যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির অবস্থান বদলানোর কথা বলছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। লক্ষ্য ছিল বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম কমিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়া। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, এশিয়ায় সেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন এখনো স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি। বরং ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিম গোলার্ধে নানা সামরিক দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি ও সম্পদকে আরও ছড়িয়ে দিচ্ছে।
চীনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনা
ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতিরক্ষা নীতির অন্যতম মূল কথা হলো দীর্ঘদিন ধরে চলা অতিরিক্ত সামরিক দায় কমানো। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা সীমিত—এই বাস্তবতা সামনে রেখে চীনকে সবচেয়ে বড় কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
কিন্তু পরিকল্পনা আর বাস্তবতার মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে। ইউরোপে সেনা কমানোর উদ্যোগ সীমিত, আর মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে সংঘাত বরং মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে এশিয়ায় অতিরিক্ত শক্তি পাঠানোর সুযোগও সংকুচিত হচ্ছে।
ইউরোপে সেনা কমানোর চেষ্টা

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইউরোপে বাড়ানো মার্কিন সেনাদের একটি অংশ ইতোমধ্যে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে ন্যাটোর যুদ্ধকালীন প্রস্তুতির জন্য নির্ধারিত মার্কিন সামরিক সক্ষমতার একটি বড় অংশ কমানোর পরিকল্পনাও সামনে এসেছে।
ইউরোপে ভবিষ্যতে নিজেদের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব ইউরোপীয় দেশগুলোকেই বেশি নিতে হবে—এমন অবস্থান ট্রাম্প প্রশাসনের। যুক্তরাষ্ট্র তুলনামূলকভাবে কম সেনা ও সামরিক সম্পদ রেখে ইউরোপীয় ঘাঁটি ও আকাশসীমা ব্যবহারের সুযোগ বাড়াতে চাইছে।
তবে এই পরিকল্পনায় মার্কিন কংগ্রেসের বাধা রয়েছে। ইউরোপে মার্কিন সেনার সংখ্যা দ্রুত কমিয়ে ফেলার পথে আইনগত সীমাবদ্ধতাও তৈরি করা হয়েছে।
ইরান যুদ্ধ বদলে দিচ্ছে হিসাব
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি ট্রাম্প প্রশাসনের পরিকল্পনাকে আরও জটিল করে তুলেছে। সিরিয়া থেকে মার্কিন সেনা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং ইরাক থেকেও সেনা প্রত্যাহারের পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু ইরানকে ঘিরে সংঘাতের কারণে বিমানবাহী রণতরি, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ ওই অঞ্চলে ব্যবহার করতে হচ্ছে।
এর ফলে চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাত মোকাবিলার জন্য সংরক্ষিত সামরিক সরঞ্জামের ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে মার্কিন সেনার উপস্থিতি যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় বেড়েছে।
ইরানের কাছাকাছি এলাকা থেকে মার্কিন বাহিনী সরিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকলেও যুদ্ধের বাস্তবতায় তা কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটিগুলো হামলার মুখে পড়ায় দূরবর্তী ঘাঁটি থেকেও অভিযান পরিচালনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

পশ্চিম গোলার্ধেও নতুন সামরিক চাপ
শুধু ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্য নয়, আমেরিকার নিজস্ব প্রতিবেশী অঞ্চলও সামরিক পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড এবং পুরো পশ্চিম গোলার্ধের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছে।
ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মার্কিন হস্তক্ষেপের পাশাপাশি কিউবাকে ঘিরে সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে। এমন কোনো অভিযান শুরু হলে ক্যারিবীয় অঞ্চলে মার্কিন নৌবাহিনীর ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।
অবকাঠামো উন্নয়নের সাম্প্রতিক কিছু উদ্যোগও ইঙ্গিত দিচ্ছে, এই অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন সামরিক উপস্থিতির পরিকল্পনা থাকতে পারে।
এশিয়ায় কি সত্যিই বাড়ছে মার্কিন শক্তি?
এশিয়ায় অবশ্য মার্কিন সামরিক তৎপরতা পুরোপুরি থেমে নেই। গুয়ামে অবকাঠামো ও সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার পার্থে সাবমেরিন ঘাঁটি উন্নত করা হচ্ছে, যাতে মার্কিন সাবমেরিনগুলো দীর্ঘ সময় ওই অঞ্চলে অবস্থান করতে পারে।
ফিলিপাইনে মার্কিন নৌসেনা ও মেরিন বাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। এশিয়ার বিভিন্ন বিমানঘাঁটি উন্নত করা হচ্ছে এবং বড় আকারের সামরিক মহড়াও অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
তবে এসব উদ্যোগের মধ্যেও এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সেনা ও সামরিক সরঞ্জামের মোট পরিমাণ খুব একটা বাড়েনি। বছরের বড় একটি সময় এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি মাত্র বিমানবাহী রণতরি মোতায়েন ছিল, যেখানে সাধারণত দুটি রাখার চেষ্টা করা হয়।

জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত
জাপানে এখনো প্রায় ৫৫ হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়াতেও রয়েছে এর প্রায় অর্ধেক। তবে এসব অঞ্চলে বড় ধরনের সেনা বৃদ্ধির পরিবর্তে বিদ্যমান বাহিনীর বিন্যাস বদলের চিন্তা চলছে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় থাকা প্রায় সাড়ে চার হাজার সদস্যের একটি শক্তিশালী স্থলবাহিনী ইউনিটকে চীনকেন্দ্রিক প্রস্তুতিতে কাজে লাগানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। এতে দক্ষিণ কোরিয়ার নিরাপত্তা ও চীনের বিরুদ্ধে মার্কিন কৌশলের মধ্যে ভারসাম্য নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
বিপুল বাজেটেও দ্রুত বদলাবে না পরিস্থিতি
ট্রাম্প প্রশাসন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রতিরক্ষা বাজেটের জন্য প্রায় ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার চেয়েছে। আগের তুলনায় এটি বড় ধরনের বৃদ্ধি। কিন্তু বিপুল অর্থ বরাদ্দ পেলেও নতুন সেনা, যুদ্ধজাহাজ, বিমান ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম দ্রুত তৈরি বা মোতায়েন করা সম্ভব নয়।
ফলে একই সময়ে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, পশ্চিম গোলার্ধ এবং এশিয়ায় সামরিক স্বার্থ রক্ষা করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চীনকে ঠেকাতে গিয়ে বাড়ছে চাপ
ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—চীনকে মোকাবিলার জন্য এশিয়ায় প্রয়োজনীয় সামরিক শক্তি কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, যখন বিশ্বের অন্য প্রান্তে মার্কিন বাহিনী নানা সংঘাত ও নিরাপত্তা দায়িত্বে ব্যস্ত।
যে নীতির মূল লক্ষ্য ছিল বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন সামরিক উপস্থিতিকে সংকুচিত করে এশিয়ায় মনোযোগ বাড়ানো, বাস্তবে সেটি এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। বরং ইরান, ইউরোপ ও পশ্চিম গোলার্ধের পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রকে একাধিক দিক সামলাতে বাধ্য করছে।
ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ হয়ে উঠেছে—একদিকে বিশ্বজুড়ে সামরিক দায় কমানো, অন্যদিকে চীনের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলা। এই দুই লক্ষ্য একসঙ্গে কতটা বাস্তবায়ন করা সম্ভব, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা রাজনীতির বড় প্রশ্ন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















