কলম্বিয়ায় জাল মার্কিন ডলার তৈরির একটি চক্রের পেছনে থাকা দক্ষ গ্রাফিক শিল্পীকে ধরতে দীর্ঘদিন ধরে অভিযান চালিয়েছেন দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
দক্ষিণ-পশ্চিম কলম্বিয়ার কালদোনো এলাকায় ২০২৩ সালের অক্টোবরে একটি জাল নোট তৈরির কারখানায় অভিযান চালিয়ে প্রায় ১৬ লাখ ডলার মূল্যমানের জাল ৫০ ডলারের নোট উদ্ধার করা হয়। অভিযানে মুদ্রা তৈরির ছাপার প্লেট, কালি, মুদ্রণযন্ত্র, কাগজ কাটার যন্ত্রসহ নানা সরঞ্জামও জব্দ করা হয়।
তবে অভিযানের সবচেয়ে বড় রহস্য ছিল—এত নিখুঁত জাল নোটের নকশা তৈরি করছিল কে?
জাল নোটের পেছনে দক্ষ শিল্পী
তদন্তকারীরা দেখতে পান, উদ্ধার করা নোটগুলো সাধারণ জাল নোটের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত। নোটে ধারাবাহিক নম্বরও ছিল, আর স্পর্শে আসল নোটের মতো অনুভূতি তৈরির চেষ্টাও করা হয়েছিল।
তদন্তের সূত্র ধরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পৌঁছে যায় ‘ইসরায়েলি’ নামে পরিচিত এক গ্রাফিক শিল্পীর কাছে। তার আসল নাম আশের আরিয়াউ রদ্রিগেজ। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর ২০২৪ সালের জুলাইয়ে কালি শহরে তার বাড়িতে অভিযান চালানো হয়।
সেখানে পাওয়া যায় ছাপার যন্ত্র, কালি, কম্পিউটার, তথ্য সংরক্ষণের যন্ত্র এবং বিপুল পরিমাণ জাল ৫০ ডলারের নোট। তদন্তকারীরা তার কম্পিউটারে জাল নোট তৈরির ডিজিটাল নকশাও খুঁজে পান।
প্রযুক্তি বদলে দিয়েছে জালিয়াতির ধরন
আগের সময়ে জাল নোট তৈরিতে ছবি তোলা, রাসায়নিক ব্যবহার এবং অন্ধকার ঘরে নানা ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হতো। এখন ডিজিটাল প্রযুক্তির কারণে সেই কাজ অনেক সহজ হয়ে গেছে।
রদ্রিগেজ কম্পিউটারে নোটের নকশা তৈরি করে তা সরাসরি মুদ্রণ প্লেটে রূপান্তর করতে পারতেন। ফলে একই নকশা ব্যবহার করে অন্য জালিয়াতদের কাছেও প্লেট পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হতো।
তদন্তকারীদের মতে, এ ধরনের প্রযুক্তি জাল মুদ্রা তৈরির কাজকে আরও দ্রুত এবং বড় পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে।
আসল নোটের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যও নকল
মার্কিন ডলারের নোটে বিশেষ কাগজ, জলছাপ, নিরাপত্তা সুতা, অতিবেগুনি আলোতে দৃশ্যমান উপাদান, রং পরিবর্তনকারী কালি এবং সূক্ষ্ম নকশাসহ নানা নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য থাকে।
এরপরও দক্ষ জালিয়াতরা এসব বৈশিষ্ট্যের কিছু অংশ এত নিখুঁতভাবে অনুকরণ করতে পারছে যে সাধারণ মানুষের পক্ষে আসল ও নকল নোটের পার্থক্য বোঝা কঠিন হয়ে পড়ছে।
তদন্তকারীরা রদ্রিগেজের তৈরি নোট পরীক্ষা করে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য খুঁজে পান। আসল নোটের সূক্ষ্ম ছাপায় যে বিশেষ ধরনের কালি ছড়িয়ে পড়ার দাগ দেখা যায়, জাল নোটে তা ছিল না। এই বিষয়টিই তদন্তকারীদের ধারণা আরও শক্ত করে যে তিনি পুরোনো পদ্ধতির বদলে কম্পিউটারভিত্তিক নকশায় দক্ষ ছিলেন।

লাভ বেশি, ঝুঁকি তুলনামূলক কম
কলম্বিয়ায় জাল ডলার তৈরির ব্যবসা অপরাধীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে এর বিপুল লাভের কারণে। একটি হিসাব অনুযায়ী, ১০০ ডলারের একটি জাল নোট তৈরি করতে খরচ হতে পারে চার ডলারেরও কম।
জাল নোট শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে যেসব দেশে মার্কিন ডলার সরকারি মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হয়, সেসব বাজার জালিয়াতদের কাছে বেশি আকর্ষণীয়।
কখনও এসব জাল টাকা মাদক পাচার, মানব পাচার কিংবা অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অর্থ জোগাতেও ব্যবহৃত হয়।
‘নিখুঁত নোট’ তৈরিই ছিল তার দাবি
রদ্রিগেজ তদন্তকারীদের কাছে দাবি করেছিলেন, নিখুঁত ব্যাংক নোটের নকশা তৈরি করা তার কাছে এক ধরনের শিল্প। এমনকি তিনি বলেছিলেন, এই কাজ তাকে মানসিকভাবে স্বস্তি দিত।
তার দাবি ছিল, নোটগুলো চলচ্চিত্রের দৃশ্যে ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। তবে আদালত সেই ব্যাখ্যা গ্রহণ করেনি। মুদ্রা জাল করার অভিযোগে ২০২৫ সালে তাকে আট বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তিনি রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন।
অভিযান সফল, কিন্তু সমস্যা রয়ে গেছে
রদ্রিগেজকে গ্রেপ্তার ও সাজা দেওয়া কলম্বিয়ার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বড় সাফল্য হলেও তদন্তকারীদের আশঙ্কা, এর মধ্য দিয়ে জাল ডলারের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে না।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে কলম্বিয়ার বুকারামাঙ্গা এলাকায় একটি জাল মুদ্রা কারখানা থেকে প্রায় ১ কোটি ২৭ লাখ ডলার মূল্যমানের জাল টাকা জব্দ করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে এসব নোট বিক্রি করা হচ্ছিল।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানে, একটি কারখানা বন্ধ করা গেলেও অন্য কোথাও নতুন করে জাল নোট তৈরি হতে পারে। ডিজিটাল প্রযুক্তি যত সহজলভ্য হচ্ছে, এই অপরাধের বিস্তার ঠেকানো তত কঠিন হয়ে উঠছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















