ভারতের দুর্গ, ফুলের বাজার, পুরোনো গলি আর সেতারের সুর—সব মিলিয়ে এবার নতুন এক গল্প বলতে যাচ্ছে বিশ্বখ্যাত পিরেলির ২০২৭ সালের দিনপঞ্জি। প্রথমবারের মতো পুরো আয়োজনের আলোকচিত্র ধারণ করা হয়েছে ভারতকে ঘিরে, আর এতে অংশ নিয়েছেন ভারতের বিভিন্ন প্রজন্ম ও পরিচয়ের আলোচিত নারীরা।
রাজস্থানের জয়পুরের উঁচু পাহাড়ে অবস্থিত প্রাচীন জয়গড় দুর্গের আবহে সোনালি সাজে খালি পায়ে দাঁড়িয়েছিলেন ভারতীয় মডেল ভাবিতা মান্ডাভা। একসময় নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে সাধারণ জীবন কাটানো এই তরুণী অল্প সময়ের মধ্যেই আন্তর্জাতিক ফ্যাশন অঙ্গনে পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন। এবার পিরেলির নতুন দিনপঞ্জিতে তাঁর উপস্থিতি যোগ করেছে আরও বড় মাত্রা।
ভারতীয় নারীর সৌন্দর্যের নতুন ভাষা
পিরেলির দিনপঞ্জি শুরু হয়েছিল ষাটের দশকে একটি ইতালীয় টায়ার প্রতিষ্ঠানের প্রচারণামূলক উপহার হিসেবে। সময়ের সঙ্গে এটি ফ্যাশন আলোকচিত্রের অন্যতম প্রভাবশালী প্রকাশনায় পরিণত হয়েছে। বিশ্বের বহু খ্যাতিমান মডেল ও তারকা এর পাতায় জায়গা পেয়েছেন।

তবে দীর্ঘদিন ধরে এই দিনপঞ্জি বৈচিত্র্যের অভাব এবং নারীর শরীরকে অতিরিক্ত যৌন আবেদননির্ভরভাবে উপস্থাপনের কারণে সমালোচিত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে সেই অবস্থান থেকে সরে এসে বিভিন্ন বয়স, পরিচয় ও পেশার নারীদের তুলে ধরার চেষ্টা দেখা যায়।
২০২৭ সালের আয়োজন যেন সেই পরিবর্তনের ধারাকেই আরও সামনে নিয়ে এসেছে। এবার ভারতের সৌন্দর্যকে একটি নির্দিষ্ট চেহারা বা প্রচলিত ধারণায় আটকে না রেখে নানা রূপে তুলে ধরা হয়েছে।
দুর্গ থেকে ফুলের বাজার—ছবিতে অন্য ভারত
এই আয়োজনের বিশেষত্ব শুধু ভারতীয় নারীদের অংশগ্রহণ নয়, ছবির পটভূমিতেও রয়েছে ভারতের নিজস্ব জীবন ও সংস্কৃতির ছাপ। দিল্লির পুরোনো শহরের ক্ষয়িষ্ণু দেয়াল, সরু গলি, ফুলের বাজার, পুরোনো সিনেমা হল থেকে শুরু করে রাজস্থানের ঐতিহাসিক স্থাপনা—সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হয়েছে ভিন্নধর্মী এক দৃশ্যপট।
এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ভারতের কিংবদন্তি আলোকচিত্রী রঘু রাই এবং নরওয়ের আলোকচিত্রী সলভে সুন্দসবো। তবে এপ্রিল মাসে রঘু রাইয়ের মৃত্যুর পর তাঁর অংশের কাজের দায়িত্ব নেন তাঁর মেয়ে অবনী রাই।
বাবার রেখে যাওয়া পথ অনুসরণ করা সহজ ছিল না অবনীর জন্য। কিন্তু কাজের মধ্যেই তিনি যেন বাবার স্মৃতি ও ভাবনাকে নতুনভাবে খুঁজে পেয়েছেন। ভারতের বিশাল বৈচিত্র্যকে একটি ছবির ধারায় সম্পূর্ণ তুলে ধরা সম্ভব নয়—এই উপলব্ধি থেকেই তিনি দেশটির নানা বৈপরীত্য ও পাশাপাশি থাকা বহু জীবনজগতকে ধরার চেষ্টা করেছেন।
সেতার হাতে অনুষ্কা শঙ্কর
দিনপঞ্জির অন্যতম আকর্ষণ অনুষ্কা শঙ্কর। সেতারকে আধুনিক সংগীতের নানা ধারার সঙ্গে মিলিয়ে নতুন শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেওয়া এই শিল্পী এবার পিরেলির পাতায় সেতার নিয়েই হাজির হচ্ছেন।
একসময় বিদেশে বেড়ে ওঠা দক্ষিণ এশীয়দের সৌন্দর্য ও পরিচয় নিয়ে যে সংকোচ কাজ করত, তা এখন অনেকটাই বদলে গেছে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, গত এক দশকে বিশ্বসংস্কৃতিতে দক্ষিণ এশীয়দের উপস্থিতি ও গ্রহণযোগ্যতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
নিজের পরিচয়েই থাকতে চান ভাবিতা
ভাবিতা মান্ডাভার কাছে এই আয়োজনের গুরুত্ব আরও আলাদা। পিরেলির অতীতের কিছু যৌন আবেদননির্ভর উপস্থাপনা নিয়ে তাঁর দ্বিধা ছিল। তবে এবারের আয়োজন তাঁকে নিজের সংস্কৃতি ও পরিচয়ের মধ্যে স্বচ্ছন্দ থাকার সুযোগ দিয়েছে বলেই মনে করেন তিনি।
ভারতীয় সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্যকে সামনে আনার উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও ভাবিতা মনে করেন, একজন নারীকে পুরো দেশ বা একটি জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসেবে দেখার চাপ থাকা উচিত নয়। তাঁর কাছে নিজের পরিচয়ের চেয়েও ব্যক্তি হিসেবে নিজের কাজ ও স্বাতন্ত্র্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

পদ্মা লক্ষ্মীর কাছে ফিরে আসার গল্প
দিনপঞ্জিতে জায়গা পেয়েছেন তামিলনাড়ুতে জন্ম নেওয়া মডেল, রন্ধনশিল্পী ও উপস্থাপক পদ্মা লক্ষ্মীও। ৫৫ বছর বয়সে তাঁর উপস্থিতি বয়সের প্রচলিত সৌন্দর্য-ধারণাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
ভারতে ফিরে এই আয়োজনের অংশ হতে গিয়ে নিজের শৈশব ও ভারতীয় নারীদের স্মৃতির সঙ্গে এক ধরনের আবেগঘন সংযোগ অনুভব করেছেন তিনি। তাঁর মতে, দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় নারীর সৌন্দর্যকে নির্দিষ্ট কিছু সংকীর্ণ ধারণার মধ্যে দেখা হয়েছে। অথচ ভারতীয় নারীর সৌন্দর্য আসলে বহু রকম, বহু মুখের এবং বহু অভিজ্ঞতার সমষ্টি।
ফ্যাশনে ভারতীয় কারুশিল্পের নতুন স্বীকৃতি
পিরেলির ভারতকেন্দ্রিক আয়োজন এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন আন্তর্জাতিক ফ্যাশনে ভারতীয় কারুশিল্প, কাপড়, সূচিকর্ম ও ঐতিহ্যবাহী নকশার গুরুত্ব নতুন করে আলোচিত হচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের বড় বড় ফ্যাশন প্রতিষ্ঠানের নকশায় ভারতীয় কারুশিল্পের প্রভাব থাকলেও সেই অবদানের স্বীকৃতি সবসময় যথাযথভাবে মেলেনি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের কারিগর ও ঐতিহ্যবাহী নকশাকে সামনে আনার প্রবণতা বাড়ছে।
এই বাস্তবতায় পিরেলির ২০২৭ সালের দিনপঞ্জি শুধু ফ্যাশনের আয়োজন নয়; বরং বিশ্বমঞ্চে ভারতীয় নারী, সংস্কৃতি, কারুশিল্প ও বহুমাত্রিক সৌন্দর্যের একটি নতুন দৃশ্যমানতাও তৈরি করছে।
ভারতের সৌন্দর্যকে এবার একক কোনো ছাঁচে নয়, বরং দুর্গের প্রাচীন দেয়াল, শহরের ব্যস্ত গলি, ফুলের বাজার, সেতারের তার আর নানা বয়সের নারীর আত্মবিশ্বাসে তুলে ধরা হয়েছে। আর সেখানেই পিরেলির নতুন দিনপঞ্জি হয়ে উঠেছে ভারতের বদলে যাওয়া বৈশ্বিক পরিচয়ের এক আকর্ষণীয় প্রতিচ্ছবি।
ভারতের মাটিতে পিরেলির ২০২৭ সালের দিনপঞ্জির এই আয়োজন তাই শুধু ফ্যাশনের গল্প নয়, বরং ভারতীয় নারীর বহুরূপী সৌন্দর্য ও আত্মপরিচয়েরও এক নতুন উদযাপন।


সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















