ভারতের তরুণ সমাজের অসন্তোষকে কেবল একটি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস বা চাকরির সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখলে বাস্তবতার বড় অংশই অদৃশ্য থেকে যাবে। সাম্প্রতিক বিক্ষোভগুলো এমন এক প্রজন্মের রাজনৈতিক ও সামাজিক মনস্তত্ত্বকে সামনে নিয়ে এসেছে, যারা বহু বছর ধরে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছে, উচ্চশিক্ষা অর্জন করেছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখেছে তাদের পরিশ্রম, প্রত্যাশা এবং নাগরিক মর্যাদা—সবকিছুই যেন অনিশ্চয়তার কাছে পরাজিত।
প্রশ্নফাঁসের ঘটনাগুলো ছিল এই জমে থাকা ক্ষোভের তাৎক্ষণিক উদ্দীপক। কিন্তু বিস্ফোরণের আসল জ্বালানি এসেছে দীর্ঘদিনের বেকারত্ব, দুর্বল শিক্ষাব্যবস্থা, রাষ্ট্রের প্রতি আস্থাহীনতা এবং মত প্রকাশের সংকুচিত পরিসর থেকে। ফলে দিল্লির জন্তর মন্তরের আন্দোলন শুধু একটি পরীক্ষা বাতিলের দাবি নয়; এটি একটি প্রজন্মের অস্তিত্বসংকটের বহিঃপ্রকাশ।
অপেক্ষার প্রজন্ম
ভারতের লক্ষ লক্ষ তরুণের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময় কেটে যাচ্ছে সরকারি চাকরির প্রস্তুতিতে। বছরের পর বছর ধরে একের পর এক প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নেওয়া, কোচিং, ধারদেনা, পারিবারিক চাপ এবং সামাজিক প্রত্যাশা—এসব মিলিয়ে তাদের জীবন যেন একটি দীর্ঘ অপেক্ষায় আটকে গেছে।
যখন সেই পরীক্ষাগুলো প্রশ্নফাঁস, প্রশাসনিক অনিয়ম বা বাতিল হওয়ার মতো ঘটনায় ভেঙে পড়ে, তখন ক্ষতিটা শুধু একটি পরীক্ষার নয়। ভেঙে যায় ভবিষ্যতের পরিকল্পনা, মানসিক স্থিতি এবং রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বাস। অনেক তরুণের কাছে সবচেয়ে বড় আঘাত চাকরি না পাওয়া নয়; বরং এই অনুভূতি যে তাদের কথা শোনার মতো কেউ নেই।
এই বিচ্ছিন্নতার অনুভূতিই সাম্প্রতিক প্রতিবাদকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

বিক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দু শুধু কর্মসংস্থান নয়
ভারতের যুবসমাজের ক্ষোভের তালিকা দীর্ঘ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। দক্ষতা উন্নয়নের সরকারি কর্মসূচি প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি। অন্যদিকে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বড় অংশ এমন কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে, যেখানে তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো মূল্য নেই।
ভারত কর্মসংস্থান প্রতিবেদন ২০২৪ দেখিয়েছে, দেশের মোট বেকার জনগোষ্ঠীর প্রায় ৮০ শতাংশই তরুণ। একই সঙ্গে সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে প্রধানমন্ত্রী কৌশল বিকাশ যোজনার আওতায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের মাত্র অল্প অংশ স্থায়ী কর্মসংস্থান পেয়েছে।
অর্থাৎ সমস্যা দক্ষতার ঘাটতিতে সীমাবদ্ধ নয়। মূল সংকট হলো অর্থনীতিতে পর্যাপ্ত মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়া।
এই বাস্তবতা তরুণদের মনে এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি করেছে। তারা যত বেশি শিক্ষিত হচ্ছে, তত বেশি অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হচ্ছে।
রাষ্ট্রের সঙ্গে দূরত্ব
আধুনিক গণতন্ত্রে নাগরিক ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক কেবল ভোটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সেই সম্পর্ক টিকে থাকে সংলাপ, জবাবদিহি এবং প্রতিক্রিয়াশীল প্রশাসনের ওপর।
কিন্তু যখন মানুষের অভিজ্ঞতা হয় যে অভিযোগ করেও লাভ নেই, আবেদন জানিয়েও সাড়া মেলে না, তখন অসন্তোষ ধীরে ধীরে রাজনৈতিক রূপ নিতে শুরু করে।
সাম্প্রতিক আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর অংশগ্রহণকারীরা কোনো একক রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতিনিধিত্ব করেন না। বিভিন্ন মত, অঞ্চল ও সামাজিক পটভূমির মানুষ একই প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়িয়েছেন। তাদের মধ্যে বামপন্থী ছাত্রসংগঠনের কর্মী যেমন আছেন, তেমনি অতীতে ক্ষমতাসীন দলকে সমর্থন করা তরুণও আছেন।
এই বৈচিত্র্য প্রমাণ করে যে ক্ষোভের উৎস দলীয় রাজনীতি নয়; বরং শাসনব্যবস্থার প্রতি গভীর হতাশা।

প্রতিবাদের নতুন ভাষা
এই আন্দোলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর সাংস্কৃতিক চরিত্র। গান, ব্যঙ্গ, মিম, স্লোগান এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে তরুণরা এমন এক রাজনৈতিক ভাষা তৈরি করেছে, যা প্রচলিত আন্দোলনের ধরন থেকে আলাদা।
তারা হয়তো তাৎক্ষণিক সমাধানের আশা করছে না। কিন্তু তারা এমন একটি পরিসর তৈরি করতে চাইছে, যেখানে নিজেদের অভিজ্ঞতা ও ক্ষোভ প্রকাশ করা সম্ভব।
অনেকের কাছে এই সমাবেশ তাই কেবল প্রতিবাদ নয়, বরং দীর্ঘ নীরবতার পর আবার একে অপরকে খুঁজে পাওয়ার সুযোগ।
জলবায়ু থেকে জীবনযাত্রার ব্যয়
চাকরি একমাত্র উদ্বেগ নয়। পরিবেশ ও জলবায়ু সংকটও নতুন প্রজন্মের দুশ্চিন্তার বড় কারণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কৃষি আয়ের অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক সংঘাতের প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
গ্রামীণ ভারতের অনেক শিক্ষিত তরুণ এমন বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে উচ্চশিক্ষা তাদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। কৃষক পরিবারের সন্তান হয়েও তারা কৃষিতে ফিরতে পারছে না, আবার শহরের শ্রমবাজারও তাদের গ্রহণ করছে না।
এই দ্বৈত সংকট সামাজিক হতাশাকে আরও গভীর করেছে।
মত প্রকাশের সংকুচিত পরিসর
আন্দোলনকারীদের অভিযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে ঘিরে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনামূলক বক্তব্য অপসারণ, প্রতিবাদ সমাবেশে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ কিংবা আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা—এসব ঘটনাকে অনেকে বৃহত্তর একটি প্রবণতার অংশ হিসেবে দেখছেন।
যখন মানুষ মনে করে তাদের কথা প্রকাশের সুযোগও সীমিত হয়ে যাচ্ছে, তখন ক্ষোভ আরও দ্রুত জমা হয়। কারণ তখন সমস্যা শুধু অর্থনৈতিক থাকে না; তা নাগরিক অধিকারের প্রশ্নেও রূপ নেয়।
দক্ষিণ এশিয়ার অভিজ্ঞতা
ভারত একা নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তরুণদের নেতৃত্বে বড় বড় গণআন্দোলন দেখা গেছে। কোথাও তা সরকার পরিবর্তনের পথ তৈরি করেছে, কোথাও নীতিগত পরিবর্তন আনতে বাধ্য করেছে, আবার কোথাও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের দাবিকে সামনে নিয়ে এসেছে।
এসব অভিজ্ঞতা দেখায়, তরুণদের আন্দোলন সাধারণত হঠাৎ জন্ম নেয় না। দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সংকট একসময় রাজনৈতিক বিস্ফোরণে রূপ নেয়।
তবে প্রতিটি আন্দোলনের পরিণতি এক নয়।
পরিবর্তনের সীমাবদ্ধতা
সব আন্দোলন কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে পারে না। ইতিহাস দেখায়, বহু জনসমর্থিত আন্দোলন প্রতীকী সাফল্য অর্জন করলেও প্রশাসনিক বা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রায়ই অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
ভারতের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন সামনে এসেছে। যদি আন্দোলনের দাবি নির্দিষ্ট ব্যক্তির পদত্যাগ বা তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষাব্যবস্থা, নিয়োগপ্রক্রিয়া বা কর্মসংস্থানের কাঠামোগত সংকট কতটা বদলাবে—সেটি অনিশ্চিত।
অন্যদিকে যদি আন্দোলন বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের রূপরেখা তৈরি করতে পারে, তবে তার প্রভাব আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
আশার সন্ধানে একটি প্রজন্ম
এই মুহূর্তে ভারতের তরুণ সমাজের সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত অর্থনৈতিক নয়, মানসিক। তারা শুধু চাকরি চায় না; তারা এমন একটি রাষ্ট্র চায়, যে রাষ্ট্র তাদের কথা শুনবে, তাদের সঙ্গে কথা বলবে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশ্বাসযোগ্য আশ্বাস দিতে পারবে।
একটি গণতন্ত্রের শক্তি কেবল তার নির্বাচনী ব্যবস্থায় নয়, বরং তার তরুণ নাগরিকদের আস্থায় নিহিত। যখন সেই আস্থা ক্ষয় হতে শুরু করে, তখন প্রশ্নফাঁস, বেকারত্ব বা শিক্ষার সংকট আলাদা আলাদা সমস্যা থাকে না। সেগুলো একসঙ্গে রাষ্ট্র ও সমাজের সম্পর্কের গভীর সংকটের প্রতীক হয়ে ওঠে।
ভারতের বর্তমান তরুণ প্রজন্মের আন্দোলন সেই সংকটেরই স্পষ্ট সতর্কবার্তা। এখন দেখার বিষয়, এই বার্তাকে শাসনব্যবস্থা একটি সাময়িক বিক্ষোভ হিসেবে দেখে নাকি ভবিষ্যতের জন্য জরুরি সংস্কারের আহ্বান হিসেবে গ্রহণ করে।
কুনাল পুরোহিত 



















