০৪:২৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬
এশিয়ায় নয়, বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে আছে আমেরিকার সামরিক শক্তি—ট্রাম্পের নীতিতে বাড়ছে নতুন দ্বন্দ্ব পাঞ্জাবে কমেছে চেনাবের বন্যা, ২৯ জুলাই থেকে নতুন ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে ‘অপারেশন আল-আজম’: ১৬ সশস্ত্র সদস্য নিহত, সন্ত্রাস দমনে অভিযান আরও জোরদার পলকের দাবি: আমার বিরুদ্ধে ৯৮ মামলা, ৯৯ দিন রিমান্ডে ছিলাম; কারাগারে সুযোগ-সুবিধা চেয়ে আদালতে আবেদন এক লাখ টাকার ঋণ, এক বছরের বন্দিজীবন: পাথর কাটতে কাটতে মুক্তি পেলেন চার শ্রমিক ভোটের আগে আশীর্বাদ, ভোটের পর অনিশ্চয়তা: মহারাষ্ট্রের বিধবা কৃষাণীদের ভরসা কি হারাচ্ছে? ডিএনএর ভুলে আর নয়! কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হাত ধরে জিন চিকিৎসায় খুলছে নতুন দিগন্ত বৈশ্বিক দক্ষিণেই আগ্রাসী প্রজাতির পরিবেশগত ক্ষতি বেশি, বাড়ছে ভয়াবহ ঝুঁকি একটি পরীক্ষার ওপর ভবিষ্যৎ নির্ভর করা উচিত নয় ধানক্ষেতেই বাড়ছে জলবায়ুর বিপদ, ভারতের ধান চাষে মিথেন নিঃসরণে বড় উদ্বেগ

এক লাখ টাকার ঋণ, এক বছরের বন্দিজীবন: পাথর কাটতে কাটতে মুক্তি পেলেন চার শ্রমিক

অন্ধ্রপ্রদেশের অনন্তপুর জেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় ঋণের বোঝা যেন চার শ্রমিকের জীবনকে বন্দি করে ফেলেছিল। সামান্য ঋণ শোধ করার জন্য দিনের পর দিন পাথর কাটতে হয়েছে তাঁদের। ছিল না নিরাপত্তার ব্যবস্থা, ছিল না পর্যাপ্ত খাবার বা পানীয় জল। কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত মিলত না বিশ্রাম। এমনকি কাজের পর বাড়ি ফেরার সুযোগও ছিল না।

অবশেষে প্রশাসনের অভিযানে অবৈধ পাথর কাটার ওই স্থান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে চার শ্রমিককে। তাঁদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে বন্ধনমুক্তির সনদ। এর মাধ্যমে ঋণের দায় থেকেও তাঁরা আইনগতভাবে মুক্ত হয়েছেন।

ঋণ থেকেই শুরু বন্দিজীবন

অনন্তপুরের চেন্নামপল্লে গ্রামের কাছে পাথর কাটার কাজে যুক্ত ছিলেন ভাদ্দে সম্প্রদায়ের কয়েকজন মানুষ। এই সম্প্রদায়ের অনেক পরিবার দীর্ঘদিন ধরে পাথর কাটার কাজের সঙ্গে জড়িত।

প্রায় পাঁচ বছর আগে সন্থালা অঞ্জি ফুসফুসের সংক্রমণের চিকিৎসার জন্য এক লাখ রুপি ঋণ নিয়েছিলেন তাঁর নিয়োগকর্তার কাছ থেকে। সেই ঋণই ধীরে ধীরে তাঁর পরিবারের জন্য এক কঠিন ফাঁদে পরিণত হয়।

অন্যরাও বিভিন্ন প্রয়োজনে একই ব্যক্তির কাছ থেকে ঋণ নিয়েছিলেন। পরে সেই ঋণ পরিশোধের শর্তে তাঁদের নিয়মিত পাথর কাটার কাজে যেতে বাধ্য করা হয়।

Burdened by debt, bonded to life of toil - The Hindu

অঞ্জির ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতি সোমবার ভোরেই তাঁদের কাজে নিয়ে যাওয়া হতো। অসুস্থতা কিংবা পরিবারের জরুরি পরিস্থিতি থাকলেও ছাড় মিলত না। কাজে যেতে অস্বীকৃতি জানালে নির্যাতন ও অপমানের শিকার হতে হতো।

দিনে কাটতে হতো অন্তত ১০০ পাথর

চেন্নামপল্লে গ্রামের একটি মন্দিরের কাছের পাহাড়ি এলাকায় ছিল পাথর কাটার স্থানটি। সেখানে শ্রমিকদের হাতে দেওয়া হতো লোহার হাতুড়ি ও ছোট ছেনি। এসব সাধারণ সরঞ্জাম দিয়েই প্রতিদিন অন্তত ১০০টি পাথর কাটার লক্ষ্য পূরণ করতে হতো।

কাজটি ছিল অত্যন্ত কষ্টকর। পাথর কাটার সময় প্রচুর ধুলা তৈরি হলেও শ্রমিকদের দেওয়া হয়নি মুখ ঢাকার কোনো ব্যবস্থা। ছিল না নিরাপত্তা সরঞ্জামও।

কাজ শেষে বাড়ি ফেরার সুযোগও ছিল না তাঁদের। পাহাড়ের উঁচু অংশে একটি অস্থায়ী ছাউনি তৈরি করে সেখানে রাত কাটাতে হতো। প্রচণ্ড গরম কিংবা বৃষ্টি—কোনো অবস্থাতেই তাঁদের হাতে বিকল্প ছিল না।

পানির জন্য হাঁটতে হতো দুই কিলোমিটার

৪০ বছর বয়সী ভাদ্দে কুমারু জানান, কাজ শুরু করতে হতো ভোর ছয়টার মধ্যে। নির্ধারিত পাথর কাটার কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত চলত শ্রম।

দুপুরে খাবারের বিরতি থাকলেও পানির জন্য ছিল নতুন কষ্ট। এক গ্লাস পানি সংগ্রহ করতেও তাঁদের প্রায় দুই কিলোমিটার হাঁটতে হতো। গরমের সময় পাহাড়ের নিচের পানি তোলার যন্ত্র শুকিয়ে গেলে ছোট ছোট গর্ত ও পাহাড়ের ফাঁকে জমে থাকা পানির ওপর নির্ভর করতে হতো তাঁদের।

নিয়োগকর্তার কাছ থেকে সপ্তাহের জন্য কিছু চাল ও সবজি দেওয়া হতো। রাতে সামান্য মদও দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অথচ কঠোর শ্রমের তুলনায় খাবারের পরিমাণ ও পুষ্টি ছিল অত্যন্ত অপ্রতুল।

বাবার ঋণ শোধ করতে কাজে নামেন ১৮ বছরের ছেলে

Burdened by debt, bonded to life of toil - The Hindu

এই ঘটনায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়গুলোর একটি হলো, সন্থালা অঞ্জির ১৮ বছর বয়সী ছেলে ভি. শিবা কুমারকেও বাবার ঋণ শোধের জন্য পাথর কাটার কাজে নামতে হয়েছিল।

পরিবারের পাঁচ সন্তানের মধ্যে বড় শিবা। গ্রামের আরও অনেক শিশুর মতো তিনিও শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। ঋণের বোঝা তাঁকে পড়াশোনার পরিবর্তে কঠিন শ্রমের দিকে ঠেলে দিয়েছিল।

রোববার ছিল তাঁদের ছুটির দিন। তবে সেদিনও সরাসরি বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হতো না। গ্রামের কাছ থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে নামিয়ে দেওয়া হতো। সেখান থেকে হেঁটে বাড়ি ফিরতে হতো তাঁদের।

অভিযোগের পর প্রশাসনের অভিযান

স্থানীয় একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন জেলা প্রশাসনের কাছে বিষয়টি তুলে ধরার পর ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে। এরপর প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরকে নিয়ে বৈঠক করা হয় এবং শ্রমিকদের উদ্ধারে উদ্যোগ নেওয়া হয়।

৪ জুন শ্রম, রাজস্ব, কারখানা, সমাজকল্যাণ ও পুলিশ বিভাগের কর্মকর্তারা অভিযান পরিচালনা করেন। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিনিধিরাও। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে পাহাড়ি এলাকায় পৌঁছে চার শ্রমিককে সেখান থেকে মুক্ত করা হয়।

জেলা আইনসেবা কর্তৃপক্ষের একজন কর্মকর্তাও উদ্ধার অভিযানে সরাসরি অংশ নেন।

আইনিভাবে ঋণ থেকে মুক্ত চার শ্রমিক

তদন্তের পর কর্মকর্তারা দেখতে পান, ঘটনাটিতে ঋণনির্ভর জবরদস্তিমূলক শ্রমের একাধিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। শ্রমিকদের শিকল দিয়ে বাঁধা না থাকলেও তাঁদের চলাফেরার স্বাধীনতা সীমিত ছিল। ঋণের কারণে তাঁদের কঠোর ও অনিরাপদ পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছিল।

তদন্তে আরও উঠে আসে, যে পাথর কাটার স্থানে তাঁদের কাজ করানো হচ্ছিল সেটির কোনো বৈধ অনুমতি, ইজারা বা লাইসেন্স ছিল না।

শ্রমিকদের বক্তব্য গ্রহণ ও আইনগত প্রক্রিয়া শেষ করার পর তাঁদের বন্ধনমুক্তির সনদ দেওয়া হয়। এর ফলে তাঁরা ওই ঋণ পরিশোধের দায় থেকে আইনগতভাবে মুক্ত হয়েছেন।

প্রাথমিকভাবে প্রত্যেক শ্রমিকের জন্য ৩০ হাজার রুপি করে আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। পাশাপাশি ন্যূনতম মজুরি আইনের আওতায় তাঁদের প্রাপ্য মজুরি না পাওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। চার শ্রমিকের বকেয়া মজুরি হিসেবে মোট ৫ লাখ ৪৩ হাজার ২১৬ রুপি পাওনার হিসাব করা হয়েছে।

Hidden in Plain Sight: the Tragic Reality of Bonded Labor – Berkeley  Economic Review

শুধু উদ্ধার নয়, পুনর্বাসনের উদ্যোগ

প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শ্রমিকদের উদ্ধার করাই শেষ লক্ষ্য নয়। তাঁদের যেন আবার ঋণের ফাঁদে পড়তে না হয়, সে জন্য স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা করাও জরুরি।

চার শ্রমিকের জন্য সরকারি কল্যাণমূলক বিভিন্ন সুবিধা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যাঁদের পরিচয়পত্র রয়েছে, তাঁদের কর্মসংস্থানের জন্য কাজের কার্ড দেওয়া হয়েছে। একজনের পরিচয়পত্র না থাকায় সেটি তৈরির প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।

শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার জন্য চিকিৎসা শিবিরের আয়োজন করা হয়েছে। পাশাপাশি তাঁদের পরিবার যাতে নিয়মিত আয় করতে পারে এবং ভবিষ্যতে আবার ঋণনির্ভর শ্রমে জড়িয়ে না পড়ে, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তিন বছরে মুক্ত ৪১২ শ্রমিক

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত তিন বছরে অনন্তপুর এলাকায় ৪১২ জনকে বন্ধনমূলক শ্রম থেকে মুক্ত করা হয়েছে। তবে তাঁদের মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র চারজন প্রাথমিক ৩০ হাজার রুপির আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন।

পরিচয়পত্র, ব্যাংক হিসাবসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতার কারণে অনেকের কাছে সহায়তার অর্থ পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে। কর্মকর্তারা এসব সমস্যা সমাধানে কাজ করছেন।

এদিকে রাজ্য শ্রমকল্যাণ বোর্ডের পক্ষ থেকে বন্ধনমূলক শ্রমিকদের পুনর্বাসনের জন্য রাজ্যের ২৬টি জেলায় ১০ লাখ রুপি করে তহবিল দেওয়া হয়েছে। এই অর্থ থেকে মুক্ত শ্রমিকদের প্রাথমিক আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

ঋণের ফাঁদ ভাঙতে দরকার স্থায়ী নজরদারি

গ্রামীণ ও অসংগঠিত খাতে এ ধরনের ঘটনা সহজে প্রকাশ্যে আসে না। অনেক শ্রমিক নিয়োগকর্তার ভয়ে অভিযোগ করতে চান না। ফলে সরকারি ব্যবস্থার পাশাপাশি স্থানীয় সংগঠন ও সমাজকর্মীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত নজরদারি, শ্রমিকদের আইনি অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা এবং সরকারি পুনর্বাসন সুবিধা দ্রুত পৌঁছে দেওয়া না গেলে ঋণের ফাঁদ থেকে পুরোপুরি মুক্তি পাওয়া কঠিন।

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

এশিয়ায় নয়, বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে আছে আমেরিকার সামরিক শক্তি—ট্রাম্পের নীতিতে বাড়ছে নতুন দ্বন্দ্ব

এক লাখ টাকার ঋণ, এক বছরের বন্দিজীবন: পাথর কাটতে কাটতে মুক্তি পেলেন চার শ্রমিক

০৩:১১:০৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬

অন্ধ্রপ্রদেশের অনন্তপুর জেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় ঋণের বোঝা যেন চার শ্রমিকের জীবনকে বন্দি করে ফেলেছিল। সামান্য ঋণ শোধ করার জন্য দিনের পর দিন পাথর কাটতে হয়েছে তাঁদের। ছিল না নিরাপত্তার ব্যবস্থা, ছিল না পর্যাপ্ত খাবার বা পানীয় জল। কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত মিলত না বিশ্রাম। এমনকি কাজের পর বাড়ি ফেরার সুযোগও ছিল না।

অবশেষে প্রশাসনের অভিযানে অবৈধ পাথর কাটার ওই স্থান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে চার শ্রমিককে। তাঁদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে বন্ধনমুক্তির সনদ। এর মাধ্যমে ঋণের দায় থেকেও তাঁরা আইনগতভাবে মুক্ত হয়েছেন।

ঋণ থেকেই শুরু বন্দিজীবন

অনন্তপুরের চেন্নামপল্লে গ্রামের কাছে পাথর কাটার কাজে যুক্ত ছিলেন ভাদ্দে সম্প্রদায়ের কয়েকজন মানুষ। এই সম্প্রদায়ের অনেক পরিবার দীর্ঘদিন ধরে পাথর কাটার কাজের সঙ্গে জড়িত।

প্রায় পাঁচ বছর আগে সন্থালা অঞ্জি ফুসফুসের সংক্রমণের চিকিৎসার জন্য এক লাখ রুপি ঋণ নিয়েছিলেন তাঁর নিয়োগকর্তার কাছ থেকে। সেই ঋণই ধীরে ধীরে তাঁর পরিবারের জন্য এক কঠিন ফাঁদে পরিণত হয়।

অন্যরাও বিভিন্ন প্রয়োজনে একই ব্যক্তির কাছ থেকে ঋণ নিয়েছিলেন। পরে সেই ঋণ পরিশোধের শর্তে তাঁদের নিয়মিত পাথর কাটার কাজে যেতে বাধ্য করা হয়।

Burdened by debt, bonded to life of toil - The Hindu

অঞ্জির ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতি সোমবার ভোরেই তাঁদের কাজে নিয়ে যাওয়া হতো। অসুস্থতা কিংবা পরিবারের জরুরি পরিস্থিতি থাকলেও ছাড় মিলত না। কাজে যেতে অস্বীকৃতি জানালে নির্যাতন ও অপমানের শিকার হতে হতো।

দিনে কাটতে হতো অন্তত ১০০ পাথর

চেন্নামপল্লে গ্রামের একটি মন্দিরের কাছের পাহাড়ি এলাকায় ছিল পাথর কাটার স্থানটি। সেখানে শ্রমিকদের হাতে দেওয়া হতো লোহার হাতুড়ি ও ছোট ছেনি। এসব সাধারণ সরঞ্জাম দিয়েই প্রতিদিন অন্তত ১০০টি পাথর কাটার লক্ষ্য পূরণ করতে হতো।

কাজটি ছিল অত্যন্ত কষ্টকর। পাথর কাটার সময় প্রচুর ধুলা তৈরি হলেও শ্রমিকদের দেওয়া হয়নি মুখ ঢাকার কোনো ব্যবস্থা। ছিল না নিরাপত্তা সরঞ্জামও।

কাজ শেষে বাড়ি ফেরার সুযোগও ছিল না তাঁদের। পাহাড়ের উঁচু অংশে একটি অস্থায়ী ছাউনি তৈরি করে সেখানে রাত কাটাতে হতো। প্রচণ্ড গরম কিংবা বৃষ্টি—কোনো অবস্থাতেই তাঁদের হাতে বিকল্প ছিল না।

পানির জন্য হাঁটতে হতো দুই কিলোমিটার

৪০ বছর বয়সী ভাদ্দে কুমারু জানান, কাজ শুরু করতে হতো ভোর ছয়টার মধ্যে। নির্ধারিত পাথর কাটার কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত চলত শ্রম।

দুপুরে খাবারের বিরতি থাকলেও পানির জন্য ছিল নতুন কষ্ট। এক গ্লাস পানি সংগ্রহ করতেও তাঁদের প্রায় দুই কিলোমিটার হাঁটতে হতো। গরমের সময় পাহাড়ের নিচের পানি তোলার যন্ত্র শুকিয়ে গেলে ছোট ছোট গর্ত ও পাহাড়ের ফাঁকে জমে থাকা পানির ওপর নির্ভর করতে হতো তাঁদের।

নিয়োগকর্তার কাছ থেকে সপ্তাহের জন্য কিছু চাল ও সবজি দেওয়া হতো। রাতে সামান্য মদও দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অথচ কঠোর শ্রমের তুলনায় খাবারের পরিমাণ ও পুষ্টি ছিল অত্যন্ত অপ্রতুল।

বাবার ঋণ শোধ করতে কাজে নামেন ১৮ বছরের ছেলে

Burdened by debt, bonded to life of toil - The Hindu

এই ঘটনায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়গুলোর একটি হলো, সন্থালা অঞ্জির ১৮ বছর বয়সী ছেলে ভি. শিবা কুমারকেও বাবার ঋণ শোধের জন্য পাথর কাটার কাজে নামতে হয়েছিল।

পরিবারের পাঁচ সন্তানের মধ্যে বড় শিবা। গ্রামের আরও অনেক শিশুর মতো তিনিও শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। ঋণের বোঝা তাঁকে পড়াশোনার পরিবর্তে কঠিন শ্রমের দিকে ঠেলে দিয়েছিল।

রোববার ছিল তাঁদের ছুটির দিন। তবে সেদিনও সরাসরি বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হতো না। গ্রামের কাছ থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে নামিয়ে দেওয়া হতো। সেখান থেকে হেঁটে বাড়ি ফিরতে হতো তাঁদের।

অভিযোগের পর প্রশাসনের অভিযান

স্থানীয় একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন জেলা প্রশাসনের কাছে বিষয়টি তুলে ধরার পর ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে। এরপর প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরকে নিয়ে বৈঠক করা হয় এবং শ্রমিকদের উদ্ধারে উদ্যোগ নেওয়া হয়।

৪ জুন শ্রম, রাজস্ব, কারখানা, সমাজকল্যাণ ও পুলিশ বিভাগের কর্মকর্তারা অভিযান পরিচালনা করেন। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিনিধিরাও। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে পাহাড়ি এলাকায় পৌঁছে চার শ্রমিককে সেখান থেকে মুক্ত করা হয়।

জেলা আইনসেবা কর্তৃপক্ষের একজন কর্মকর্তাও উদ্ধার অভিযানে সরাসরি অংশ নেন।

আইনিভাবে ঋণ থেকে মুক্ত চার শ্রমিক

তদন্তের পর কর্মকর্তারা দেখতে পান, ঘটনাটিতে ঋণনির্ভর জবরদস্তিমূলক শ্রমের একাধিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। শ্রমিকদের শিকল দিয়ে বাঁধা না থাকলেও তাঁদের চলাফেরার স্বাধীনতা সীমিত ছিল। ঋণের কারণে তাঁদের কঠোর ও অনিরাপদ পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছিল।

তদন্তে আরও উঠে আসে, যে পাথর কাটার স্থানে তাঁদের কাজ করানো হচ্ছিল সেটির কোনো বৈধ অনুমতি, ইজারা বা লাইসেন্স ছিল না।

শ্রমিকদের বক্তব্য গ্রহণ ও আইনগত প্রক্রিয়া শেষ করার পর তাঁদের বন্ধনমুক্তির সনদ দেওয়া হয়। এর ফলে তাঁরা ওই ঋণ পরিশোধের দায় থেকে আইনগতভাবে মুক্ত হয়েছেন।

প্রাথমিকভাবে প্রত্যেক শ্রমিকের জন্য ৩০ হাজার রুপি করে আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। পাশাপাশি ন্যূনতম মজুরি আইনের আওতায় তাঁদের প্রাপ্য মজুরি না পাওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। চার শ্রমিকের বকেয়া মজুরি হিসেবে মোট ৫ লাখ ৪৩ হাজার ২১৬ রুপি পাওনার হিসাব করা হয়েছে।

Hidden in Plain Sight: the Tragic Reality of Bonded Labor – Berkeley  Economic Review

শুধু উদ্ধার নয়, পুনর্বাসনের উদ্যোগ

প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শ্রমিকদের উদ্ধার করাই শেষ লক্ষ্য নয়। তাঁদের যেন আবার ঋণের ফাঁদে পড়তে না হয়, সে জন্য স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা করাও জরুরি।

চার শ্রমিকের জন্য সরকারি কল্যাণমূলক বিভিন্ন সুবিধা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যাঁদের পরিচয়পত্র রয়েছে, তাঁদের কর্মসংস্থানের জন্য কাজের কার্ড দেওয়া হয়েছে। একজনের পরিচয়পত্র না থাকায় সেটি তৈরির প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।

শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার জন্য চিকিৎসা শিবিরের আয়োজন করা হয়েছে। পাশাপাশি তাঁদের পরিবার যাতে নিয়মিত আয় করতে পারে এবং ভবিষ্যতে আবার ঋণনির্ভর শ্রমে জড়িয়ে না পড়ে, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তিন বছরে মুক্ত ৪১২ শ্রমিক

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত তিন বছরে অনন্তপুর এলাকায় ৪১২ জনকে বন্ধনমূলক শ্রম থেকে মুক্ত করা হয়েছে। তবে তাঁদের মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র চারজন প্রাথমিক ৩০ হাজার রুপির আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন।

পরিচয়পত্র, ব্যাংক হিসাবসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতার কারণে অনেকের কাছে সহায়তার অর্থ পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে। কর্মকর্তারা এসব সমস্যা সমাধানে কাজ করছেন।

এদিকে রাজ্য শ্রমকল্যাণ বোর্ডের পক্ষ থেকে বন্ধনমূলক শ্রমিকদের পুনর্বাসনের জন্য রাজ্যের ২৬টি জেলায় ১০ লাখ রুপি করে তহবিল দেওয়া হয়েছে। এই অর্থ থেকে মুক্ত শ্রমিকদের প্রাথমিক আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

ঋণের ফাঁদ ভাঙতে দরকার স্থায়ী নজরদারি

গ্রামীণ ও অসংগঠিত খাতে এ ধরনের ঘটনা সহজে প্রকাশ্যে আসে না। অনেক শ্রমিক নিয়োগকর্তার ভয়ে অভিযোগ করতে চান না। ফলে সরকারি ব্যবস্থার পাশাপাশি স্থানীয় সংগঠন ও সমাজকর্মীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত নজরদারি, শ্রমিকদের আইনি অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা এবং সরকারি পুনর্বাসন সুবিধা দ্রুত পৌঁছে দেওয়া না গেলে ঋণের ফাঁদ থেকে পুরোপুরি মুক্তি পাওয়া কঠিন।