ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি যেন বারবার ফিরে আসা এক পুরোনো গল্প। আইনি বাধা, বাজারের চাপ এবং মূল্যবৃদ্ধিতে ক্ষুব্ধ মানুষের অসন্তোষ—কোনো কিছুই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা থেকে পুরোপুরি সরিয়ে দিতে পারেনি। বরং পুরোনো আইনের নতুন ব্যাখ্যা ব্যবহার করে আবারও শুল্কনীতিকে সক্রিয় করার পথে এগোচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন।
গত ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের বৈশ্বিক শুল্ক আরোপের প্রধান আইনি ভিত্তি বাতিল করে। এরপর সাময়িকভাবে শুল্ক কমানো হলেও এখন নতুন আইনি পথ ব্যবহার করে তা আবার বাড়ানোর প্রস্তুতি চলছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতি, মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়—সবকিছু নিয়েই নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ব্রাজিলের পণ্যে ২৫ শতাংশ শুল্ক
গত ১৫ জুলাই ব্রাজিলের কিছু পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। এ সিদ্ধান্তের পেছনে স্থানীয় অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা, বন উজাড়সহ কয়েকটি অভিযোগকে কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
তবে এর সঙ্গে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার সরকারের সঙ্গে ওয়াশিংটনের চলমান রাজনৈতিক টানাপোড়েনের সম্পর্কও রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তটি কেবল অর্থনৈতিক বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকছে না, এর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের বিষয়ও জড়িয়ে পড়ছে।
কানাডার পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক
ব্রাজিলের পর কানাডার বিরুদ্ধেও বড় ধরনের শুল্কের ঘোষণা এসেছে। গত ২০ জুলাই ট্রাম্প প্রশাসন কানাডার নির্বাচিত কিছু পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নেয়।
প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য এই শুল্কের আওতায় আসতে পারে। এর মধ্যে এমন কিছু পণ্যও রয়েছে, যেগুলো যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা বাণিজ্য চুক্তির আওতায় সাধারণত শুল্কমুক্ত সুবিধা পেয়ে থাকে।
তবে নতুন শুল্ক ১৯ আগস্টের আগে কার্যকর হবে না। ফলে কানাডার সঙ্গে স্থবির হয়ে থাকা বাণিজ্য আলোচনা এবং ওই চুক্তি নবায়নের দরকষাকষিতে এই সময়টিকে চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে ট্রাম্প প্রশাসন।
আবার ফিরতে পারে ‘মুক্তি দিবসের’ শুল্ক
ট্রাম্পের বড় পরিকল্পনা আরও বিস্তৃত। গত বছরের তথাকথিত ‘মুক্তি দিবস’-এ ঘোষিত ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক এবং বিভিন্ন দেশের জন্য আলাদা শুল্ক আবার ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।
আগে এসব শুল্ক আরোপে ১৯৭৭ সালের একটি জরুরি ক্ষমতাসংক্রান্ত আইন ব্যবহার করা হয়েছিল। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি জাতীয় জরুরি পরিস্থিতি তৈরি করেছে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট সেই যুক্তির সঙ্গে একমত হয়নি।
এরপর গত ফেব্রুয়ারিতে ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের একটি ধারার আওতায় সাময়িকভাবে ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হয়। সেই ব্যবস্থার মেয়াদও শেষ হওয়ার পথে।
নতুন আইনে শুল্ক ধরে রাখার চেষ্টা
এবার ট্রাম্প প্রশাসন পুরোনো আইনের বিভিন্ন ধারা ব্যবহার করে শুল্ক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার পথ খুঁজছে। প্রায় ৬০টি দেশের বিরুদ্ধে জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্য ঠেকাতে ব্যর্থতার অভিযোগ এনে নতুন শুল্ক আরোপের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এর ফলে আগের ১০ শতাংশ শুল্কের একটি বড় অংশ অন্য আইনি কাঠামোর মাধ্যমে ধরে রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে। সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কার্যকর গড় শুল্কের হার প্রায় ৭ শতাংশের কাছাকাছি থাকতে পারে।
তবে এখানেই শেষ নয়। চলতি বছরের শেষ দিকে আরও ১৬টি বড় বাণিজ্য অংশীদারের বিরুদ্ধে নতুন তদন্তের মাধ্যমে দেশভেদে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তুতিও চলছে।

শুল্ক কি সত্যিই মার্কিন শিল্প ফিরিয়ে আনছে?
ট্রাম্পের শুল্কনীতির অন্যতম বড় রাজনৈতিক লক্ষ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন খাতকে শক্তিশালী করা এবং বিদেশে চলে যাওয়া শিল্প ফিরিয়ে আনা। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির কারখানা কার্যক্রমে কিছুটা গতি দেখা গেলেও এর পেছনে শুল্কের ভূমিকা কতটা, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
দ্বিতীয় প্রান্তিকে মার্কিন উৎপাদন খাতের উৎপাদন বার্ষিক হিসাবে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। ২০২১ সালের পর এটি দ্রুততম প্রবৃদ্ধিগুলোর একটি। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন থেকে, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকেন্দ্রিক চাহিদা থেকে।
অন্যদিকে কারখানা নির্মাণে বিনিয়োগ কমেছে। ২০২৪ সালে বার্ষিক হিসাবে প্রায় ২৫০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি ওঠা কারখানা নির্মাণ ব্যয় চলতি বছরের মে মাসে নেমে এসেছে প্রায় ১৭৫ বিলিয়ন ডলারে।
শিল্প খাতে কর্মসংস্থানও খুব আশাব্যঞ্জক নয়। ট্রাম্প দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে উৎপাদন খাতে প্রায় ৭৫ হাজার কর্মসংস্থান কমেছে।
ভোক্তার পকেটেই পড়ছে শুল্কের চাপ
শুল্কনীতির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি হতে পারে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ মনে করেন, শুল্কের কারণে ভোক্তা পণ্যের দাম বেড়েছে।
সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, শুল্ক ইতোমধ্যে ভোক্তা মূল্য প্রায় শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ বাড়িয়েছে। সামনে এই চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
শুধু ভোক্তা নয়, ব্যবসায়ীরাও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠানের আস্থা কমেছে। শুল্ক পরিশোধকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় একটি অংশও ভবিষ্যতে বাড়তি খরচ ক্রেতাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
অর্থাৎ শুল্কের বোঝা শেষ পর্যন্ত আমদানিকারক বা বিদেশি উৎপাদক একা বহন করছে না। এর একটি বড় অংশ গিয়ে পড়ছে মার্কিন ব্যবসা ও সাধারণ ভোক্তার ওপর।
ভোটারদের অসন্তোষই বড় পরীক্ষা
আইনি বাধা পেরিয়ে ট্রাম্পের শুল্কনীতি আবারও ফিরে আসতে পারে। প্রশাসন পুরোনো আইন ও নতুন তদন্তের মাধ্যমে শুল্কের কাঠামোকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করার চেষ্টা করছে।
কিন্তু শুল্ক দিয়ে সরকারের রাজস্ব বাড়ানো এবং বাণিজ্য অংশীদারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা গেলেও এর বিনিময়ে যদি পণ্যের দাম বাড়ে, বিনিয়োগ কমে এবং কর্মসংস্থানে ধাক্কা লাগে, তাহলে রাজনৈতিকভাবে পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
ট্রাম্পের শুল্ক আদালতের বাধা পেরিয়ে টিকে থাকতে পারে। কিন্তু মূল্যবৃদ্ধিতে ক্লান্ত মার্কিন ভোটারদের অসন্তোষ কতদিন সহ্য করতে পারবে—শেষ পর্যন্ত সেটিই হতে পারে তাঁর শুল্কনীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
ট্রাম্পের শুল্কনীতি আবারও ফিরছে, কিন্তু বাড়তি দামের চাপ ও দুর্বল কর্মসংস্থান নিয়ে মার্কিন ভোটারদের অসন্তোষ তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















