১৯৪৭ সালের জুন। ভারত ভাগের আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি। নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাওয়া মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ তখন ভাবছিলেন, নবগঠিত পাকিস্তানের গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন কোথায় বসবে—দিল্লিতে, নাকি করাচিতে? সেই সময় দিল্লিতেই ভারতের গণপরিষদের নিয়মিত অধিবেশন চলছিল। ইতিহাসের এক বিস্ময়কর অধ্যায় হলো, জিন্নাহ শুরুতে দিল্লিকেই পাকিস্তানের গণপরিষদের জন্য সুবিধাজনক স্থান হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন।
দিল্লিতে বসার ভাবনা কেন এসেছিল
১৯৪৭ সালের ২৩ জুন লর্ড মাউন্টব্যাটেনের সঙ্গে বৈঠকে জিন্নাহ জানতে চেয়েছিলেন, পাকিস্তানের গণপরিষদের অধিবেশন দিল্লিতে বসানো সম্ভব কি না। তাঁর ধারণা ছিল, ভারতের গণপরিষদের সঙ্গে কাছাকাছি থেকে কাজ করলে নতুন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামো তৈরিতে কিছু বাস্তব সুবিধা পাওয়া যেতে পারে।
তখন দিল্লির কাউন্সিল হাউসের গ্রন্থাগার কক্ষে ভারতের গণপরিষদের বৈঠক নিয়মিত চলছিল। আইনসভার একটি কক্ষও খালি ছিল। ফলে মাউন্টব্যাটেনের কাছেও দিল্লিতে পাকিস্তানের গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন আয়োজনের প্রস্তাবটি অস্বাভাবিক মনে হয়নি।
জিন্নাহ জুলাইয়ের মাঝামাঝি অধিবেশন শুরু করার কথা ভাবছিলেন। তিনি জানতে চেয়েছিলেন, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এ ধরনের উদ্যোগে সম্মতি দেবে কি না।
নেহরুর প্রাথমিক ইতিবাচক মনোভাব বদলে গেল
মাউন্টব্যাটেন বিষয়টি ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর কাছে তুললে নেহরু প্রথমে সম্ভাবনাটি পুরোপুরি উড়িয়ে দেননি। তবে তিনি এককভাবে সিদ্ধান্ত নিতে চাননি। মন্ত্রিসভার সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করার পরামর্শ দেন।
কিন্তু পরদিনই পরিস্থিতি বদলে যায়। নেহরু মাউন্টব্যাটেনকে জানান, তিনি সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলসহ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সহকর্মীর সঙ্গে আলোচনা করেছেন। তাঁদের প্রতিক্রিয়া ছিল সম্পূর্ণ নেতিবাচক এবং তিনিও সেই মতের সঙ্গে একমত।
নেহরুর আশঙ্কার পেছনে ছিল নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক উত্তেজনা। একই সময়ে একই ভবনে ভারত ও পাকিস্তানের গণপরিষদের বৈঠক হলে দুই পক্ষের সমাবেশ, পাল্টা সমাবেশ এবং বিক্ষোভের আশঙ্কা ছিল। এমন পরিস্থিতি সংঘর্ষে গড়াতে পারে বলেও তিনি মনে করেছিলেন। তাঁর মতে, নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার শুরুতেই এমন উত্তেজনা অত্যন্ত খারাপ বার্তা দিত।
মাউন্টব্যাটেন পরে প্যাটেল ও রাজেন্দ্র প্রসাদের সঙ্গেও আলাদাভাবে কথা বলেন। কিন্তু তাঁরাও প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেন। ফলে দিল্লিতে পাকিস্তানের গণপরিষদ বসানোর পরিকল্পনা দ্রুতই বাতিল হয়ে যায়।
জিন্নাহকে ঘিরে তখনও ছিল নিরাপত্তার আশঙ্কা
দিল্লিতে পাকিস্তানের গণপরিষদ বসানোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের পেছনে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ যে অমূলক ছিল না, তার একটি বড় উদাহরণ ঘটেছিল মাত্র কয়েক দিন আগে।
দিল্লির ইম্পেরিয়াল হোটেলে সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের কাউন্সিলের বৈঠক চলছিল। বৈঠক প্রায় শেষের দিকে। এমন সময় খাকসার আন্দোলনের কয়েকজন সদস্য হাতে ধারালো কোদাল নিয়ে হোটেলের বাগানের দিক থেকে হঠাৎ ঢুকে পড়ে। তারা জিন্নাহকে খুঁজছিল এবং হোটেলে তাণ্ডব চালাতে থাকে।
আক্রমণকারীরা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে বৈঠকস্থলের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। মুসলিম লীগের নিরাপত্তাকর্মীরা তাদের বাধা দেয়। পরে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ওই ঘটনার পরও জিন্নাহ অত্যন্ত সংযত ছিলেন বলে বর্ণনা পাওয়া যায়।

খাকসার আন্দোলনের বিরোধিতা ছিল দেশভাগের সঙ্গেও
খাকসার আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন আল্লামা ইনায়াতুল্লাহ খান মাশরেকি। ১৯৩১ সালে লাহোরে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন ব্রিটিশ শাসনের অবসান চাইলেও ভারত ভাগের ধারণার বিরোধিতা করেছিল।
মাশরেকির বিশ্বাস ছিল, ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ভাগ হলে দুই দেশেই ধর্মীয় উগ্রতা বাড়তে পারে। তাঁর মতে, ভারত ভাগের ধারণার সঙ্গে ব্রিটিশদের বিভাজন করে শাসনের নীতিরও সম্পর্ক ছিল।
ইতিহাসের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে তাঁর এই আশঙ্কার নানা দিক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হয়েছে। তবে ১৯৪৭ সালের সেই অস্থির সময়ে দিল্লির রাজনৈতিক পরিবেশ যে কতটা উত্তপ্ত ছিল, জিন্নাহকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনাই তার একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।
শেষ পর্যন্ত করাচিতেই শুরু পাকিস্তানের সংসদীয় যাত্রা
দিল্লিতে গণপরিষদ বসানোর পরিকল্পনা বাতিল হওয়ার পর পাকিস্তানের প্রথম গণপরিষদের অধিবেশন করাচিতে অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৪৭ সালের ১০ আগস্ট সিন্ধ প্রাদেশিক আইনসভার ভবনে সেই অধিবেশন বসে। একই সময় করাচিই নতুন রাষ্ট্রের স্বাধীনতার কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানের সাংবিধানিক ও সংসদীয় কাঠামো একাধিকবার পরিবর্তিত হয়েছে। ১৯৫৬ সালের সংবিধান থেকে ১৯৬২ সালের নতুন ব্যবস্থা এবং ১৯৭২-৭৩ সালের সাংবিধানিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে দেশটির সংসদীয় কাঠামোও বদলেছে। শেষ পর্যন্ত ইসলামাবাদে নির্মিত নতুন সংসদ ভবন ১৯৮৬ সালে উদ্বোধন করা হয়।
কিন্তু ইতিহাসের পাতায় ১৯৪৭ সালের জুনের সেই প্রস্তাবটি আজও বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। যে জিন্নাহ কয়েক সপ্তাহ পর পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নেবেন, তিনিই একসময় পাকিস্তানের গণপরিষদের প্রথম বৈঠক দিল্লিতে বসানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। দেশভাগের উত্তাল বাস্তবতা, রাজনৈতিক অবিশ্বাস ও সংঘাতের আশঙ্কাই শেষ পর্যন্ত সেই অদ্ভুত সম্ভাবনার দরজা বন্ধ করে দেয়।
দেশভাগের ইতিহাসে তাই দিল্লিতে পাকিস্তানের গণপরিষদ বসানোর এই অসম্পন্ন পরিকল্পনা শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের গল্প নয়; এটি ভারত-পাকিস্তান বিভাজনের ঠিক আগের সময়ের জটিল রাজনৈতিক সম্পর্ক ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতেরও এক বিরল প্রতিচ্ছবি।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের আগে জিন্নাহ দিল্লিতে পাকিস্তানের গণপরিষদের অধিবেশন বসানোর কথা ভেবেছিলেন। রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত আপত্তিতে পরিকল্পনাটি বাতিল হয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















