মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, বিশ্বজুড়ে তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগও তত বাড়ছে। হরমুজ প্রণালি, লোহিত সাগর ও কৃষ্ণসাগরে জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়তে পারে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বাজারে। আর সেখান থেকেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য তৈরি হতে পারে বড় রাজনৈতিক চাপ।
তিন গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে একসঙ্গে ঝুঁকি
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব অনেক। এর সঙ্গে লোহিত সাগর ও কৃষ্ণসাগরেও যদি জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে বাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে এই তিন নৌপথ ঘিরে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ায় তেলের দাম বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা সামনে এসেছে। যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে বিশ্বের বড় একটি অংশের তেল সরবরাহ এখন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
রাশিয়ার তেল ঠেকাতে গিয়ে নতুন জটিলতা
কৃষ্ণসাগর নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইউক্রেনকে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত নয় এমন তেলবাহী জাহাজে হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। কারণ, কাজাখস্তান থেকে ইউরোপের বাজারে তেল পৌঁছানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ কৃষ্ণসাগর দিয়ে যায়।
এই সরবরাহ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হলে ইউরোপের জ্বালানি বাজারে রাশিয়ার বাইরে থেকে আসা তেলের প্রবাহ আরও চাপে পড়তে পারে। ফলে একদিকে যুদ্ধের প্রভাব, অন্যদিকে পরিবহন ঝুঁকি—দুই দিক থেকেই তেলের বাজারে অস্থিরতা বাড়ছে।
মজুত কমছে, বাড়ছে উদ্বেগ
যুদ্ধ শুরুর দিকে বিশ্ববাজারে তেলের মজুত তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক অবস্থায় ছিল। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যে সেই মজুত অনেকটাই কমে এসেছে। এখন তা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছানোর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রও জরুরি তেল মজুত থেকে বিপুল পরিমাণ তেল বাজারে ছেড়েছে। পরিকল্পিত মজুতের ৬০ শতাংশের বেশি ইতোমধ্যে ব্যবহার করা হয়েছে। তবে গত এক মাসে সেই তেল বাজারে ছাড়ার গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এতদিন বাজারে যে অতিরিক্ত তেল ছিল, তা অনেকটাই ব্যবহার হয়ে গেছে। ফলে নতুন কোনো সংকট তৈরি হলে তা সামাল দেওয়ার সুযোগ আগের তুলনায় কমে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম বাড়ার আশঙ্কা
তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব দ্রুত পড়ে পেট্রলের দামে। যুক্তরাষ্ট্রের শোধনাগারগুলোও বর্তমানে প্রায় সর্বোচ্চ সক্ষমতায় চলছে। ফলে উৎপাদন আরও বাড়িয়ে বাজারে দাম কমানোর সুযোগ খুব বেশি নেই।
পরিস্থিতির উন্নতি না হলে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন পেট্রলের দাম ৪ থেকে সাড়ে ৪ ডলারে উঠতে পারে। সংকট যদি সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর পর্যন্ত চলতে থাকে, তাহলে দাম ৫ ডলারের কাছাকাছিও পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।
এমন পরিস্থিতি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। কারণ জ্বালানি ও পেট্রলের দাম সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। দাম বাড়লে পরিবহন থেকে শুরু করে খাদ্য ও অন্যান্য পণ্যের খরচও বেড়ে যেতে পারে।
যুদ্ধ দীর্ঘ হলে চাপ আরও বাড়বে
বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে উৎপাদন বাড়ানো কিংবা জরুরি মজুত থেকে আরও তেল ছাড়ার মতো কিছু পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হলেও সেগুলোর সুযোগ সীমিত হয়ে আসছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন নৌপথে নিরাপত্তা ঝুঁকি অব্যাহত থাকলে বাজারে সরবরাহ সংকট আরও গভীর হতে পারে।
সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল নিশ্চিত না হলে তেলের বাজারে চাপ কমার সম্ভাবনা কম। যুদ্ধের প্রভাব দীর্ঘ হলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে, আর সেই চাপ শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়তে পারে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের পকেটে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















