ভারতের প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষার ইতিহাসে আইআইটি-জেইই এবং নিট (NEET) শুধু পরীক্ষা নয়, বরং লাখো পরিবারের স্বপ্ন, উদ্বেগ এবং ত্যাগের প্রতীক। কিন্তু যখন একটি মাত্র পরীক্ষা একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একমাত্র মানদণ্ডে পরিণত হয়, তখন সেই ব্যবস্থার ন্যায্যতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিটকে ঘিরে প্রশ্নফাঁস, অনিয়ম, মানসিক চাপ এবং আত্মহত্যার ঘটনাগুলো দেখিয়ে দিয়েছে—সমস্যা শুধু প্রশাসনিক নয়, কাঠামোগতও।
ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থায় বহু বছর ধরে প্রবেশিকা পরীক্ষাকে মেধা যাচাইয়ের সবচেয়ে নিরপেক্ষ পদ্ধতি হিসেবে দেখা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই পরীক্ষাগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো পরিবারের আর্থিক ও মানসিক বিনিয়োগ। ছোট শহর কিংবা গ্রামের মেধাবী শিক্ষার্থীরা উন্নত কোচিংয়ের জন্য বাড়ি ছেড়ে অন্য শহরে যায়। মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সঞ্চয় ভেঙে, ঋণ নিয়ে কিংবা অন্য সন্তানের প্রয়োজন কমিয়ে একজনের স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা করে। ফলে পরীক্ষার দিনটি কেবল একজন পরীক্ষার্থীর নয়, পুরো পরিবারের ভাগ্যনির্ধারণী মুহূর্তে পরিণত হয়।
এই পরিস্থিতিতে পরীক্ষার কক্ষে বসে থাকা একজন শিক্ষার্থীর ওপর যে মানসিক চাপ কাজ করে, তা বাইরের মানুষ সহজে উপলব্ধি করতে পারে না। একটি প্রশ্নের উত্তর না মিললে তার মনে শুধু নম্বর হারানোর চিন্তা আসে না; ভেসে ওঠে বাবা-মায়ের ত্যাগ, ঋণের বোঝা, পরিবারের প্রত্যাশা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা। যখন একটি দিনের ফলাফলের ওপর বহু বছরের শ্রম নির্ভর করে, তখন সেই চাপ অস্বাভাবিক হয়ে ওঠাই স্বাভাবিক।

জেইই পরীক্ষার্থীদের জন্য অন্তত বিকল্প পথ রয়েছে। বিভিন্ন প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানে ভর্তির একাধিক সুযোগ থাকে, আবার পরবর্তী সময়েও অন্য প্রতিষ্ঠানে পড়ে নিজের অবস্থান তৈরি করার সুযোগ মেলে। কিন্তু নিটের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি অনেক কঠিন। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী সীমিত সরকারি মেডিকেল কলেজের আসনের জন্য প্রতিযোগিতা করে। যারা সামান্য ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে, তাদের সামনে প্রায়ই থাকে অত্যন্ত ব্যয়বহুল বেসরকারি মেডিকেল কলেজ অথবা আরেক বছর অপেক্ষা করে আবার একই অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হওয়ার বিকল্প।
এই কাঠামোই নিটকে একটি ‘সিঙ্গেল পয়েন্ট অব ফেলিওর’-এ পরিণত করেছে। অর্থাৎ একটি খারাপ দিন, সামান্য অসুস্থতা, মানসিক অস্থিরতা কিংবা পরীক্ষাকেন্দ্রে কোনো অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি একজন শিক্ষার্থীর বহু বছরের প্রস্তুতিকে অর্থহীন করে দিতে পারে। মেধা যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে তৈরি একটি ব্যবস্থা তখন ভাগ্যের পরীক্ষায় পরিণত হয়।
এর সঙ্গে যখন প্রশ্নফাঁস বা নিরাপত্তা ব্যর্থতার মতো ঘটনা যুক্ত হয়, তখন পুরো ব্যবস্থার প্রতি আস্থা নষ্ট হয়। একজন শিক্ষার্থী যদি বিশ্বাসই করতে না পারে যে সে সমান সুযোগ নিয়ে পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে, তাহলে সেই পরীক্ষা আর প্রকৃত অর্থে প্রতিযোগিতামূলক থাকে না। পরীক্ষার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাই শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; এটি শিক্ষার্থীদের মানসিক নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গেও জড়িত।
ভারতের উচিত প্রবেশিকা পরীক্ষার নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও কঠোর করা। প্রশ্নপ্রণয়ন থেকে বিতরণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে এমন সুরক্ষা থাকতে হবে, যাতে কোনো ধরনের ফাঁস বা অনিয়মের সুযোগ না থাকে। এত বড় একটি জাতীয় পরীক্ষাকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তার আওতায় পরিচালনা করাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার।

তবে নিরাপত্তা বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো পরীক্ষা পদ্ধতির পুনর্বিবেচনা। একটি মাত্র পরীক্ষাকে জীবনের একমাত্র সুযোগ হিসেবে রাখার পরিবর্তে বছরে অন্তত দুবার নিট আয়োজন করা যেতে পারে। এতে কোনো শিক্ষার্থী যদি অসুস্থতা, দুর্ঘটনা, মানসিক চাপ বা অন্য কোনো কারণে প্রত্যাশিত ফল করতে না পারে, তাহলে তার সামনে আরেকটি বাস্তব সুযোগ থাকবে। এতে প্রতিযোগিতা কমবে না, কিন্তু অস্বাভাবিক মানসিক চাপ অনেকটাই হ্রাস পাবে।
ভারতের অন্যান্য পরীক্ষাতেও ইতোমধ্যে এমন পরিবর্তনের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। একই বছরে একাধিকবার পরীক্ষা নেওয়ার ধারণা নতুন নয়। বরং আধুনিক মূল্যায়ন ব্যবস্থায় এটি ক্রমেই গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে, কারণ এটি একটি দিনের পারফরম্যান্সের পরিবর্তে শিক্ষার্থীর প্রকৃত সক্ষমতাকে মূল্যায়নের সুযোগ দেয়।
একজন পরীক্ষার্থীর জীবন কেবল একটি র্যাঙ্ক দিয়ে সংজ্ঞায়িত হয় না। বহু মানুষ কাঙ্ক্ষিত প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে না পারলেও পরবর্তী জীবনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছেন। শিক্ষা ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সম্ভাবনার দরজা খুলে দেওয়া, একটি ব্যর্থ দিনের কারণে তা স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া নয়।
ভারতের মতো বিশাল দেশে যেখানে লাখো তরুণ চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখে, সেখানে একটি মাত্র পরীক্ষার ওপর সেই স্বপ্নের সম্পূর্ণ ভবিষ্যৎ নির্ভর করানো ন্যায্য নয়। একটি মানবিক, নিরাপদ এবং বহুমাত্রিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা শুধু শিক্ষার্থীদের জন্যই নয়, দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার জন্যও দীর্ঘমেয়াদে আরও কার্যকর হবে। কারণ একটি উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা কখনোই একটি দিনের সাফল্য বা ব্যর্থতার ওপর মানুষের জীবন নির্ভরশীল করে তোলে না; বরং যোগ্য মানুষকে একাধিকবার নিজের সামর্থ্য প্রমাণের সুযোগ দেয়।
অভিষেক আস্থানা 


















