মহারাষ্ট্রের খরাপ্রবণ মারাঠওয়াড়া অঞ্চলের বহু কৃষক বিধবার কাছে মাসে দেড় হাজার রুপির সরকারি সহায়তা শুধু একটি ভাতা নয়, সংসার টিকিয়ে রাখার শেষ ভরসাগুলোর একটি। কিন্তু নির্বাচনের সময় যে সহায়তা তাদের মনে আশার আলো জ্বালিয়েছিল, এখন সেই সহায়তা নিয়েই তৈরি হয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা। সরকারি তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক নারীর নাম বাদ পড়ায় প্রশ্ন উঠেছে—এই সহায়তা কি সত্যিই দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা দেবে, নাকি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মতোই একসময় ফুরিয়ে যাবে?
মারাঠওয়াড়ার ধারাশিব জেলার খেরদা ও আশপাশের গ্রামের কৃষক বিধবাদের জীবনে এই প্রশ্ন এখন খুবই বাস্তব। খরা, ফসলহানি, ঋণ, স্বামীর মৃত্যু এবং সংসারের দায়িত্ব—সবকিছুর সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকা এসব নারী মাসে দেড় হাজার রুপির সহায়তাকে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন হিসেবে দেখছেন। কিন্তু সেই সহায়তা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তাদের নতুন করে দুশ্চিন্তায় ফেলেছে।
স্বামীকে হারিয়ে জমির অধিকার ফিরে পাওয়ার লড়াই
খেরদা গ্রামের মনীষা যাদবের জীবন যেন মারাঠওয়াড়ার বহু কৃষক বিধবার গল্পের প্রতিচ্ছবি। পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সময় কৃষক চন্দ্রসেনের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। দুই মেয়েকে নিয়ে সংসারও গড়ে ওঠে। কিন্তু একের পর এক ফসলহানি ও ঋণের বোঝা শেষ পর্যন্ত তার স্বামীকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেয়।

স্বামীকে হারানোর পর মনীষার সংগ্রাম থামেনি। শ্বশুরবাড়ি থেকে দুই মেয়েসহ তাকে বের করে দেওয়া হয়। এরপর কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করে সন্তানদের বড় করার পাশাপাশি স্বামীর পরিবারের জমিতে নিজের আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই চালান তিনি। দীর্ঘ সংগ্রামের পর দুই একর শুকনো জমির দখল পান। এখন সেই জমিতে সয়াবিন চাষ করেন, পাশাপাশি গ্রামের অঙ্গনওয়াড়িতেও কাজ করেন।
তবে জমি ফিরে পেলেও তার জীবনে অনিশ্চয়তা কাটেনি। বৃষ্টি ভালো হলে বাজারে ফসলের দাম পড়ে যায়, আবার বৃষ্টি না হলে ফসলই হয় না—ফলে দাম বাড়লেও বিক্রি করার মতো উৎপাদন থাকে না। এই বাস্তবতাই মারাঠওয়াড়ার শুষ্ক কৃষির সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি।
মাসে দেড় হাজার রুপি, কিন্তু সংসারে বড় ভরসা
২০২৪ সালে চালু হওয়া মুখ্যমন্ত্রীর ‘লড়কি বহিন’ প্রকল্পটি দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা নারীদের মাসে দেড় হাজার রুপি করে সহায়তা দেওয়ার কথা বলে। মনীষার মতো বহু কৃষক বিধবা তখন এই প্রকল্পে নাম নিবন্ধন করেন। তাদের কাছে এই অর্থ ছিল নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ চালানোর গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা।
মনীষার ভাষায়, অনেক পরিবারের মাসিক বাজেট যেখানে মাত্র তিন থেকে চার হাজার রুপির মধ্যে, সেখানে দেড় হাজার রুপি বন্ধ হয়ে গেলে সংসার চালানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।
কিন্তু এখন সরকারি বিভিন্ন শর্তের কারণে উপকারভোগীদের তালিকা থেকে অনেক নারীর নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। সরকারি চাকরি, কর প্রদান কিংবা অন্য কোনো সরকারি সহায়তা পাওয়ার মতো বিষয়গুলোকে বাদ দেওয়ার কারণ হিসেবে ধরা হচ্ছে। স্থানীয় অধিকারকর্মীদের হিসাবে, এরই মধ্যে ৯২ লাখের বেশি নারীর নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। ফলে শুরুতে প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ নারীর যে তালিকা ছিল, তা প্রায় ৩৮ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
ভোটের আগে যে প্রকল্প হয়ে উঠেছিল রাজনৈতিক শক্তি

প্রকল্পটি শুধু সামাজিক সহায়তার জায়গায় থেমে থাকেনি। ২০২৪ সালের মহারাষ্ট্র বিধানসভা নির্বাচনের আগে নারীদের মধ্যে এর ব্যাপক প্রভাব পড়ে। নির্বাচনী পরিসংখ্যানেও নারীদের ভোটদানে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়।
২০১৯ সালে মহারাষ্ট্রে নিবন্ধিত নারী ভোটারের সংখ্যা ছিল প্রায় ৪ কোটি ২৮ লাখ। ভোট দিয়েছিলেন প্রায় ২ কোটি ৫৩ লাখ নারী। ২০২৪ সালে নিবন্ধিত নারী ভোটার বেড়ে প্রায় ৪ কোটি ৭০ লাখ হলেও ভোটদানের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩ কোটি ৬ লাখে। ফলে নারী ভোটারের উপস্থিতির হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। এই পরিবর্তনের পেছনে ‘লড়কি বহিন’ প্রকল্পের প্রভাব ছিল বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করে।
কিন্তু নির্বাচন শেষ হওয়ার পর যখন নতুন করে যাচাই ও বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়, তখন উপকারভোগীদের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ বাড়তে থাকে।
ধোন্ডাবাই মিঙ্গুলে নামের এক কৃষক বিধবার অভিজ্ঞতাও একই। তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে দ্রুত নিবন্ধনের সুযোগ দেওয়া হলেও তখন নথিপত্র নিয়ে তেমন যাচাই হয়নি। অথচ সরকার ক্ষমতায় ফিরে আসার পর নতুন নিয়ম প্রয়োগ করে অনেকের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে।
কৃষকের আত্মহত্যা বাড়ছে, সবচেয়ে বেশি চাপ নারীদের ওপর
মারাঠওয়াড়ার সংকট শুধু সরকারি ভাতা নিয়ে নয়। পুরো অঞ্চলটিই দীর্ঘদিন ধরে খরা, অনিয়মিত বৃষ্টি ও কৃষি আয়ের অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়ছে। নদী ও জলাধারের সীমাবদ্ধতার কারণে কৃষকদের বড় অংশ বর্ষার পানির ওপর নির্ভরশীল। জলবায়ুর পরিবর্তনে কখনো বৃষ্টি কমছে, আবার কখনো অস্বাভাবিক সময়ে বৃষ্টি এসে মাঠের ফসল নষ্ট করছে।
এর ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে কৃষক পরিবারের ওপর। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত মারাঠওয়াড়ার আট জেলায় ৪৬৫ জন কৃষকের আত্মহত্যার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালে একই অঞ্চলে ১ হাজার ১৩১টি কৃষক আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কৃষকের মৃত্যু বা পুরুষের কাজের সন্ধানে বাইরে চলে যাওয়ার পর সংসারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে নারীদের কাঁধে। সন্তানদের পড়াশোনা, খাবার, চিকিৎসা, কৃষিকাজ—সবকিছু সামলাতে গিয়ে তারা নিজেরাই হয়ে ওঠেন পরিবারের প্রধান অবলম্বন।

ভাতার চেয়ে নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন
হাসেগাঁও গ্রামের কৃষক বিধবা কোমল ধুমালের কথায় উঠে এসেছে এই সংকটের আরও গভীর দিক। তার মতে, নারীর জীবন যেন সবসময় কারও না কারও ওপর নির্ভরশীল করে রাখা হয়। ছোটবেলায় বাবার ওপর, পরে ভাই বা স্বামীর ওপর; এখন সেই তালিকায় সরকারি সহায়তাও যুক্ত হয়েছে।
কোমল চান, নারীদের শুধু মাসিক অর্থ না দিয়ে এমন সুযোগ দেওয়া হোক, যাতে তারা নিজেরাই আয় করতে পারেন। ছোট শিল্প, ঘরে বসে কাজ কিংবা দক্ষতা উন্নয়নের প্রশিক্ষণ—এ ধরনের উদ্যোগ নারীদের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা দিতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
তার এই আকাঙ্ক্ষা আসলে পুরো অঞ্চলের বহু নারীরই চাওয়া। তারা ভাতা চান, কারণ সেটি এখন প্রয়োজন। কিন্তু তার চেয়েও বেশি চান এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে নিজেদের শ্রম ও দক্ষতা দিয়ে তারা স্থায়ী আয় করতে পারবেন।
পুরোনো ভাতায় ফিরতে চাইছেন অনেকে
‘লড়কি বহিন’ প্রকল্প নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ায় কিছু নারী এখন পুরোনো সামাজিক নিরাপত্তা প্রকল্পের দিকে ফিরে তাকাচ্ছেন। মহারাষ্ট্রের সঞ্জয় গান্ধী নিরাধার অনুদান প্রকল্পে বিধবা, অসহায়, প্রতিবন্ধীসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে মাসিক সহায়তা দেওয়া হয়। একইভাবে জাতীয় বিধবা পেনশন প্রকল্পও কিছু নারীর কাছে তুলনামূলকভাবে বেশি নির্ভরযোগ্য বলে মনে হচ্ছে।
কারণ, বহু নারীর ধারণা—পুরোনো প্রকল্পগুলো দীর্ঘদিন ধরে চলছে এবং সরাসরি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সঙ্গে যুক্ত নয়। ফলে এগুলোকে তারা তুলনামূলক স্থায়ী নিরাপত্তা হিসেবে দেখছেন।
এদিকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনী প্রচারে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও বর্তমান উপমুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডে এই সহায়তার পরিমাণ দেড় হাজার থেকে বাড়িয়ে ২ হাজার ১০০ রুপি করার কথা জানিয়েছিলেন। তবে মাঠপর্যায়ের নারীদের মধ্যে এই প্রতিশ্রুতি নিয়ে আশার চেয়ে অনিশ্চয়তাই বেশি।

ব্যাংকে টাকা গেলেও নারীর হাতে পৌঁছায় তো?
এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নারীদের আর্থিক অজ্ঞতা ও পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ। স্থানীয় এক সমাজকর্মীর দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, অনেক নারী নিজের ব্যাংক হিসাব সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন নন। ফলে সরকারি অর্থ জমা হলেও কখনো কখনো স্বামী বা পরিবারের পুরুষ সদস্যরা তাদের অজান্তেই সেই টাকা তুলে নেন।
অর্থাৎ শুধু অর্থ বরাদ্দ করলেই নারীর আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। অর্থ ব্যবহারের অধিকার, ব্যাংকিং জ্ঞান এবং নিজের আয় করার সুযোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সামনে আবার খরার আশঙ্কা
মনীষাদের দুশ্চিন্তা এখন শুধু সরকারি সহায়তা নিয়ে নয়। চলতি মৌসুমে মারাঠওয়াড়ার অনেক এলাকায় বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের তুলনায় কম। কোথাও বীজ বপনের পরও অঙ্কুর গজায়নি। বৃষ্টির ঘাটতি অব্যাহত থাকলে আবারও খরা দেখা দিতে পারে, আর তার সঙ্গে ফিরে আসতে পারে ঋণ ও আর্থিক সংকট।
তবুও মনীষা থামেননি। আহত পা নিয়েই তিনি আবার মাঠে ফিরছেন। বহুবার খরা, অস্বাভাবিক বৃষ্টি ও ফসলহানির মুখোমুখি হয়েও তিনি টিকে আছেন।
মারাঠওয়াড়ার কৃষক বিধবাদের গল্প তাই কেবল সরকারি ভাতার গল্প নয়। এটি টিকে থাকার লড়াই, মর্যাদার লড়াই এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানোর আকাঙ্ক্ষার গল্প। মাসে দেড় হাজার রুপি হয়তো আজ তাদের সংসারে স্বস্তি এনে দেয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হবে তখনই, যখন এই নারীরা সরকারি সহায়তার অপেক্ষায় না থেকে নিজেদের শ্রম, দক্ষতা ও আয়ের ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ পাবেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















