শহরকেন্দ্রিক জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন শুধু মানুষের ওজন বা রক্তে শর্করার মাত্রাকেই প্রভাবিত করছে না, বদলে দিচ্ছে অন্ত্রে থাকা অণুজীবের গঠনও। আর এই পরিবর্তনের সঙ্গে ডায়াবেটিস, স্থূলতা ও উচ্চ রক্তচাপ বাড়ার যোগসূত্র থাকতে পারে বলে উঠে এসেছে নতুন এক গবেষণায়।
তিন বছর ধরে পরিচালিত গবেষণায় ভারত ও শ্রীলঙ্কার ১০টি জনগোষ্ঠীর ৫৭৫ জন প্রাপ্তবয়স্কের অন্ত্রের অণুজীব বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণাটিকে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর অন্ত্রের অণুজীব নিয়ে তৈরি প্রথম দিকের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভান্ডার হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শহর ও গ্রামের খাবারে বড় পার্থক্য
গবেষণায় দেখা গেছে, একই বংশগত বৈশিষ্ট্যের মানুষের মধ্যেও শহর ও গ্রামে বসবাসের কারণে অন্ত্রের অণুজীবের গঠনে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য তৈরি হচ্ছে। গবেষকদের মতে, এর প্রধান কারণ বংশগত পরিবর্তন নয়, বরং পরিবেশ ও খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন।
)
শহরে বসবাসকারী মানুষের খাদ্যতালিকায় প্রক্রিয়াজাত খাবার, বিস্কুট, কোমল পানীয়, পিৎজা ও বিভিন্ন ধরনের দ্রুত প্রস্তুত খাবারের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেশি। অন্যদিকে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ এখনো অপেক্ষাকৃত প্রাকৃতিক ও আঁশসমৃদ্ধ খাবারের ওপর নির্ভরশীল।
গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শহুরে খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে অন্ত্রের কিছু নির্দিষ্ট জীবাণুর উপস্থিতিও বাড়ছে। এর মধ্যে মেগামোনাস নামের একটি জীবাণু শহুরে মানুষের অন্ত্রে গ্রামীণ আত্মীয়দের তুলনায় বেশি পাওয়া গেছে। এই জীবাণুর সঙ্গে স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ ও রক্তে শর্করা বেড়ে যাওয়ার সম্পর্ক বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।
আঁশ কমলে হারিয়ে যাচ্ছে উপকারী জীবাণু
গবেষণায় হোল্ডেমানেলা নামের আরেকটি জীবাণুর বিপরীত চিত্র পাওয়া গেছে। আঁশসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ এবং শরীরের গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সম্পর্কিত এই জীবাণু নগরায়ণের সঙ্গে কমে যাচ্ছে বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন।
তবে ভারতের কেরালার কিছু জনগোষ্ঠীতে এই প্রবণতা তুলনামূলকভাবে কম। শহরে বসবাস শুরু করলেও তারা ঐতিহ্যবাহী খাবারের অভ্যাস অনেকাংশে ধরে রেখেছে। ফলে তাদের অন্ত্রের অণুজীবেও গ্রামীণ বৈশিষ্ট্যের কিছুটা ধারাবাহিকতা দেখা গেছে।
শুধু মাংস নয়, মূল সমস্যা প্রক্রিয়াজাত খাবার
:max_bytes(150000):strip_icc()/red-meat-GettyImages-1060835204-cb1029bfb7ef408aa62d037a88a4c748.jpg)
গবেষণার নেতৃত্ব দেওয়া বিজ্ঞানীদের মতে, শহুরে খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনকে শুধু মাংস খাওয়ার সঙ্গে যুক্ত করলে পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না। কারণ ভারতের অনেক অঞ্চলে গ্রাম ও শহর—দুই জায়গার মানুষই মাংস খেয়ে থাকে।
মূল পার্থক্য তৈরি হচ্ছে অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারের কারণে। বিস্কুট, কোমল পানীয়, প্যাকেটজাত খাবার কিংবা দ্রুত প্রস্তুত খাবারের নিয়মিত উপস্থিতিই অন্ত্রের জীবাণুর পরিবেশ বদলে দিতে পারে।
ভারতের ডায়াবেটিস পরিস্থিতি উদ্বেগজনক
ভারতে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় ৮ কোটি ৯৮ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশ্বে ডায়াবেটিস আক্রান্ত মানুষের সংখ্যার দিক থেকে চীনের পরেই ভারতের অবস্থান।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, আক্রান্তদের একটি বড় অংশ এখনো রোগ সম্পর্কে জানেন না। ভবিষ্যতে ভারতে ডায়াবেটিস আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা আরও দ্রুত বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
দ্রুত নগরায়ণ, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, কম শারীরিক পরিশ্রম এবং প্রক্রিয়াজাত খাবারের সহজলভ্যতা এই পরিস্থিতির পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে। নতুন গবেষণাটি সেই পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের অন্ত্রের অণুজীবের সম্পর্ককে আরও স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে।
এবার রোগের সঙ্গে জীবাণুর সরাসরি সম্পর্ক খুঁজবেন গবেষকেরা
গবেষণার পরবর্তী ধাপে অন্ত্রের অণুজীবগুলো শরীরে কী ধরনের রাসায়নিক উপাদান তৈরি করে, তা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে কোন জীবাণু কোন রোগের ঝুঁকি বাড়ায় বা কমায়, তা আরও নির্দিষ্টভাবে বোঝার চেষ্টা চলছে।
গবেষক দলটি এ বছরের শেষ নাগাদ প্রায় এক হাজার নমুনা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের লক্ষ্য নিয়েছে। এই গবেষণা সফল হলে ভবিষ্যতে খাদ্যাভ্যাস ও অন্ত্রের অণুজীবের পরিবর্তনের ভিত্তিতে ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বোঝার নতুন পথ তৈরি হতে পারে।
খাদ্যাভ্যাসেই থাকতে পারে প্রতিরোধের সুযোগ
গবেষণার ফলাফল থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হচ্ছে—নগরজীবনের সঙ্গে খাদ্যাভ্যাস বদলানোর প্রভাব শরীরের ভেতরেও গভীরভাবে পড়তে পারে। তাই অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারের বদলে আঁশসমৃদ্ধ, প্রাকৃতিক ও ঐতিহ্যবাহী খাবারকে গুরুত্ব দেওয়া অন্ত্রের সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















