০৭:২৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬
মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরের বুকিত বিনতাংয়ে দুই মসজিদ নির্মাণ ঘিরে নতুন বিতর্ক নিকারাগুয়ায় নির্বাচন বাতিলের পথে ওর্তেগা, একদলীয় শাসনের আশঙ্কা খনিজ আছে, ক্ষমতা নেই: বিরল মৃত্তিকা সম্পদের খেলায় কেন পিছিয়ে পড়ছে মিয়ানমার সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু চুক্তি: জ্বালানি সহযোগিতার আড়ালে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন কৌশলগত সমীকরণ স্বাধীনতা এক দিনের উৎসব নয়, প্রতিদিনের রাষ্ট্রচর্চা ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা পরমাণু অস্ত্র তৈরিতে বেশি আগ্রহী: মার্কিন গোয়েন্দা দিল্লিতে বসতে চেয়েছিল পাকিস্তানের গণপরিষদ, আপত্তিতে ভেস্তে যায় জিন্নাহর পরিকল্পনা সিঙ্গাপুরের জাতীয় দিবসের আয়োজনে মাসকটদের দুর্দান্ত নাচ, সামাজিক মাধ্যমে ঝড় সিঙ্গাপুরের ৬০ হাজার তরুণের মতামতে বদলাচ্ছে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সুপ্রিম কোর্টের বাধা পেরিয়ে ফিরছে ট্রাম্পের শুল্ক, চাপে মার্কিন অর্থনীতি ও ভোক্তা

সৌদি-যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু চুক্তি: ইরান, ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে কী প্রভাব পড়তে পারে

সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বেসামরিক পরমাণু সহযোগিতা নিয়ে নতুন চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে বড় ধরনের আলোচনার জন্ম দিয়েছে। চুক্তির আওতায় সৌদি আরবের পরমাণু খাত গড়ে তুলতে যুক্তরাষ্ট্র প্রযুক্তি, সরঞ্জাম ও সহযোগিতা দেবে। একই সঙ্গে সৌদি আরব নিজ ভূখণ্ডে পরমাণু জ্বালানি সমৃদ্ধ করার সুযোগ পাবে কি না, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

২২ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট এবং সৌদি জ্বালানিমন্ত্রী যুবরাজ আবদুলআজিজ বিন সালমান বেসামরিক পরমাণু সহযোগিতা ও পরমাণু নিরাপত্তা সংক্রান্ত দুটি চুক্তিতে সই করেন। এর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি পরমাণু অংশীদারত্বের ভিত্তি তৈরি হয়েছে।

চুক্তিটি শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি, ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি সম্পর্ক এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নও।

চুক্তিতে কী থাকছে

চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে সৌদি আরবে বেসামরিক পরমাণু উপকরণ, প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম সরবরাহের সুযোগ তৈরি হয়েছে। সৌদি আরব যখন পরমাণু অবকাঠামো গড়ে তুলবে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু প্রতিষ্ঠানগুলো অগ্রাধিকার পাবে।

চুক্তিতে পরমাণু জ্বালানি তৈরি, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, জ্বালানি রূপান্তর ও ব্যবহৃত জ্বালানি পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত নিরাপত্তা যাচাইয়ের কথা বলা হয়েছে।

প্রাথমিক পর্যায়ে সৌদি আরব বিদেশ থেকে পরমাণু জ্বালানি আমদানি করবে। পাশাপাশি দেশটির নিজস্ব ভূখণ্ডে জ্বালানি সমৃদ্ধকরণের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা যাচাই করতে দুই বছরের একটি যৌথ সমীক্ষার পরিকল্পনা রয়েছে।

এই সমীক্ষায় স্থানীয়ভাবে জ্বালানি সমৃদ্ধকরণের প্রয়োজনীয়তা প্রমাণিত হলে সৌদি আরবে এমন একটি স্থাপনা নির্মাণ ও পরিচালনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সংবেদনশীল প্রযুক্তি সৌদি আরবের হাতে সরাসরি চলে না যাওয়ার ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে।

তেলনির্ভরতা কমাতেই পরমাণু শক্তির দিকে সৌদি আরব

সৌদি আরবের পরমাণু কর্মসূচির পেছনে অন্যতম বড় কারণ অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনা। দেশটির যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান দীর্ঘদিন ধরেই তেলনির্ভরতা কমানোর কথা বলে আসছেন।

দেশটির ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনায় পর্যটন, বড় অবকাঠামো প্রকল্প, আর্থিক খাত এবং বিপুল বিদ্যুৎনির্ভর প্রযুক্তি অবকাঠামো তৈরির লক্ষ্য রয়েছে। ফলে আগামী দিনে বিদ্যুতের চাহিদা আরও বাড়বে।

বর্তমানে সৌদি আরব বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস ব্যবহার করে। পরমাণু বিদ্যুৎ সেই নির্ভরতা কমিয়ে অর্থনীতিকে আরও বৈচিত্র্যময় করার একটি পথ হতে পারে।

এ ছাড়া সৌদি আরবে ইউরেনিয়াম আকরিকের মজুত রয়েছে বলে দেশটির কর্মকর্তারা দাবি করে আসছেন। তাই পরমাণু জ্বালানি উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তোলার আগ্রহও দীর্ঘদিনের।

ইরানের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ

চুক্তিটির সবচেয়ে স্পর্শকাতর দিক সম্ভবত ইরানকে ঘিরে। ইরান মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে উন্নত পরমাণু কর্মসূচিগুলোর একটি পরিচালনা করছে। দেশটি উন্নতমানের যন্ত্রের মাধ্যমে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সক্ষমতাও তৈরি করেছে।

ইরান বরাবরই বলে আসছে, তার পরমাণু কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দেশটির পরমাণু কর্মকাণ্ড নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে।

এখন যুক্তরাষ্ট্র যদি সৌদি আরবকে নিজ ভূখণ্ডে পরমাণু জ্বালানি সমৃদ্ধ করার সুযোগ দেয়, তাহলে ইরানও নিজের সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রমের অধিকার আরও জোরালোভাবে তুলে ধরতে পারে। এতে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সমঝোতা আরও কঠিন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনা এবং চলমান সংঘাতের মধ্যে এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের পরমাণু প্রতিযোগিতার আশঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

The U.S.-Saudi Nuclear Deal Set Off Tremors. Is It Still Alive? | Council on  Foreign Relations

পরমাণু চুক্তির সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক কেন

চুক্তি ঘোষণার পরদিনই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, সৌদি আরবকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগে যোগ দিতে হবে। অর্থাৎ সৌদি-যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু সমঝোতার সঙ্গে ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়টিকেও যুক্ত করতে চাইছে ওয়াশিংটন।

ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে যে কাঠামো তৈরি হয়েছে, সেটিই আব্রাহাম চুক্তি নামে পরিচিত।

তবে সৌদি আরব এখনো ইসরায়েলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক স্থাপনে সম্মতি দেয়নি। রিয়াদের অবস্থান হলো, স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিশ্বাসযোগ্য পথ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলের সঙ্গে পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করা হবে না।

ফলে পরমাণু সহযোগিতার সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার শর্ত যুক্ত হওয়ায় বিষয়টি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

ফিলিস্তিন প্রশ্নও থাকছে বড় বাধা

গাজা যুদ্ধের পর সৌদি আরবের অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে। ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে অগ্রগতি ছাড়া ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়ে রিয়াদের আগ্রহ কমেছে।

অন্যদিকে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ, গাজায় দীর্ঘস্থায়ী সামরিক নিয়ন্ত্রণ এবং পূর্ব জেরুজালেমের অবস্থান নিয়ে ফিলিস্তিন প্রশ্নের সমাধান আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

তাই সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পরমাণু অংশীদারত্ব যতটা অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সহযোগিতার বিষয়, ততটাই এটি মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতির সঙ্গে যুক্ত।

সামনে কী হতে পারে

সৌদি-যুক্তরাষ্ট্রের এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্যে বেসামরিক পরমাণু শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। এতে দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি তেলনির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

তবে সৌদি আরবের নিজস্ব পরমাণু জ্বালানি সমৃদ্ধকরণের সম্ভাবনা ইরানের সঙ্গে নতুন উত্তেজনার কারণ হতে পারে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়টি চুক্তির সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় ফিলিস্তিন প্রশ্নও এর ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সব মিলিয়ে, সৌদি-যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু চুক্তি শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি সমঝোতা নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং ইসরায়েল-ফিলিস্তিন কূটনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

সৌদি-যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন পরমাণু প্রতিযোগিতা ও কূটনৈতিক সমীকরণের পথ খুলে দিতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরের বুকিত বিনতাংয়ে দুই মসজিদ নির্মাণ ঘিরে নতুন বিতর্ক

সৌদি-যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু চুক্তি: ইরান, ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে কী প্রভাব পড়তে পারে

০৫:৫৪:২৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬

সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বেসামরিক পরমাণু সহযোগিতা নিয়ে নতুন চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে বড় ধরনের আলোচনার জন্ম দিয়েছে। চুক্তির আওতায় সৌদি আরবের পরমাণু খাত গড়ে তুলতে যুক্তরাষ্ট্র প্রযুক্তি, সরঞ্জাম ও সহযোগিতা দেবে। একই সঙ্গে সৌদি আরব নিজ ভূখণ্ডে পরমাণু জ্বালানি সমৃদ্ধ করার সুযোগ পাবে কি না, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

২২ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট এবং সৌদি জ্বালানিমন্ত্রী যুবরাজ আবদুলআজিজ বিন সালমান বেসামরিক পরমাণু সহযোগিতা ও পরমাণু নিরাপত্তা সংক্রান্ত দুটি চুক্তিতে সই করেন। এর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি পরমাণু অংশীদারত্বের ভিত্তি তৈরি হয়েছে।

চুক্তিটি শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি, ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি সম্পর্ক এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নও।

চুক্তিতে কী থাকছে

চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে সৌদি আরবে বেসামরিক পরমাণু উপকরণ, প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম সরবরাহের সুযোগ তৈরি হয়েছে। সৌদি আরব যখন পরমাণু অবকাঠামো গড়ে তুলবে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু প্রতিষ্ঠানগুলো অগ্রাধিকার পাবে।

চুক্তিতে পরমাণু জ্বালানি তৈরি, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, জ্বালানি রূপান্তর ও ব্যবহৃত জ্বালানি পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত নিরাপত্তা যাচাইয়ের কথা বলা হয়েছে।

প্রাথমিক পর্যায়ে সৌদি আরব বিদেশ থেকে পরমাণু জ্বালানি আমদানি করবে। পাশাপাশি দেশটির নিজস্ব ভূখণ্ডে জ্বালানি সমৃদ্ধকরণের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা যাচাই করতে দুই বছরের একটি যৌথ সমীক্ষার পরিকল্পনা রয়েছে।

এই সমীক্ষায় স্থানীয়ভাবে জ্বালানি সমৃদ্ধকরণের প্রয়োজনীয়তা প্রমাণিত হলে সৌদি আরবে এমন একটি স্থাপনা নির্মাণ ও পরিচালনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সংবেদনশীল প্রযুক্তি সৌদি আরবের হাতে সরাসরি চলে না যাওয়ার ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে।

তেলনির্ভরতা কমাতেই পরমাণু শক্তির দিকে সৌদি আরব

সৌদি আরবের পরমাণু কর্মসূচির পেছনে অন্যতম বড় কারণ অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনা। দেশটির যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান দীর্ঘদিন ধরেই তেলনির্ভরতা কমানোর কথা বলে আসছেন।

দেশটির ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনায় পর্যটন, বড় অবকাঠামো প্রকল্প, আর্থিক খাত এবং বিপুল বিদ্যুৎনির্ভর প্রযুক্তি অবকাঠামো তৈরির লক্ষ্য রয়েছে। ফলে আগামী দিনে বিদ্যুতের চাহিদা আরও বাড়বে।

বর্তমানে সৌদি আরব বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস ব্যবহার করে। পরমাণু বিদ্যুৎ সেই নির্ভরতা কমিয়ে অর্থনীতিকে আরও বৈচিত্র্যময় করার একটি পথ হতে পারে।

এ ছাড়া সৌদি আরবে ইউরেনিয়াম আকরিকের মজুত রয়েছে বলে দেশটির কর্মকর্তারা দাবি করে আসছেন। তাই পরমাণু জ্বালানি উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তোলার আগ্রহও দীর্ঘদিনের।

ইরানের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ

চুক্তিটির সবচেয়ে স্পর্শকাতর দিক সম্ভবত ইরানকে ঘিরে। ইরান মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে উন্নত পরমাণু কর্মসূচিগুলোর একটি পরিচালনা করছে। দেশটি উন্নতমানের যন্ত্রের মাধ্যমে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সক্ষমতাও তৈরি করেছে।

ইরান বরাবরই বলে আসছে, তার পরমাণু কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দেশটির পরমাণু কর্মকাণ্ড নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে।

এখন যুক্তরাষ্ট্র যদি সৌদি আরবকে নিজ ভূখণ্ডে পরমাণু জ্বালানি সমৃদ্ধ করার সুযোগ দেয়, তাহলে ইরানও নিজের সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রমের অধিকার আরও জোরালোভাবে তুলে ধরতে পারে। এতে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সমঝোতা আরও কঠিন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনা এবং চলমান সংঘাতের মধ্যে এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের পরমাণু প্রতিযোগিতার আশঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

The U.S.-Saudi Nuclear Deal Set Off Tremors. Is It Still Alive? | Council on  Foreign Relations

পরমাণু চুক্তির সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক কেন

চুক্তি ঘোষণার পরদিনই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, সৌদি আরবকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগে যোগ দিতে হবে। অর্থাৎ সৌদি-যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু সমঝোতার সঙ্গে ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়টিকেও যুক্ত করতে চাইছে ওয়াশিংটন।

ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে যে কাঠামো তৈরি হয়েছে, সেটিই আব্রাহাম চুক্তি নামে পরিচিত।

তবে সৌদি আরব এখনো ইসরায়েলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক স্থাপনে সম্মতি দেয়নি। রিয়াদের অবস্থান হলো, স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিশ্বাসযোগ্য পথ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলের সঙ্গে পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করা হবে না।

ফলে পরমাণু সহযোগিতার সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার শর্ত যুক্ত হওয়ায় বিষয়টি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

ফিলিস্তিন প্রশ্নও থাকছে বড় বাধা

গাজা যুদ্ধের পর সৌদি আরবের অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে। ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে অগ্রগতি ছাড়া ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়ে রিয়াদের আগ্রহ কমেছে।

অন্যদিকে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ, গাজায় দীর্ঘস্থায়ী সামরিক নিয়ন্ত্রণ এবং পূর্ব জেরুজালেমের অবস্থান নিয়ে ফিলিস্তিন প্রশ্নের সমাধান আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

তাই সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পরমাণু অংশীদারত্ব যতটা অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সহযোগিতার বিষয়, ততটাই এটি মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতির সঙ্গে যুক্ত।

সামনে কী হতে পারে

সৌদি-যুক্তরাষ্ট্রের এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্যে বেসামরিক পরমাণু শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। এতে দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি তেলনির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

তবে সৌদি আরবের নিজস্ব পরমাণু জ্বালানি সমৃদ্ধকরণের সম্ভাবনা ইরানের সঙ্গে নতুন উত্তেজনার কারণ হতে পারে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়টি চুক্তির সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় ফিলিস্তিন প্রশ্নও এর ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সব মিলিয়ে, সৌদি-যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু চুক্তি শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি সমঝোতা নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং ইসরায়েল-ফিলিস্তিন কূটনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

সৌদি-যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন পরমাণু প্রতিযোগিতা ও কূটনৈতিক সমীকরণের পথ খুলে দিতে পারে।