংশোধিত ওয়াক্ফ আইনের কিছু বিষয় নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল। এখন ক্ষমতায় এসে সেই অবস্থান বদলে ফেলা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তাঁর মতে, এই পরিবর্তনই সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি করছে।
বিধানসভার প্রস্তাবের কথাও মনে করিয়ে দিলেন
বিজয়ন বলেন, বাম গণতান্ত্রিক জোটের শাসনামলে কেরালা বিধানসভা সংশোধিত ওয়াক্ফ আইনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। সেই সময় আইনটির কয়েকটি পরিবর্তন নিয়ে আপত্তি জানানো হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, আগের সরকার বিষয়টি শুধু রাজনৈতিকভাবে নয়, আইনি পথেও মোকাবিলা করার চেষ্টা করেছিল। ফলে বর্তমান সরকারের সিদ্ধান্তকে আগের সরকারের সিদ্ধান্তের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে পার্থক্যটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে বলে দাবি করেন তিনি।
বিজয়নের অভিযোগ, বর্তমান সরকার আগের সিদ্ধান্তগুলোর দিকে না তাকিয়ে নতুনভাবে আইনটি কার্যকর করার দিকে এগিয়েছে।
‘সংঘ পরিবারের স্বার্থের সেবা’
বিজয়ন তাঁর বক্তব্যে বর্তমান সরকারের অবস্থানকে সংঘ পরিবারের স্বার্থের সঙ্গে মিল রয়েছে বলে অভিযোগ করেন। তাঁর দাবি, সংশোধিত ওয়াক্ফ আইন বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বর্তমান সরকার এমন একটি অবস্থান নিয়েছে, যা সংঘ পরিবারের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তিনি বলেন, এই অবস্থান কেরালার আগের সরকারের অবস্থানের সঙ্গে একেবারেই মেলে না। তাঁর অভিযোগ, বর্তমান সরকার এই বিষয়ে আগের অবস্থান থেকে পুরোপুরি সরে গেছে।
তবে এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে কেরালার রাজনীতিতে বিতর্ক আরও বাড়তে পারে। কারণ ওয়াক্ফ আইন শুধু একটি আইনি বিষয় নয়, এর সঙ্গে ধর্মীয় অধিকার, সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব এবং রাজনৈতিক অবস্থানের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও জড়িয়ে রয়েছে।

যন্তর মন্তরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পাশে বিজয়ন
ওয়াক্ফ আইন নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে দিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রতিও সমর্থন জানিয়েছেন পিনারাই বিজয়ন।
তিনি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেন। তাঁর এই বক্তব্যে একই সংবাদ সম্মেলনে ওয়াক্ফ আইন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের বিষয়টিও সামনে আসে।
সামনে আরও বাড়তে পারে রাজনৈতিক বিতর্ক
ওয়াক্ফ আইন বাস্তবায়ন নিয়ে কেরালায় ক্ষমতাসীন জোট ও বিরোধী জোটের মধ্যে যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে, তা এখন প্রকাশ্য। একদিকে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান বদলের অভিযোগ তুলছেন বিজয়ন। অন্যদিকে তাঁর বক্তব্যকে রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক বিভাজনের সঙ্গে যুক্ত করার অভিযোগ উঠেছে।
ফলে ওয়াক্ফ বোর্ডে সদস্য নিয়োগের বিষয়টি এখন কেরালার রাজনীতিতে শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। এটি ধর্মীয় স্বাধীনতা, সংখ্যালঘু অধিকার এবং রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বড় বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছে।
পিনারাই বিজয়নের সর্বশেষ বক্তব্যে সেই বিতর্ক আরও তীব্র হলো। আগামী দিনে এই বিষয়টি কেরালার রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
ওয়াক্ফ আইন নিয়ে কেরালায় রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ছে। পিনারাই বিজয়ন অভিযোগ করেছেন, সংশোধিত আইন বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার আগের অবস্থান থেকে সরে এসে সংঘ পরিবারের স্বার্থের সঙ্গে মিল রেখে চলছে।
ওয়াক্ফ আইন নিয়ে কেরালায় রাজনৈতিক সংঘাত
কেরালায় সংশোধিত ওয়াক্ফ আইন বাস্তবায়ন নিয়ে পিনারাই বিজয়নের তীব্র আপত্তি। মুখ্যমন্ত্রী ভি ডি সতীশন ও সরকারের অবস্থান নিয়ে তাঁর অভিযোগ ঘিরে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















