০৭:০২ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬
সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু চুক্তি: জ্বালানি সহযোগিতার আড়ালে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন কৌশলগত সমীকরণ স্বাধীনতা এক দিনের উৎসব নয়, প্রতিদিনের রাষ্ট্রচর্চা ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা পরমাণু অস্ত্র তৈরিতে বেশি আগ্রহী: মার্কিন গোয়েন্দা দিল্লিতে বসতে চেয়েছিল পাকিস্তানের গণপরিষদ, আপত্তিতে ভেস্তে যায় জিন্নাহর পরিকল্পনা সিঙ্গাপুরের জাতীয় দিবসের আয়োজনে মাসকটদের দুর্দান্ত নাচ, সামাজিক মাধ্যমে ঝড় সিঙ্গাপুরের ৬০ হাজার তরুণের মতামতে বদলাচ্ছে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সুপ্রিম কোর্টের বাধা পেরিয়ে ফিরছে ট্রাম্পের শুল্ক, চাপে মার্কিন অর্থনীতি ও ভোক্তা সৌদি-যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু চুক্তি: ইরান, ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে কী প্রভাব পড়তে পারে ইরান যুদ্ধ নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে মার্কিন ভোটারদের, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় বড় ধাক্কার আশঙ্কা পারমাণবিক ভারসাম্যের নতুন যুগ

তাইওয়ান ঘিরে চীনের ‘ছায়া নৌবাহিনী’, একসঙ্গে হাজার মাছধরা নৌকার মহড়া

চীনের পূর্ব উপকূলের ব্যস্ত মাছধরা নৌকাগুলো এখন শুধু মাছ ধরার কাজে সীমাবদ্ধ নেই। তাইওয়ানকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক চীনা মাছধরা নৌকার সংগঠিত চলাচল নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—এসব নৌকা কি ভবিষ্যৎ কোনো সংঘাতের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে?

গত কয়েক মাসে চীনের পূর্ব উপকূলের ঝৌশানসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত মাছধরা নৌকা সমুদ্রে অস্বাভাবিকভাবে একত্র হয়েছে। ডিসেম্বরের এক ঘটনায় এক হাজারের বেশি নৌকা তাইওয়ানের উত্তরের সমুদ্রে উল্টো ইংরেজি ‘এল’ আকৃতির বিন্যাস তৈরি করে ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় অবস্থান করে। এরপর কয়েক মাসে আরও চারবার বড় আকারের নৌবহর গড়ে ওঠে।

মাছধরা নৌকা, নাকি অন্য কোনো প্রস্তুতি?

চীন এসব কর্মকাণ্ডকে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক মাছ ধরার কার্যক্রম হিসেবে দেখালেও এত বিপুলসংখ্যক নৌকার একই জায়গায় দীর্ঘ সময় ধরে অবস্থান বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি করেছে।

চীনের সামুদ্রিক শক্তির কাঠামো অন্য অনেক দেশের তুলনায় আলাদা। দেশটির নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের পাশাপাশি রয়েছে তথাকথিত সামুদ্রিক মিলিশিয়া। মাছধরা নৌকার একটি অংশকে রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে প্রশিক্ষণ ও সংগঠিত করে এই বাহিনির আওতায় রাখা হয়।

দক্ষিণ চীন সাগরে বিতর্কিত দ্বীপ, প্রবালপ্রাচীর ও জলসীমায় চীনের দাবিকে শক্তিশালী করতে এই নৌকাগুলোর ব্যবহারের অভিযোগ বহুদিনের। তবে পূর্ব চীন সাগরে সাম্প্রতিক বিশাল নৌসমাবেশ আগের তুলনায় অনেক বড় হওয়ায় বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে।

একসঙ্গে হাজার নৌকা, বাড়ছে উদ্বেগ

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নজরকাড়া ছিল এক হাজারের বেশি নৌকার সমাবেশ। নৌকাগুলো এত ঘনভাবে অবস্থান নিয়েছিল যে কিছু বাণিজ্যিক জাহাজকে তাদের পথ এড়িয়ে চলতে হয়েছে।

এরপর জানুয়ারিতে আরেকটি বড় সমাবেশে কিছু নৌকা ৩০ ঘণ্টারও বেশি সময় একই এলাকায় অবস্থান করে। ওই সময়ের কাছাকাছি চীন তাইওয়ানকে ঘিরে বড় ধরনের সামরিক মহড়াও চালিয়েছিল।

মার্চে আরও একটি বিশাল নৌসমাবেশ দেখা যায় দক্ষিণ কোরিয়ার জেজু দ্বীপের কাছাকাছি এলাকায়। এপ্রিলেও একই ধরনের আরেকটি সমাবেশ হয়। অর্থাৎ ছয় মাসেরও কম সময়ে পাঁচটি বড় নৌগুচ্ছের উপস্থিতি দেখা গেছে।

এতগুলো নৌকাকে একই সময়ে একই এলাকায় এনে দীর্ঘক্ষণ নির্দিষ্ট বিন্যাসে রাখা শুধু প্রযুক্তিগতভাবে নয়, রাজনৈতিকভাবেও বড় ধরনের সমন্বয়ের ইঙ্গিত দেয়।

কেন এই বাহিনী চীনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ

চীনের সামুদ্রিক মিলিশিয়ার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—তাদের অনেক সদস্য ও নৌযান দেখতে সাধারণ মাছধরা নৌকার মতো। ফলে কোনো উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে তাদের কর্মকাণ্ডকে সরাসরি সামরিক অভিযান হিসেবে চিহ্নিত করা কঠিন হতে পারে।

এই কাঠামোকে চীনের তথাকথিত ‘ধূসর অঞ্চল’ কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা হয়। অর্থাৎ সরাসরি যুদ্ধ শুরু না করেও প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করা, নজরদারি চালানো কিংবা বিতর্কিত এলাকায় উপস্থিতি জোরদার করা।

চীনের সামুদ্রিক মিলিশিয়া একসময় পুরোনো নৌকা, সীমিত প্রশিক্ষণ ও দুর্বল শৃঙ্খলার কারণে অনেকটা অনিয়মিত বাহিনী হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু শি জিনপিং ক্ষমতায় আসার পর থেকে এই বাহিনীকে আধুনিক, সংগঠিত ও প্রযুক্তিনির্ভর করার উদ্যোগ জোরদার হয়েছে।

দক্ষিণ চীন সাগরে সবচেয়ে বেশি সক্রিয়

চীনের সামুদ্রিক মিলিশিয়ার আধুনিকায়ন সবচেয়ে বেশি এগিয়েছে দক্ষিণ চীন সাগরে। সেখানে বড় ইস্পাতের নৌযানে জলকামানসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ব্যবহার করে বিতর্কিত জলসীমায় টহল, নজরদারি এবং বিদেশি নৌযানকে হয়রানি করার অভিযোগ রয়েছে।

উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বিতর্কিত এলাকায় মাছ ধরার সরঞ্জাম ব্যবহার না করে দীর্ঘ সময় অবস্থান করা কিংবা একাধিক নৌকা পাশাপাশি বেঁধে ভাসমান বাধা তৈরি করার মতো কর্মকাণ্ড সামুদ্রিক মিলিশিয়ার উপস্থিতির ইঙ্গিত দিতে পারে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ চীন সাগরে এমন নৌযানের উপস্থিতি ক্রমেই বেড়েছে। এর ফলে চীন ও ওই অঞ্চলের অন্যান্য দাবিদার দেশের মধ্যে উত্তেজনাও বাড়ছে।

China's shadowy maritime militia is worryingly active | The Economist

তাইওয়ান সংকটে কী ভূমিকা নিতে পারে

সাম্প্রতিক নৌসমাবেশের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—তাইওয়ানকে ঘিরে কোনো সামরিক সংঘাত হলে এসব মাছধরা নৌকা কী কাজে ব্যবহার করা হতে পারে?

সম্ভাব্য ভূমিকার মধ্যে রয়েছে নজরদারি, তথ্য সংগ্রহ, সামরিক সরঞ্জাম পরিবহন এবং নৌবাহিনীকে সহায়তা করা। এমনকি সমুদ্রের নিচের যোগাযোগব্যবস্থার তার কেটে দেওয়ার মতো কর্মকাণ্ডেও এসব নৌযান ব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে।

তাইওয়ানকে ঘিরে অবরোধ তৈরি করা হলে বিপুলসংখ্যক মাছধরা নৌকা সমুদ্রপথে চলাচলকারী জাহাজের জন্য বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করতে পারে। সরাসরি সামরিক হামলার বদলে পণ্য ও জাহাজ চলাচল সীমিত করার মতো পদক্ষেপেও এসব নৌকা কাজে লাগতে পারে।

আরও ভয়াবহ পরিস্থিতিতে বিপুলসংখ্যক মাছধরা নৌকাকে একসঙ্গে সমুদ্রে নামিয়ে প্রতিপক্ষের জন্য অসংখ্য সম্ভাব্য লক্ষ্য তৈরি করা সম্ভব বলেও আশঙ্কা রয়েছে।

নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাই বড় শক্তি

চীনের সামুদ্রিক মিলিশিয়ার প্রকৃত সদস্যসংখ্যা প্রকাশ্যে স্পষ্ট নয়। তবে বিশাল বেসামরিক মাছধরা বহরকে রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে সমন্বিতভাবে পরিচালনার সক্ষমতাই এই ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

বিশ্বের অনেক দেশেই জেলেরা কোথায় মাছ ধরছেন, তা নিয়মিত জানাতে অনিচ্ছুক থাকেন। কিন্তু চীন বিপুলসংখ্যক বেসামরিক নৌযানকে একই সময়ে নির্দিষ্ট এলাকায় সংগঠিত করতে পারছে। ভবিষ্যৎ কোনো সংঘাতে এই সক্ষমতা সামরিক ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

জেলেদের চোখে যুদ্ধের সম্ভাবনা

ঝৌশানের অনেক জেলের সঙ্গে তাইওয়ানের ঐতিহাসিক সম্পর্কও রয়েছে। ১৯৫০ সালে চীনের গৃহযুদ্ধের পর ঝৌশান ছিল জাতীয়তাবাদী বাহিনির নিয়ন্ত্রণে থাকা শেষ দিকের অঞ্চলগুলোর একটি। সেখানকার বহু মানুষকে সে সময় জোর করে সেনাবাহিনিতে নেওয়া হয়েছিল এবং তাইওয়ানে পাঠানো হয়েছিল।

তবে বর্তমান প্রজন্মের জেলেদের কাছে যুদ্ধের বাস্তবতা অনেক বেশি অর্থনৈতিক। এক প্রবীণ জেলের মতে, যুদ্ধ শুরু হলে মাছ ধরার ব্যবসা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে। কর্তৃপক্ষ নির্দেশ দিলে তিনি সহযোগিতা করবেন, তবে স্বেচ্ছায় সংঘাতে জড়ানোর আগ্রহ নেই।

অন্যদিকে তরুণ প্রজন্মের কেউ কেউ মনে করেন, দেশের প্রয়োজন হলে জেলেরা একসঙ্গে দাঁড়াবেন।

সামনে বড় প্রশ্ন

তাইওয়ানকে ঘিরে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলোর উত্তেজনা যখন ক্রমেই বাড়ছে, তখন হাজার হাজার বেসামরিক নৌযানের সম্ভাব্য সামরিক ব্যবহারের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

সাম্প্রতিক নৌসমাবেশগুলো সরাসরি কোনো যুদ্ধের প্রস্তুতি—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রকাশ্য প্রমাণ নেই। তবে এত অল্প সময়ে এত বড় আকারের সংগঠিত নৌচলাচল চীনের সামুদ্রিক সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, যুদ্ধ না হলেও এমন নৌবহর ব্যবহার করে সমুদ্রপথে চাপ তৈরি, নজরদারি, বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল ব্যাহত কিংবা প্রতিপক্ষকে অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখা সম্ভব। ফলে চীনের এই ‘ছায়া নৌবাহিনী’ এখন শুধু মাছধরার বিষয় নয়, পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা সমীকরণেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু চুক্তি: জ্বালানি সহযোগিতার আড়ালে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন কৌশলগত সমীকরণ

তাইওয়ান ঘিরে চীনের ‘ছায়া নৌবাহিনী’, একসঙ্গে হাজার মাছধরা নৌকার মহড়া

০৫:৩২:৫৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬

চীনের পূর্ব উপকূলের ব্যস্ত মাছধরা নৌকাগুলো এখন শুধু মাছ ধরার কাজে সীমাবদ্ধ নেই। তাইওয়ানকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক চীনা মাছধরা নৌকার সংগঠিত চলাচল নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—এসব নৌকা কি ভবিষ্যৎ কোনো সংঘাতের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে?

গত কয়েক মাসে চীনের পূর্ব উপকূলের ঝৌশানসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত মাছধরা নৌকা সমুদ্রে অস্বাভাবিকভাবে একত্র হয়েছে। ডিসেম্বরের এক ঘটনায় এক হাজারের বেশি নৌকা তাইওয়ানের উত্তরের সমুদ্রে উল্টো ইংরেজি ‘এল’ আকৃতির বিন্যাস তৈরি করে ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় অবস্থান করে। এরপর কয়েক মাসে আরও চারবার বড় আকারের নৌবহর গড়ে ওঠে।

মাছধরা নৌকা, নাকি অন্য কোনো প্রস্তুতি?

চীন এসব কর্মকাণ্ডকে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক মাছ ধরার কার্যক্রম হিসেবে দেখালেও এত বিপুলসংখ্যক নৌকার একই জায়গায় দীর্ঘ সময় ধরে অবস্থান বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি করেছে।

চীনের সামুদ্রিক শক্তির কাঠামো অন্য অনেক দেশের তুলনায় আলাদা। দেশটির নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের পাশাপাশি রয়েছে তথাকথিত সামুদ্রিক মিলিশিয়া। মাছধরা নৌকার একটি অংশকে রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে প্রশিক্ষণ ও সংগঠিত করে এই বাহিনির আওতায় রাখা হয়।

দক্ষিণ চীন সাগরে বিতর্কিত দ্বীপ, প্রবালপ্রাচীর ও জলসীমায় চীনের দাবিকে শক্তিশালী করতে এই নৌকাগুলোর ব্যবহারের অভিযোগ বহুদিনের। তবে পূর্ব চীন সাগরে সাম্প্রতিক বিশাল নৌসমাবেশ আগের তুলনায় অনেক বড় হওয়ায় বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে।

একসঙ্গে হাজার নৌকা, বাড়ছে উদ্বেগ

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নজরকাড়া ছিল এক হাজারের বেশি নৌকার সমাবেশ। নৌকাগুলো এত ঘনভাবে অবস্থান নিয়েছিল যে কিছু বাণিজ্যিক জাহাজকে তাদের পথ এড়িয়ে চলতে হয়েছে।

এরপর জানুয়ারিতে আরেকটি বড় সমাবেশে কিছু নৌকা ৩০ ঘণ্টারও বেশি সময় একই এলাকায় অবস্থান করে। ওই সময়ের কাছাকাছি চীন তাইওয়ানকে ঘিরে বড় ধরনের সামরিক মহড়াও চালিয়েছিল।

মার্চে আরও একটি বিশাল নৌসমাবেশ দেখা যায় দক্ষিণ কোরিয়ার জেজু দ্বীপের কাছাকাছি এলাকায়। এপ্রিলেও একই ধরনের আরেকটি সমাবেশ হয়। অর্থাৎ ছয় মাসেরও কম সময়ে পাঁচটি বড় নৌগুচ্ছের উপস্থিতি দেখা গেছে।

এতগুলো নৌকাকে একই সময়ে একই এলাকায় এনে দীর্ঘক্ষণ নির্দিষ্ট বিন্যাসে রাখা শুধু প্রযুক্তিগতভাবে নয়, রাজনৈতিকভাবেও বড় ধরনের সমন্বয়ের ইঙ্গিত দেয়।

কেন এই বাহিনী চীনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ

চীনের সামুদ্রিক মিলিশিয়ার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—তাদের অনেক সদস্য ও নৌযান দেখতে সাধারণ মাছধরা নৌকার মতো। ফলে কোনো উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে তাদের কর্মকাণ্ডকে সরাসরি সামরিক অভিযান হিসেবে চিহ্নিত করা কঠিন হতে পারে।

এই কাঠামোকে চীনের তথাকথিত ‘ধূসর অঞ্চল’ কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা হয়। অর্থাৎ সরাসরি যুদ্ধ শুরু না করেও প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করা, নজরদারি চালানো কিংবা বিতর্কিত এলাকায় উপস্থিতি জোরদার করা।

চীনের সামুদ্রিক মিলিশিয়া একসময় পুরোনো নৌকা, সীমিত প্রশিক্ষণ ও দুর্বল শৃঙ্খলার কারণে অনেকটা অনিয়মিত বাহিনী হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু শি জিনপিং ক্ষমতায় আসার পর থেকে এই বাহিনীকে আধুনিক, সংগঠিত ও প্রযুক্তিনির্ভর করার উদ্যোগ জোরদার হয়েছে।

দক্ষিণ চীন সাগরে সবচেয়ে বেশি সক্রিয়

চীনের সামুদ্রিক মিলিশিয়ার আধুনিকায়ন সবচেয়ে বেশি এগিয়েছে দক্ষিণ চীন সাগরে। সেখানে বড় ইস্পাতের নৌযানে জলকামানসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ব্যবহার করে বিতর্কিত জলসীমায় টহল, নজরদারি এবং বিদেশি নৌযানকে হয়রানি করার অভিযোগ রয়েছে।

উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বিতর্কিত এলাকায় মাছ ধরার সরঞ্জাম ব্যবহার না করে দীর্ঘ সময় অবস্থান করা কিংবা একাধিক নৌকা পাশাপাশি বেঁধে ভাসমান বাধা তৈরি করার মতো কর্মকাণ্ড সামুদ্রিক মিলিশিয়ার উপস্থিতির ইঙ্গিত দিতে পারে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ চীন সাগরে এমন নৌযানের উপস্থিতি ক্রমেই বেড়েছে। এর ফলে চীন ও ওই অঞ্চলের অন্যান্য দাবিদার দেশের মধ্যে উত্তেজনাও বাড়ছে।

China's shadowy maritime militia is worryingly active | The Economist

তাইওয়ান সংকটে কী ভূমিকা নিতে পারে

সাম্প্রতিক নৌসমাবেশের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—তাইওয়ানকে ঘিরে কোনো সামরিক সংঘাত হলে এসব মাছধরা নৌকা কী কাজে ব্যবহার করা হতে পারে?

সম্ভাব্য ভূমিকার মধ্যে রয়েছে নজরদারি, তথ্য সংগ্রহ, সামরিক সরঞ্জাম পরিবহন এবং নৌবাহিনীকে সহায়তা করা। এমনকি সমুদ্রের নিচের যোগাযোগব্যবস্থার তার কেটে দেওয়ার মতো কর্মকাণ্ডেও এসব নৌযান ব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে।

তাইওয়ানকে ঘিরে অবরোধ তৈরি করা হলে বিপুলসংখ্যক মাছধরা নৌকা সমুদ্রপথে চলাচলকারী জাহাজের জন্য বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করতে পারে। সরাসরি সামরিক হামলার বদলে পণ্য ও জাহাজ চলাচল সীমিত করার মতো পদক্ষেপেও এসব নৌকা কাজে লাগতে পারে।

আরও ভয়াবহ পরিস্থিতিতে বিপুলসংখ্যক মাছধরা নৌকাকে একসঙ্গে সমুদ্রে নামিয়ে প্রতিপক্ষের জন্য অসংখ্য সম্ভাব্য লক্ষ্য তৈরি করা সম্ভব বলেও আশঙ্কা রয়েছে।

নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাই বড় শক্তি

চীনের সামুদ্রিক মিলিশিয়ার প্রকৃত সদস্যসংখ্যা প্রকাশ্যে স্পষ্ট নয়। তবে বিশাল বেসামরিক মাছধরা বহরকে রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে সমন্বিতভাবে পরিচালনার সক্ষমতাই এই ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

বিশ্বের অনেক দেশেই জেলেরা কোথায় মাছ ধরছেন, তা নিয়মিত জানাতে অনিচ্ছুক থাকেন। কিন্তু চীন বিপুলসংখ্যক বেসামরিক নৌযানকে একই সময়ে নির্দিষ্ট এলাকায় সংগঠিত করতে পারছে। ভবিষ্যৎ কোনো সংঘাতে এই সক্ষমতা সামরিক ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

জেলেদের চোখে যুদ্ধের সম্ভাবনা

ঝৌশানের অনেক জেলের সঙ্গে তাইওয়ানের ঐতিহাসিক সম্পর্কও রয়েছে। ১৯৫০ সালে চীনের গৃহযুদ্ধের পর ঝৌশান ছিল জাতীয়তাবাদী বাহিনির নিয়ন্ত্রণে থাকা শেষ দিকের অঞ্চলগুলোর একটি। সেখানকার বহু মানুষকে সে সময় জোর করে সেনাবাহিনিতে নেওয়া হয়েছিল এবং তাইওয়ানে পাঠানো হয়েছিল।

তবে বর্তমান প্রজন্মের জেলেদের কাছে যুদ্ধের বাস্তবতা অনেক বেশি অর্থনৈতিক। এক প্রবীণ জেলের মতে, যুদ্ধ শুরু হলে মাছ ধরার ব্যবসা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে। কর্তৃপক্ষ নির্দেশ দিলে তিনি সহযোগিতা করবেন, তবে স্বেচ্ছায় সংঘাতে জড়ানোর আগ্রহ নেই।

অন্যদিকে তরুণ প্রজন্মের কেউ কেউ মনে করেন, দেশের প্রয়োজন হলে জেলেরা একসঙ্গে দাঁড়াবেন।

সামনে বড় প্রশ্ন

তাইওয়ানকে ঘিরে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলোর উত্তেজনা যখন ক্রমেই বাড়ছে, তখন হাজার হাজার বেসামরিক নৌযানের সম্ভাব্য সামরিক ব্যবহারের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

সাম্প্রতিক নৌসমাবেশগুলো সরাসরি কোনো যুদ্ধের প্রস্তুতি—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রকাশ্য প্রমাণ নেই। তবে এত অল্প সময়ে এত বড় আকারের সংগঠিত নৌচলাচল চীনের সামুদ্রিক সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, যুদ্ধ না হলেও এমন নৌবহর ব্যবহার করে সমুদ্রপথে চাপ তৈরি, নজরদারি, বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল ব্যাহত কিংবা প্রতিপক্ষকে অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখা সম্ভব। ফলে চীনের এই ‘ছায়া নৌবাহিনী’ এখন শুধু মাছধরার বিষয় নয়, পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা সমীকরণেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।