ধান মানুষের প্রধান খাদ্যগুলোর একটি। কিন্তু সেই ধান চাষই এখন জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। বিশ্বজুড়ে ধানক্ষেত থেকে নির্গত গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ গত কয়েক দশকে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। আর এই নিঃসরণে ভারতের ধানক্ষেতগুলো বিশ্বের অন্যতম বড় উৎস হিসেবে উঠে এসেছে।
নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে ধানক্ষেত থেকে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১১০ কোটি টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয়েছে। ১৯৬১ থেকে ১৯৮০ সালের বার্ষিক গড়ের তুলনায় এই পরিমাণ প্রায় ৯০ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি।
ধানক্ষেত থেকে কেন বাড়ছে মিথেন
ধানক্ষেতে দীর্ঘ সময় পানি জমিয়ে রাখার কারণে মাটিতে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যায়। এ ধরনের পরিবেশে মিথেন উৎপাদনকারী অণুজীব সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে ধানক্ষেত থেকে বিপুল পরিমাণ মিথেন বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে।
বিশেষ করে ভারতের পূর্বাঞ্চলের ধানক্ষেতগুলোকে বিশ্বের অন্যতম মিথেন নিঃসরণের হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেচনির্ভর ধান চাষের বিস্তার, ফসলের অবশিষ্টাংশ জমিতে মিশিয়ে দেওয়া এবং নাইট্রোজেন সার ব্যবহারের মাত্রা বাড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
ভারতে গত শতকের সত্তরের দশকের পর থেকে ধান চাষের জমির পরিমাণ প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমানে দেশটির বৃষ্টিনির্ভর ফসলি জমির প্রায় ৫৫ শতাংশজুড়ে ধান চাষ হয়। ফলে ধান উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর পরিবেশগত প্রভাবও বাড়ছে।

মাটির কার্বন হারানোর ঝুঁকি
শুধু মিথেন নয়, ধানক্ষেতের মাটিতে থাকা জৈব কার্বন কমে যাওয়াও জলবায়ুর জন্য বড় সমস্যা হয়ে উঠছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে ধানক্ষেত থেকে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ বাড়ার প্রায় অর্ধেকের পেছনে মাটির জৈব কার্বন হারানোর ভূমিকা রয়েছে।
ষাটের দশক থেকে আশির দশকের শুরু পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে ধানক্ষেত প্রতিবছর প্রায় ২৮ কোটি ৯০ লাখ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য গ্যাস শোষণ করত। কিন্তু ২০১০-এর দশকে এসে বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশের বেশি ধানক্ষেত মাটি থেকে কার্বন হারাতে শুরু করে।
অর্থাৎ ধান চাষের জমি একসময় যে পরিমাণ কার্বন আটকে রাখত, অনেক ক্ষেত্রেই এখন সেই জমিই উল্টো জলবায়ু উষ্ণায়নে ভূমিকা রাখছে।
আগামী দুই দশকে আরও বাড়তে পারে নিঃসরণ
গবেষণার পূর্বাভাস আরও উদ্বেগজনক। ২০৩১ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে ধান চাষ থেকে বার্ষিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ প্রায় এক-চতুর্থাংশ বাড়তে পারে।
বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং কৃষিতে অতিরিক্ত উপকরণ ব্যবহারের কারণে এই নিঃসরণ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ভারতের সেচনির্ভর ধানক্ষেত থেকেই বর্তমানে বছরে প্রায় ৩৯ লাখ টন মিথেন নির্গত হচ্ছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
পানি ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনতে হবে

ধান চাষ বন্ধ করা নয়, বরং কীভাবে কম নিঃসরণে ধান উৎপাদন করা যায়—এখন সেই পথ খুঁজে বের করাই সবচেয়ে জরুরি। গবেষণায় দেখা গেছে, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, প্রয়োজন অনুযায়ী সার ব্যবহার, ফসলের অবশিষ্টাংশের সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং জমিতে কম চাষের পদ্ধতি গ্রহণ করলে চলতি শতকের মাঝামাঝি বিশ্বজুড়ে ধান চাষের গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ প্রায় ১০ শতাংশ কমানো সম্ভব হতে পারে।
এর মধ্যে জমিতে সব সময় পানি ধরে না রেখে প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ দেওয়ার পদ্ধতি বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে। এতে মাটিতে দীর্ঘ সময় অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি না হওয়ায় মিথেন উৎপাদনও কমে।
কৃষকদের বাস্তব সমস্যাও বিবেচনায় জরুরি
তবে পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি চালু করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কৃষকদের বাস্তব পরিস্থিতিও বিবেচনায় নিতে হবে। শ্রমিকের সংকট, নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাব এবং বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যাওয়ার কারণে অনেক কৃষক নতুন পদ্ধতি গ্রহণে আগ্রহী নন।
একেক অঞ্চলের মাটি, ভূপ্রকৃতি, পানি সরবরাহ ও কৃষকের চাহিদা একেক রকম। তাই সব জায়গায় একই পদ্ধতি চাপিয়ে না দিয়ে স্থানীয় পরিস্থিতি অনুযায়ী কম নিঃসরণে ধান চাষের কৌশল তৈরি করা প্রয়োজন।
ধানের পাশাপাশি স্থানীয় শস্যেও গুরুত্ব
শুধু ধান উৎপাদন বাড়ানোর ওপর নির্ভর না করে স্থানীয় ও বিকল্প শস্যের চাষ বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। কৃষি ও জলবায়ুর বৈচিত্র্যের দিক থেকে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে নানা ধরনের দেশীয় শস্য চাষের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু ধানের বিস্তার অনেক জায়গায় এসব স্থানীয় ফসলের জমি কমিয়ে দিচ্ছে।
তাই যেখানে ধান চাষ পরিবেশ ও পানির ওপর বেশি চাপ তৈরি করছে, সেখানে কৃষকদের বিকল্প শস্য চাষে সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। এজন্য কৃষি প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত পরামর্শ, ন্যায্য দামে ফসল কেনার নিশ্চয়তা এবং কৃষক সংগঠনগুলোর অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে পরিবেশের ভারসাম্য
ধান এশিয়ার কোটি কোটি মানুষের খাদ্যের প্রধান ভিত্তি। তাই ধান চাষ কমিয়ে দেওয়া সহজ বা বাস্তবসম্মত সমাধান নয়। বরং খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রেখেই উৎপাদন ব্যবস্থাকে পরিবেশবান্ধব করে তোলার পথ খুঁজতে হবে।
ভবিষ্যতের কৃষি পরিকল্পনায় শুধু কত বেশি ধান উৎপাদন হচ্ছে, সেটি দেখলে চলবে না। কতটা পানি ব্যবহার হচ্ছে, মাটির স্বাস্থ্য কেমন থাকছে এবং উৎপাদনের ফলে বায়ুমণ্ডলে কতটা মিথেন ছড়াচ্ছে—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্ব পেতে হবে। কৃষকের আয়, খাদ্য নিরাপত্তা এবং জলবায়ু সুরক্ষাকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়েই ধান চাষের নতুন পথ তৈরি করতে হবে।
ভারতের ধানক্ষেত ঘিরে এই সতর্কবার্তা আসলে পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ অঞ্চলের কৃষি, খাদ্য ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে ধানের সম্পর্ক গভীর। এখন সেই ধান উৎপাদনকে আরও টেকসই করার সময় এসেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















