০৮:২৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬
চোখের সামনে যা দেখছেন, সব সত্য নয়: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বাড়ছে ভয়ংকর প্রতারণা ফিলিপাইনে ‘চীনা গুপ্তচর’ বিতর্কের আড়ালে ভয়ংকর প্রতারণা ও মানবপাচারের জাল জলবায়ু পরিবর্তনে কফি বিলুপ্তির শঙ্কা, হারিয়ে যাওয়া এক উদ্ভিদেই আশার আলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নতুন পথে বাংলাদেশ, সুদের হারভিত্তিক নীতি থেকে সরে আসার ভাবনা গ্যাস সংকট আরও তীব্র, ঢাকার লাখো চুলায় আগুন জ্বলছে না ডলারের নিখুঁত জাল নোট তৈরির ‘শিল্পী’কে ধরতে কলম্বিয়ায় অভিযান স্মার্টফোনের যুগেও আফ্রিকায় অপ্রতিরোধ্য রেডিও, তরুণদের কাছেও জনপ্রিয় আফ্রিকায় বৈদ্যুতিক যানবাহনের বিপ্লব, খরচ বাঁচাতে বাড়ছে ব্যবহার আফ্রিকায় ফিরছে মেগাপ্রকল্পের জোয়ার, দ্রুত প্রবৃদ্ধির আশায় বাড়ছে বড় বিনিয়োগ লেবনন পুনর্গঠনে বড় বাধা ভাঙা রাজনৈতিক ব্যবস্থা, সংকটে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব

সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু চুক্তি: জ্বালানি সহযোগিতার আড়ালে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন কৌশলগত সমীকরণ

সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বেসামরিক পরমাণু সহযোগিতা চুক্তি কেবল একটি জ্বালানি প্রকল্প নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। প্রথম দৃষ্টিতে চুক্তিটি বিদ্যুৎ উৎপাদন, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার উদ্যোগ বলে মনে হলেও, এর ভেতরে রয়েছে ইরানকে ঘিরে কৌশলগত হিসাব, যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা এবং সৌদি আরবের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রীয় রূপান্তরের পরিকল্পনা।

এই চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি এমন এক সময়ে হয়েছে যখন মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও বিস্তৃত হচ্ছে, ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে এবং সৌদি আরব নিজস্ব নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য হয়েছে।

পরমাণু শক্তির পথে সৌদির নতুন হিসাব

সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল রপ্তানিকারক দেশ। কিন্তু যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বহু বছর আগেই বুঝেছিলেন, শুধুমাত্র তেলের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতি ভবিষ্যতের জন্য টেকসই নয়। সেই উপলব্ধি থেকেই ‘ভিশন ২০৩০’-এর মাধ্যমে অর্থনীতিকে বহুমুখী করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়।

How AI Data Centers Are Reshaping the Electric Power Grid

এই রূপান্তর বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন বিপুল বিদ্যুৎ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ডেটা সেন্টার, মেগা অবকাঠামো প্রকল্প, শিল্পায়ন এবং আধুনিক নগর গড়ে তুলতে যে পরিমাণ বিদ্যুতের প্রয়োজন হবে, তা কেবল তেল ও গ্যাস দিয়ে পূরণ করা কঠিন। ফলে বেসামরিক পরমাণু বিদ্যুৎ সৌদি আরবের কাছে এখন শুধু বিকল্প জ্বালানি নয়, বরং অর্থনৈতিক আধুনিকায়নের অপরিহার্য ভিত্তি।

সৌদি কর্মকর্তারা আরও যুক্তি দেন, দেশটিতে ইউরেনিয়ামের খনিজ মজুত রয়েছে। সেই সম্পদ কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে নিজস্ব জ্বালানি উৎপাদন করলে বিদ্যুৎ খাত যেমন শক্তিশালী হবে, তেমনি রপ্তানির জন্য আরও বেশি তেল সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।

তবে সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি এই চিন্তাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। ইরানকে ঘিরে সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা দেখিয়ে দিয়েছে, শুধুমাত্র তেলনির্ভর অর্থনীতি রাজনৈতিক সংকটের সময় কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

চুক্তির সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ

যুক্তরাষ্ট্র ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ২০০৯ সালের বেসামরিক পরমাণু চুক্তিকে দীর্ঘদিন ‘স্বর্ণমান’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। সেখানে আবুধাবি নিজ দেশে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা ব্যবহৃত জ্বালানি পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ না করার অঙ্গীকার করেছিল।

সৌদি আরবের সঙ্গে নতুন চুক্তিতে সেই ধরনের বাধ্যবাধকতা নেই বলেই বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বরং ভবিষ্যতে সৌদি আরবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা যাচাই করার জন্য যৌথ সমীক্ষার কথা বলা হয়েছে। সমীক্ষা ইতিবাচক হলে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো সৌদি ভূখণ্ডেই সমৃদ্ধকরণ অবকাঠামো নির্মাণ ও পরিচালনা করতে পারবে।

The U.S.–Saudi Civilian Nuclear Agreement: Geo-Economics, Strategic  Competition, and the New Architecture of Middle

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার অতিরিক্ত তদারকি ব্যবস্থাও এই চুক্তির বাধ্যতামূলক অংশ নয়। ফলে অস্ত্র বিস্তার রোধে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ, প্রযুক্তি সরাসরি সৌদির হাতে না গেলেও দেশটির মাটিতে সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম শুরু হলে ভবিষ্যতের কৌশলগত বাস্তবতা বদলে যেতে পারে।

ওয়াশিংটনের হিসাব

এই চুক্তি শুধু সৌদি আরবের জন্য লাভজনক নয়; যুক্তরাষ্ট্রও এর মাধ্যমে একাধিক লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করছে।

প্রথমত, মার্কিন পরমাণু শিল্পের জন্য এটি বহু বিলিয়ন ডলারের নতুন বাজার সৃষ্টি করবে। দ্বিতীয়ত, উপসাগরীয় অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের মুখে সৌদি আরবকে আবারও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত অংশীদার হিসেবে ধরে রাখার সুযোগ তৈরি হবে।

এ ছাড়া ইরান ও হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে সৌদি নেতৃত্বকে রাজনৈতিকভাবে আশ্বস্ত করাও ওয়াশিংটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। অর্থাৎ এই সহযোগিতা যতটা প্রযুক্তিগত, ততটাই নিরাপত্তাকেন্দ্রিক।

ইরানের জন্য নতুন বার্তা

চুক্তির সবচেয়ে সংবেদনশীল প্রভাব পড়তে পারে ইরানের পরমাণু নীতিতে।

তেহরান বহুদিন ধরেই দাবি করে আসছে, তাদের পরমাণু কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। একই সঙ্গে তারা বলছে, পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির সদস্য হিসেবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার তাদের রয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, ইরান গোপনে অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছে।

Iran Moves to Increase Nuclear Enrichment After Top Scientist Killed - The  New York Times

যুদ্ধ শুরুর আগে ওয়াশিংটন ইরানের কাছে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বিদেশে সরিয়ে নেওয়া এবং সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করার দাবি জানিয়েছিল। তেহরান তা প্রত্যাখ্যান করে।

এখন যদি একই যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে নিজ ভূখণ্ডে পরমাণু জ্বালানি সমৃদ্ধকরণের সুযোগ দেয়, তাহলে ইরানের কাছে সেটি দ্বৈত মানদণ্ড হিসেবে প্রতীয়মান হতে পারে। এর ফলে ভবিষ্যৎ আলোচনায় ইরানের অবস্থান আরও কঠোর হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাও তখন আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে।

আব্রাহাম চুক্তির শর্ত কেন?

চুক্তি ঘোষণার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, সৌদি আরবকে অবশ্যই আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ দিয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। কিন্তু প্রথম ঘোষণায় এই শর্তের উল্লেখ ছিল না।

এই অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

২০২৩ সালে সৌদি আরব ও ইসরায়েল সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে অনেক দূর এগিয়েছিল। একই সময়ে ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডোরের পরিকল্পনাও সামনে আসে, যেখানে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকার কথা ছিল।

কিন্তু হামাসের ৭ অক্টোবরের হামলা এবং গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের পর সৌদি অবস্থান বদলে যায়। রিয়াদ এখন বলছে, ১৯৬৭ সালের সীমান্ত এবং পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিশ্বাসযোগ্য পথ তৈরি না হলে তারা ইসরায়েলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক করবে না।

A Nuclear Deal With Global Consequences: Inside the New U.S.-Saudi  Partnership - SDG News

বর্তমান বাস্তবতায় পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ, গাজার বড় অংশের সামরিক নিয়ন্ত্রণ এবং পূর্ব জেরুজালেমের দখল অব্যাহত থাকায় সেই সম্ভাবনা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় দুর্বল।

ফলে পরমাণু সহযোগিতা, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ এবং ফিলিস্তিন প্রশ্ন—এই তিনটি ইস্যু এখন একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে গেছে।

দীর্ঘ ছায়ার সূচনা

সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু চুক্তি তাৎক্ষণিকভাবে একটি জ্বালানি সহযোগিতা হিসেবে উপস্থাপিত হলেও এর প্রকৃত গুরুত্ব অনেক বিস্তৃত। এটি মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য, নিরাপত্তা স্থাপত্য, যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক কৌশল এবং ইরানের ভবিষ্যৎ পরমাণু অবস্থান—সব ক্ষেত্রেই নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে।

রিয়াদ অর্থনৈতিক আধুনিকায়নের জন্য পরমাণু শক্তিকে প্রয়োজনীয় মনে করছে, ওয়াশিংটন আঞ্চলিক অংশীদারিত্ব পুনর্গঠন করতে চাইছে, আর ইরান নিজের নিরাপত্তা ও সার্বভৌম অধিকারের যুক্তি সামনে রেখে অবস্থান আরও দৃঢ় করতে পারে।

ফলে এই চুক্তির প্রকৃত প্রভাব শুধু সৌদি আরবের বিদ্যুৎ উৎপাদনে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং এটি আগামী বহু বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতি, নিরাপত্তা এবং পরমাণু রাজনীতির অন্যতম নির্ধারক উপাদান হয়ে থাকার সম্ভাবনাই বেশি।

জনপ্রিয় সংবাদ

চোখের সামনে যা দেখছেন, সব সত্য নয়: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বাড়ছে ভয়ংকর প্রতারণা

সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু চুক্তি: জ্বালানি সহযোগিতার আড়ালে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন কৌশলগত সমীকরণ

০৭:০০:৫৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬

সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বেসামরিক পরমাণু সহযোগিতা চুক্তি কেবল একটি জ্বালানি প্রকল্প নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। প্রথম দৃষ্টিতে চুক্তিটি বিদ্যুৎ উৎপাদন, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার উদ্যোগ বলে মনে হলেও, এর ভেতরে রয়েছে ইরানকে ঘিরে কৌশলগত হিসাব, যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা এবং সৌদি আরবের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রীয় রূপান্তরের পরিকল্পনা।

এই চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি এমন এক সময়ে হয়েছে যখন মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও বিস্তৃত হচ্ছে, ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে এবং সৌদি আরব নিজস্ব নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য হয়েছে।

পরমাণু শক্তির পথে সৌদির নতুন হিসাব

সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল রপ্তানিকারক দেশ। কিন্তু যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বহু বছর আগেই বুঝেছিলেন, শুধুমাত্র তেলের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতি ভবিষ্যতের জন্য টেকসই নয়। সেই উপলব্ধি থেকেই ‘ভিশন ২০৩০’-এর মাধ্যমে অর্থনীতিকে বহুমুখী করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়।

How AI Data Centers Are Reshaping the Electric Power Grid

এই রূপান্তর বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন বিপুল বিদ্যুৎ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ডেটা সেন্টার, মেগা অবকাঠামো প্রকল্প, শিল্পায়ন এবং আধুনিক নগর গড়ে তুলতে যে পরিমাণ বিদ্যুতের প্রয়োজন হবে, তা কেবল তেল ও গ্যাস দিয়ে পূরণ করা কঠিন। ফলে বেসামরিক পরমাণু বিদ্যুৎ সৌদি আরবের কাছে এখন শুধু বিকল্প জ্বালানি নয়, বরং অর্থনৈতিক আধুনিকায়নের অপরিহার্য ভিত্তি।

সৌদি কর্মকর্তারা আরও যুক্তি দেন, দেশটিতে ইউরেনিয়ামের খনিজ মজুত রয়েছে। সেই সম্পদ কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে নিজস্ব জ্বালানি উৎপাদন করলে বিদ্যুৎ খাত যেমন শক্তিশালী হবে, তেমনি রপ্তানির জন্য আরও বেশি তেল সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।

তবে সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি এই চিন্তাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। ইরানকে ঘিরে সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা দেখিয়ে দিয়েছে, শুধুমাত্র তেলনির্ভর অর্থনীতি রাজনৈতিক সংকটের সময় কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

চুক্তির সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ

যুক্তরাষ্ট্র ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ২০০৯ সালের বেসামরিক পরমাণু চুক্তিকে দীর্ঘদিন ‘স্বর্ণমান’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। সেখানে আবুধাবি নিজ দেশে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা ব্যবহৃত জ্বালানি পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ না করার অঙ্গীকার করেছিল।

সৌদি আরবের সঙ্গে নতুন চুক্তিতে সেই ধরনের বাধ্যবাধকতা নেই বলেই বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বরং ভবিষ্যতে সৌদি আরবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা যাচাই করার জন্য যৌথ সমীক্ষার কথা বলা হয়েছে। সমীক্ষা ইতিবাচক হলে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো সৌদি ভূখণ্ডেই সমৃদ্ধকরণ অবকাঠামো নির্মাণ ও পরিচালনা করতে পারবে।

The U.S.–Saudi Civilian Nuclear Agreement: Geo-Economics, Strategic  Competition, and the New Architecture of Middle

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার অতিরিক্ত তদারকি ব্যবস্থাও এই চুক্তির বাধ্যতামূলক অংশ নয়। ফলে অস্ত্র বিস্তার রোধে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ, প্রযুক্তি সরাসরি সৌদির হাতে না গেলেও দেশটির মাটিতে সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম শুরু হলে ভবিষ্যতের কৌশলগত বাস্তবতা বদলে যেতে পারে।

ওয়াশিংটনের হিসাব

এই চুক্তি শুধু সৌদি আরবের জন্য লাভজনক নয়; যুক্তরাষ্ট্রও এর মাধ্যমে একাধিক লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করছে।

প্রথমত, মার্কিন পরমাণু শিল্পের জন্য এটি বহু বিলিয়ন ডলারের নতুন বাজার সৃষ্টি করবে। দ্বিতীয়ত, উপসাগরীয় অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের মুখে সৌদি আরবকে আবারও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত অংশীদার হিসেবে ধরে রাখার সুযোগ তৈরি হবে।

এ ছাড়া ইরান ও হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে সৌদি নেতৃত্বকে রাজনৈতিকভাবে আশ্বস্ত করাও ওয়াশিংটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। অর্থাৎ এই সহযোগিতা যতটা প্রযুক্তিগত, ততটাই নিরাপত্তাকেন্দ্রিক।

ইরানের জন্য নতুন বার্তা

চুক্তির সবচেয়ে সংবেদনশীল প্রভাব পড়তে পারে ইরানের পরমাণু নীতিতে।

তেহরান বহুদিন ধরেই দাবি করে আসছে, তাদের পরমাণু কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। একই সঙ্গে তারা বলছে, পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির সদস্য হিসেবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার তাদের রয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, ইরান গোপনে অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছে।

Iran Moves to Increase Nuclear Enrichment After Top Scientist Killed - The  New York Times

যুদ্ধ শুরুর আগে ওয়াশিংটন ইরানের কাছে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বিদেশে সরিয়ে নেওয়া এবং সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করার দাবি জানিয়েছিল। তেহরান তা প্রত্যাখ্যান করে।

এখন যদি একই যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে নিজ ভূখণ্ডে পরমাণু জ্বালানি সমৃদ্ধকরণের সুযোগ দেয়, তাহলে ইরানের কাছে সেটি দ্বৈত মানদণ্ড হিসেবে প্রতীয়মান হতে পারে। এর ফলে ভবিষ্যৎ আলোচনায় ইরানের অবস্থান আরও কঠোর হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাও তখন আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে।

আব্রাহাম চুক্তির শর্ত কেন?

চুক্তি ঘোষণার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, সৌদি আরবকে অবশ্যই আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ দিয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। কিন্তু প্রথম ঘোষণায় এই শর্তের উল্লেখ ছিল না।

এই অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

২০২৩ সালে সৌদি আরব ও ইসরায়েল সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে অনেক দূর এগিয়েছিল। একই সময়ে ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডোরের পরিকল্পনাও সামনে আসে, যেখানে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকার কথা ছিল।

কিন্তু হামাসের ৭ অক্টোবরের হামলা এবং গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের পর সৌদি অবস্থান বদলে যায়। রিয়াদ এখন বলছে, ১৯৬৭ সালের সীমান্ত এবং পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিশ্বাসযোগ্য পথ তৈরি না হলে তারা ইসরায়েলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক করবে না।

A Nuclear Deal With Global Consequences: Inside the New U.S.-Saudi  Partnership - SDG News

বর্তমান বাস্তবতায় পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ, গাজার বড় অংশের সামরিক নিয়ন্ত্রণ এবং পূর্ব জেরুজালেমের দখল অব্যাহত থাকায় সেই সম্ভাবনা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় দুর্বল।

ফলে পরমাণু সহযোগিতা, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ এবং ফিলিস্তিন প্রশ্ন—এই তিনটি ইস্যু এখন একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে গেছে।

দীর্ঘ ছায়ার সূচনা

সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু চুক্তি তাৎক্ষণিকভাবে একটি জ্বালানি সহযোগিতা হিসেবে উপস্থাপিত হলেও এর প্রকৃত গুরুত্ব অনেক বিস্তৃত। এটি মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য, নিরাপত্তা স্থাপত্য, যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক কৌশল এবং ইরানের ভবিষ্যৎ পরমাণু অবস্থান—সব ক্ষেত্রেই নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে।

রিয়াদ অর্থনৈতিক আধুনিকায়নের জন্য পরমাণু শক্তিকে প্রয়োজনীয় মনে করছে, ওয়াশিংটন আঞ্চলিক অংশীদারিত্ব পুনর্গঠন করতে চাইছে, আর ইরান নিজের নিরাপত্তা ও সার্বভৌম অধিকারের যুক্তি সামনে রেখে অবস্থান আরও দৃঢ় করতে পারে।

ফলে এই চুক্তির প্রকৃত প্রভাব শুধু সৌদি আরবের বিদ্যুৎ উৎপাদনে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং এটি আগামী বহু বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতি, নিরাপত্তা এবং পরমাণু রাজনীতির অন্যতম নির্ধারক উপাদান হয়ে থাকার সম্ভাবনাই বেশি।