সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে চার বছর ধরে টিকে থাকা ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি আবারও বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। পাল্টাপাল্টি হামলা বাড়তে থাকায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে পূর্ণমাত্রার সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে ইতোমধ্যে চাপের মুখে থাকা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে আরও অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ও হুথিদের মধ্যে সাম্প্রতিক হামলার মাত্রা বাড়ায় পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে উঠছে। বিশেষ করে সৌদি আরবের তেল অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হুথিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং ইয়েমেনে সৌদি বিমান হামলা দীর্ঘদিনের যুদ্ধবিরতিকে বড় প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
ইয়েমেনে সৌদি বিমান হামলা
শনিবার ইয়েমেনের উপকূলীয় হোদেইদা প্রদেশে সামরিক স্থাপনায় সৌদি বিমানবাহিনী হামলা চালায়। এর জবাবে হুথিরা সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানির জিজান ও ইয়ানবু অঞ্চলের স্থাপনা লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে বলে সৌদি পক্ষ জানিয়েছে।
ইয়ানবু ও দেশের পশ্চিম উপকূলের অন্যান্য স্থাপনা সৌদি আরবের তেল রপ্তানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। হামলায় এসব স্থাপনার কতটা ক্ষতি হয়েছে, তা সৌদি কর্তৃপক্ষ প্রকাশ করেনি।
এর কয়েক ঘণ্টা পর ইয়েমেনের মারিব ও আল-জাওফসহ কয়েকটি এলাকায় হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকেন্দ্র ও অস্ত্রভাণ্ডারে হামলা চালানো হয়। ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ইয়েমেনে এটি ছিল সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের প্রথম দিকের বড় বিমান হামলাগুলোর একটি।
চার বছরের যুদ্ধবিরতিতে বড় ধাক্কা
ইয়েমেনে দীর্ঘ সাত বছরের গৃহযুদ্ধের পর ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এর মাধ্যমে জ্বালানি আমদানি ও বিমান চলাচলের ওপর বিভিন্ন বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
পরের বছর সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করে। তবে রাজনৈতিক সমাধানের ক্ষেত্রে বড় অগ্রগতি হয়নি।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে সেই স্থিতিশীলতাই এখন ভেঙে পড়ার পথে। বিশেষ করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে হুথিদের তৎপরতা নতুন মাত্রা পেয়েছে।
বিমানবন্দর ঘিরে উত্তেজনার শুরু
জুলাইয়ের শুরুতে ইরানের রাজধানী তেহরান থেকে সরাসরি একটি বিমান ইয়েমেনের হুথি নিয়ন্ত্রিত রাজধানী সানায় অবতরণ করে। হুথিরা এটিকে সৌদি আরবের বিমান অবরোধের বিরুদ্ধে একটি পরীক্ষা হিসেবে দেখেছে।
এর কয়েক দিন পর হুথিরা অভিযোগ করে, সৌদি আরব বিমানবন্দরের রানওয়েতে বোমা হামলা চালিয়েছে। এতে ইরান থেকে আসা আরেকটি বিমানকে অন্যত্র সরিয়ে নিতে হয়।
সৌদি সমর্থিত ইয়েমেন সরকার ওই হামলার দায় স্বীকার করে। এরপরই পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যায়। হুথিরা সৌদি আরবের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি বেসামরিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় বলে রিয়াদ দাবি করে।
এরপর হুথিরা লোহিত সাগর দিয়ে সৌদি তেল পরিবহনের ওপর অবরোধের ঘোষণা দেয়। ফলে দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
ইরানের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ
সৌদি আরব ও হুথিদের সংঘাতের পেছনে ইরানের ভূমিকা নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইরান সরাসরি সৌদি আরবের সঙ্গে সংঘাতে না গিয়ে হুথিদের মাধ্যমে রিয়াদের ওপর চাপ বাড়ানোর সুযোগ নিতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে হুথিরাও নিজেদের রাজনৈতিক ও সামরিক স্বার্থ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে ইরানের প্রভাব থাকলেও তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ সরাসরি তেহরানের নির্দেশে হচ্ছে—এমন সরল ব্যাখ্যাও পরিস্থিতিকে পুরোপুরি তুলে ধরে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হুথিদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে। তারা এর জন্য সৌদি আরবের নেতৃত্বে ইয়েমেনের বন্দর ও আকাশপথে চলা বিধিনিষেধকে দায়ী করছে। ফলে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে তারা আরও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে।

তেল সরবরাহে নতুন ঝুঁকি
সৌদি-হুথি সংঘাতের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালিতে ইরানের চাপের কারণে তেল সরবরাহ নিয়ে এমনিতেই উদ্বেগ রয়েছে।
এর মধ্যেও সৌদি আরব লোহিত সাগর দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহনের ব্যবস্থা করে হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমিয়েছে। কিন্তু হুথিরা যদি লোহিত সাগর দিয়ে সৌদি তেল পরিবহনে বাধা বাড়ায়, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহের ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।
ইয়েমেনের মানুষের জন্য ভয়াবহ আশঙ্কা
নতুন করে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হলে সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হতে পারে ইয়েমেনের সাধারণ মানুষকে। দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের সময় দেশটিতে দুর্ভিক্ষ ও ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছিল।
চার বছর ধরে চলা তুলনামূলক শান্ত পরিবেশ ভেঙে গেলে খাদ্য, জ্বালানি ও চিকিৎসা সরবরাহ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বিমানবন্দর ও বন্দর ব্যবহারে বাধা বাড়লে দেশটির সাধারণ মানুষের দুর্ভোগও দ্রুত বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সৌদি আরব এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখে সীমিত প্রতিক্রিয়া দেখানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু হুথিদের হামলা ও পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ যেভাবে বাড়ছে, তাতে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধবিরতি ধরে রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান বৃহত্তর সংঘাতের সঙ্গে ইয়েমেনের পরিস্থিতি যুক্ত হলে এর প্রভাব শুধু ওই দেশ বা সৌদি আরবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। লোহিত সাগর, তেল পরিবহন এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের ওপর এর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
সৌদি-হুথি সংঘাত এখন তাই শুধু একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকট নয়; এটি বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহের জন্যও নতুন বড় ঝুঁকির সংকেত হয়ে উঠেছে।
সৌদি-হুথি সংঘাত ফের তীব্র হওয়ায় ইয়েমেনে নতুন যুদ্ধের আশঙ্কা এবং বিশ্ব তেলবাজারে সরবরাহ সংকটের ঝুঁকি বাড়ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















