দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া দীর্ঘদিন ধরে ক্ষুধার বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। সেই লড়াইয়ে অঞ্চলটি এখন উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। কিন্তু এই সাফল্যের মধ্যেই আরেকটি কঠিন বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মানুষের পেটে খাবার পৌঁছানো আর মানুষের শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা এক বিষয় নয়। আজকের বড় প্রশ্ন হলো, মানুষ কি শুধু বেঁচে থাকার মতো খাবার পাচ্ছে, নাকি সুস্থ জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যও কিনতে পারছে?
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ক্ষুধার হার ধারাবাহিকভাবে কমেছে। খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রেও উন্নতি হয়েছে। মহামারির সময় যে ধাক্কা এসেছিল, তা কাটিয়ে অঞ্চলটি আবারও এগিয়ে যেতে পেরেছে। কোটি কোটি মানুষ এখন আগের তুলনায় কম ক্ষুধার মুখোমুখি হচ্ছে। এই পরিবর্তন কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি এসেছে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, কৃষিতে বিনিয়োগ, সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণ, পরিবহন অবকাঠামোর উন্নয়ন, বাজার ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্মিলিত ফল হিসেবে।
ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া কিংবা ফিলিপাইনের অভিজ্ঞতা দেখায়, খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষিপণ্যকে দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাজারে পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতা গড়ে তুললে ক্ষুধা কমানো সম্ভব। ভিয়েতনাম যেমন একদিকে বিশ্বের অন্যতম চাল রপ্তানিকারক হয়েছে, অন্যদিকে নিজ দেশের খাদ্যনিরাপত্তাও নিশ্চিত করেছে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারে অংশগ্রহণ এবং দেশের মানুষের খাদ্যপ্রাপ্তি—দুটিই একই সঙ্গে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
তবে এই সাফল্যের আড়ালে নতুন এক বৈষম্য তৈরি হয়েছে। আগে বিভাজন ছিল যারা খাবার পায় এবং যারা পায় না—এই দুই শ্রেণির মধ্যে। এখন সেই বিভাজন তৈরি হচ্ছে যারা স্বাস্থ্যকর খাদ্য কিনতে পারে এবং যারা পারে না তাদের মধ্যে।
এটাই আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। ক্ষুধা কমে গেলেই অপুষ্টি দূর হয় না। পর্যাপ্ত ক্যালরি পাওয়া মানেই শরীরের প্রয়োজনীয় ভিটামিন, খনিজ ও অন্যান্য পুষ্টি নিশ্চিত হওয়া নয়। ফলে রক্তস্বল্পতা, শিশুদের খর্বাকৃতি বৃদ্ধি, স্থূলতা, ডায়াবেটিসসহ নানা ধরনের অপুষ্টিজনিত সমস্যা একই সঙ্গে বিদ্যমান থাকতে পারে। অর্থাৎ মানুষ ক্ষুধার্ত না থেকেও অপুষ্টিতে ভুগতে পারে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বহু দেশে আজও স্বাস্থ্যকর খাদ্যের দাম এত বেশি যে বিপুলসংখ্যক মানুষের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে। ফল, সবজি, প্রাণিজ প্রোটিন ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাদ্য নিয়মিত কিনতে পারা অনেক পরিবারের জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর অর্থ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কৃষি উৎপাদনের অগ্রগতি সত্ত্বেও পুষ্টির ক্ষেত্রে বৈষম্য রয়ে গেছে।
এই ব্যয়বহুল খাদ্যের পেছনে শুধু কৃষকের উৎপাদন ব্যয় দায়ী নয়। বিশেষ করে ফলমূলের ক্ষেত্রে খামার থেকে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাই মূল্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সংরক্ষণাগারের অভাব, শীতলীকরণ সুবিধার সীমাবদ্ধতা, দুর্বল পরিবহনব্যবস্থা, উচ্চ জ্বালানি ব্যয়, অদক্ষ পাইকারি বাজার এবং অকার্যকর বিতরণ নেটওয়ার্ক—সবকিছু মিলেই শেষ পর্যন্ত ভোক্তার জন্য দাম বাড়িয়ে দেয়।

এই বাস্তবতায় সমাধানও হতে হবে লক্ষ্যভিত্তিক। কেবল আরও বেশি খাদ্য উৎপাদনের আহ্বান বা ব্যাপক কৃষি ভর্তুকি দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। বরং প্রয়োজন এমন অবকাঠামো নির্মাণ, যা পুষ্টিকর খাদ্য দ্রুত, নিরাপদ ও কম খরচে কৃষকের মাঠ থেকে শহরের বাজারে পৌঁছে দিতে পারে। কোল্ড স্টোরেজ, প্যাকিং কেন্দ্র, গ্রামীণ সড়ক, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, আধুনিক পাইকারি বাজার, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবহনব্যবস্থায় বিনিয়োগ এই পরিবর্তনের ভিত্তি হতে পারে।
আরেকটি বিষয় সমান গুরুত্বপূর্ণ। সরকার যদি সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নতি না করেই শুধু খাদ্য ভাউচার, স্কুল মিল বা চাহিদা বৃদ্ধির কর্মসূচি সম্প্রসারণ করে, তাহলে অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় বাজারে দাম আরও বেড়ে যেতে পারে। এতে যাদের সহায়তা করার উদ্দেশ্যে এসব কর্মসূচি নেওয়া হয়, তারাই শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো এবং চাহিদা বৃদ্ধির নীতিকে একই সঙ্গে অথবা সঠিক ক্রমে বাস্তবায়ন করা জরুরি।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। ক্ষুধা কমানোর সাফল্যের পেছনে কোনো একক মডেল কাজ করেনি। বরং বিভিন্ন দেশের ভিন্ন ভিন্ন নীতির মধ্যে একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল—খাদ্যব্যবস্থায় ধারাবাহিক ও পরিকল্পিত বিনিয়োগ। সেই একই দর্শন এখন নতুন লক্ষ্য নিয়ে প্রয়োগ করতে হবে, যাতে শুধু খাদ্য নয়, পুষ্টিকর খাদ্যও সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আসে।
অঞ্চলটি ইতোমধ্যেই প্রমাণ করেছে যে ক্ষুধা কমানো সম্ভব। এখন তাদের সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ—স্বাস্থ্যকর খাদ্যকে ধনীদের বিশেষ সুবিধা নয়, বরং প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। এই লক্ষ্য অর্জন করতে পারলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার খাদ্যনিরাপত্তার গল্প শুধু সাফল্যের নয়, প্রকৃত অর্থেই মানবিক উন্নয়নের উদাহরণ হয়ে উঠবে।
ম্যাক্সিমো তোরেরো 


















