যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে টানা হামলা-পাল্টা হামলার পর অন্তত এক রাতের জন্য সংঘাতের গতি কিছুটা কমেছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরকে ঘিরে নতুন করে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
সংঘাতের সাময়িক বিরতি
প্রায় দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রথমবারের মতো রাতে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন কোনো হামলার ঘোষণা দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্রও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, নতুন কোনো হামলা বা হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
তবে এই সাময়িক বিরতি দুই দেশের মধ্যে চলমান সংঘাতের অবসান নির্দেশ করে না। গত মাসে হওয়া স্বল্পস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে পড়ার পর থেকে উভয় পক্ষ নিয়মিত পাল্টাপাল্টি হামলায় জড়িয়ে রয়েছে। সংঘাতের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি, যা বিশ্ব জ্বালানি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথ।
লোহিত সাগরে নতুন উত্তেজনা
ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী এ সপ্তাহে সৌদি আরবের জাহাজ চলাচলের ওপর সামুদ্রিক অবরোধ ঘোষণা করেছে। যদিও কিছু তেলবাহী জাহাজ চলাচল অব্যাহত রেখেছে, তবু হুথিরা বিভিন্ন জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এতে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
শনিবার ভোরে ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনীর একজন মুখপাত্র জানান, হুথিদের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। এর জবাবে হুথিরা দাবি করেছে, তারা সৌদি আরবের লোহিত সাগর উপকূলের দুটি এলাকার জ্বালানি স্থাপনায় রকেট ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ ওই এলাকায় সাময়িকভাবে নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করলেও ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানায়নি।

প্রতিবেশী দেশগুলোর সতর্কতা
রাতের মধ্যে প্রতিবেশী বাহরাইনেও বিমান হামলার সতর্ক সংকেত বাজানো হয়। তবে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় প্রতিদিনই ইরানের ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে থাকা কুয়েত শনিবার নতুন কোনো হামলার সতর্কতা জারি করেনি।
ট্রাম্পের সামনে সামরিক সিদ্ধান্ত
সংঘাত কিছুটা কমলেও পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির আশঙ্কা রয়ে গেছে। এ অবস্থায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার তাঁর শীর্ষ উপদেষ্টাদের সঙ্গে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ আরও জোরদার করার বিষয় নিয়ে বৈঠক করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
আগামী মঙ্গলবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠকেরও কথা রয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ মার্কিন-ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের পক্ষে নেতানিয়াহু আগেই অবস্থান নিয়েছিলেন।
ট্রাম্প অবশ্য শুক্রবার সাংবাদিকদের বলেন, সামরিক অভিযান আরও বাড়ানো হবে কি না, সে বিষয়ে তিনি এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। একই সঙ্গে তিনি জানান, হোয়াইট হাউস এখনও ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছে এবং তিনি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে তাড়াহুড়া করছেন না।
যুদ্ধের প্রভাব বাড়ছে
পঞ্চম মাসে প্রবেশ করা এই যুদ্ধ এখন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা বা দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করার লক্ষ্য অর্জনে যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত সফল হয়নি। বরং হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কার্যকর অবরোধ বিশ্ব জ্বালানি পরিবহন ও বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে।
সম্ভাব্য পরিস্থিতির কথা বিবেচনায় রেখে যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত যুদ্ধবিমান ও বোমারু বিমান মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করেছে বলে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
এদিকে যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। শুক্রবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম একসময় ব্যারেলপ্রতি ১০০ দশমিক ৯৫ ডলারে পৌঁছায়, পরে তা প্রায় ৯৮ ডলারে নেমে আসে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই বেঞ্চমার্ক তেলের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ‘লাভিন’ নামে একটি ট্যাংকার মার্কিন অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করলে সেটিকে অচল করে দেওয়া হয়। জাহাজটির ক্রুরা একাধিক সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেছিল বলে দাবি করা হয়েছে। তবে হতাহতের খবরের সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতে সাময়িক বিরতির মধ্যেও হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরে নতুন উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















