জাকার্তায় পুলিশের সঙ্গে সেনাবাহিনীর প্রকাশ্য টানাপোড়েন ইন্দোনেশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামো ও রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। দুর্নীতিবিরোধী তদন্তকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই বিরোধ একপর্যায়ে গভীর রাতে সশস্ত্র সেনাসদস্যদের পুলিশ সদর দপ্তরের সামনে অবস্থান নেওয়ার ঘটনায় রীতিমতো সংঘাতের রূপ নেয়।
ঘটনাটির সূত্রপাত ৮ জুলাই। ইন্দোনেশিয়ার বিশেষ অপরাধবিষয়ক উপ-অ্যাটর্নি জেনারেল ফেব্রি আদ্রিয়ানশ্যাহর বাসভবনে পুলিশের অভিযানে সাতটি স্যুটকেস থেকে ৭৪ কেজি সোনার বার এবং আরও প্রায় ২ কোটি মার্কিন ডলার নগদ অর্থ উদ্ধার করা হয়। জাকার্তার অভিজাত একটি আবাসিক এলাকায় গলফ মাঠের পাশে ওই বাড়িটি ফ্রেব্রির নিজের বলে স্বীকার করলেও উদ্ধার হওয়া অর্থ ও সোনার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই বলে তিনি দাবি করেছেন।
সোনার চেয়েও বড় হয়ে উঠল ক্ষমতার সংঘাত
ইন্দোনেশিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুর্নীতিবিরোধী কর্মকর্তাদের একজনের বাড়িতে এত বিপুল পরিমাণ সম্পদ পাওয়ার ঘটনাই যথেষ্ট আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু পরদিন ভোররাতে পরিস্থিতি আরও নাটকীয় হয়ে ওঠে।
রাত ৩টার দিকে ফেব্রির ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত কয়েকটি সশস্ত্র সেনাদল পুলিশের সদর দপ্তরের সামনে হাজির হয়। কিছু সময় পর তারা কোনো সংঘর্ষ ছাড়াই সরে যায়। তবে এই অবস্থান ইন্দোনেশিয়ার দুই শক্তিশালী নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের মধ্যকার বিরোধ কতটা গভীরে পৌঁছেছে, তা স্পষ্ট করে দেয়।
ঘটনার পর প্রেসিডেন্ট প্রবোও সুবিয়ান্তো দ্রুত দুই পক্ষকে আলোচনায় ডাকেন। সংঘাত সামাল দিতে একটি সমঝোতার পথ তৈরি হয়। এর অংশ হিসেবে ফেব্রি উপ-অ্যাটর্নি জেনারেলের পদ থেকে সরে দাঁড়ান। তবে তার বিরুদ্ধে তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের হাতে না দিয়ে নিজস্ব প্রতিষ্ঠানকেই দেওয়া হয়েছে।

একসময় পুলিশ ছিল সেনাবাহিনীর ‘ছোট ভাই’
বর্তমান পরিস্থিতি বুঝতে হলে ইন্দোনেশিয়ার সামরিক ও পুলিশ কাঠামোর পুরোনো ইতিহাসের দিকে তাকাতে হয়।
সুহার্তোর দীর্ঘ শাসনামলে, ১৯৬৬ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত, সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণেই ছিল পুলিশ। তখন পুলিশকে সেনাবাহিনীর অধীনস্থ শক্তি হিসেবেই দেখা হতো।
সুহার্তোর পতনের পর গণতান্ত্রিক সংস্কারের সময় পুলিশ আলাদা নিরাপত্তা বাহিনী হিসেবে স্বাধীনতা পায়। এরপর থেকেই সেনাবাহিনী ও পুলিশের মধ্যে প্রভাব, অর্থনৈতিক সুবিধা এবং বিভিন্ন অবৈধ ব্যবসা থেকে পাওয়া আয়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু হয়।
কখনো কখনো এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা সহিংস পর্যায়েও পৌঁছেছে। দুই পক্ষেরই সরকারের ভেতরে শক্তিশালী মিত্র রয়েছে। দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়কে সাধারণত সেনাবাহিনীর ঘনিষ্ঠ বলেই মনে করা হয়। তবে এতদিন এক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাকে অন্য প্রতিষ্ঠান সরাসরি চ্যালেঞ্জ করার ঘটনা তুলনামূলকভাবে বিরল ছিল।
প্রবোওর নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন
সাম্প্রতিক সংঘাতকে শুধু দুর্নীতির তদন্ত দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। এর পেছনে প্রেসিডেন্ট প্রবোওর রাজনৈতিক নেতৃত্বের ধরনও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রবোওকে এমন একজন নেতা হিসেবে দেখা হয়, যিনি ক্ষমতার বিভিন্ন কেন্দ্রকে নিজের প্রভাবের মধ্যে রেখে ভারসাম্য বজায় রাখতে পছন্দ করেন। তার শাসনপদ্ধতিতে জাভার ঐতিহ্যবাহী রাজকীয় রাজনীতির ছাপ রয়েছে বলে মনে করা হয়।
তার ক্ষমতাকেন্দ্রের দুই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি প্রতিরক্ষামন্ত্রী শ্যাফরি শামসুদ্দিন এবং পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে তার দলের নেতা সুফমি দাসকো আহমেদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে বলেও আলোচনা রয়েছে।
সেনাবাহিনীর ওপর শ্যাফরির প্রভাব রয়েছে। অন্যদিকে দাসকোর সঙ্গে পুলিশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা। ফলে দুই নেতার ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নিরাপত্তা বাহিনীর অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতাকেও আরও তীব্র করে তুলছে।
সামনে আরও সংঘাতের আশঙ্কা
জাকার্তায় রাত ৩টার সেই মুখোমুখি অবস্থান আপাতত বড় সংঘর্ষ ছাড়াই শেষ হয়েছে। প্রেসিডেন্টের হস্তক্ষেপে ফেব্রিও দায়িত্ব থেকে সরে গেছেন। কিন্তু মূল বিরোধ যে পুরোপুরি মিটে গেছে, তা বলা কঠিন।
সেনাবাহিনী ও পুলিশের মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা, রাজনৈতিক মিত্রদের পারস্পরিক ক্ষমতার লড়াই এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন একসঙ্গে কাজ করছে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রেসিডেন্ট প্রবোও কতটা সফল হন, তার ওপর ইন্দোনেশিয়ার নিরাপত্তা ব্যবস্থার স্থিতিশীলতাও অনেকাংশে নির্ভর করছে।
সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো, রাজনৈতিক সমঝোতা দ্রুত না হলে জাকার্তার গভীর রাতের সেই মুখোমুখি অবস্থান হয়তো শেষ ঘটনা নয়। বরং এটি আরও বড় কোনো সংঘাতের পূর্বাভাসও হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















