বিশ্ব রাজনীতিতে মিয়ানমারের নাম উচ্চারিত হলেই সাধারণত সামনে আসে সামরিক শাসন, গৃহযুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও রাষ্ট্রীয় অস্থিরতার চিত্র। কিন্তু এই পরিচিত বয়ানের আড়ালে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা দ্রুত গুরুত্ব পাচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে অপরিহার্য ভারী বিরল মৃত্তিকা (হেভি রেয়ার আর্থ) উপাদানের অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে দেশটি। অথচ এই কৌশলগত অবস্থান থেকেও মিয়ানমার কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক বা ভূরাজনৈতিক সুবিধা আদায় করতে পারছে না।
সমস্যার মূল কারণ সম্পদের অভাব নয়, বরং সেই সম্পদকে কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর সক্ষমতার ঘাটতি। খনি থেকে উত্তোলন করা কাঁচামাল প্রায় সম্পূর্ণভাবে চীনে যায়। অপরদিকে পরিশোধন, রাসায়নিক প্রক্রিয়াজাতকরণ, উচ্চমূল্যের যন্ত্রাংশ উৎপাদন এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের সবচেয়ে লাভজনক ধাপগুলোর ওপর প্রায় একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে চীন। ফলে মিয়ানমার বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যবস্থার জন্য অপরিহার্য হলেও মূল্য সংযোজনের বড় অংশ দেশের বাইরে থেকে যাচ্ছে।
বিশ্ব যখন বৈদ্যুতিক গাড়ি, বায়ুচালিত বিদ্যুৎ, রোবোটিক্স এবং উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির প্রসার নিয়ে আলোচনা করছে, তখন সেই প্রযুক্তির ভিত্তি গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ খনিজের বড় অংশ উত্তোলিত হচ্ছে কাচিন রাজ্যের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে। কিন্তু যেসব এলাকায় এই খনিজ আহরণ চলছে, সেখানকার বাস্তবতা উন্নয়নের গল্প নয়; বরং পরিবেশগত ঝুঁকি, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সীমিত প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের এক জটিল চিত্র।
অনেকে মনে করতে পারেন, এমন গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের মালিক হওয়াই আন্তর্জাতিক দরকষাকষিতে শক্তিশালী অবস্থান নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট। বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়। কোনো দেশের প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করে শুধু সম্পদের ওপর নয়, সেই সম্পদকে কীভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে, কীভাবে বাজারে উপস্থাপন করা হচ্ছে এবং কতটা সমন্বিত নীতির মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে—তার ওপর।
মিয়ানমারের ক্ষেত্রে এই জায়গাগুলোই সবচেয়ে দুর্বল। দীর্ঘদিনের সংঘাত, পরিবর্তিত ক্ষমতার ভারসাম্য এবং খণ্ডিত প্রশাসনিক কাঠামোর কারণে খনিজসম্পদ ব্যবস্থাপনা একটি সুসংগঠিত নীতির বদলে অনেকাংশেই স্থানীয় রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন শক্তির নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তনের মধ্যেও খনি কার্যক্রম অব্যাহত থাকলেও তা একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হচ্ছে না। ফলে রাজস্ব সংগ্রহ, নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা—সব ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে।
এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে স্থানীয় জনগণ। রাসায়নিক লিচিং পদ্ধতিতে খনিজ উত্তোলনের কারণে বন উজাড়, পানিদূষণ, মাটির ক্ষয়, ভূমিধস এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। কর্মীরা ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করলেও তাদের আয় এই ঝুঁকির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অনেক সম্প্রদায় পরিবেশগত ক্ষতির বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়েছে, কিন্তু বিকল্প জীবিকার অভাব এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের বাস্তবতায় তারা অনেক ক্ষেত্রেই আপস করতে বাধ্য হয়েছে। অর্থাৎ সম্পদ তাদের ভূমি থেকে বের হলেও প্রকৃত লাভের তুলনায় ক্ষতির বোঝা বহন করছে তারাই।
২০২১ সালের পর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। পশ্চিমা বিশ্বের অনেক অংশীদার সরে দাঁড়ানোয় মিয়ানমারের বিকল্প বাণিজ্যিক সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। এর ফলে চীনের ওপর নির্ভরতা আরও বেড়েছে। নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য ছিল সামরিক কাঠামোর ওপর চাপ সৃষ্টি করা, কিন্তু বাস্তবে বিরল মৃত্তিকার সীমান্তবাণিজ্য এবং সরবরাহ ব্যবস্থা বড় ধরনের পরিবর্তন ছাড়াই চলতে থেকেছে। এতে প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরির সুযোগ আরও কমেছে।

এই অবস্থার পরিবর্তনের জন্য বিপ্লবাত্মক কোনো সমাধান প্রয়োজন নেই; বরং প্রয়োজন ধাপে ধাপে বাস্তবসম্মত সংস্কার। প্রথমত, রাজস্ব সংগ্রহ ও বণ্টনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে স্থানীয় মানুষ বুঝতে পারেন তাদের সম্পদ থেকে কী আয় হচ্ছে এবং সেই অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, সীমিত পরিসরে হলেও দেশীয় প্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। কাঁচামাল রপ্তানির বদলে মূল্য সংযোজনের একটি অংশ দেশে ধরে রাখতে পারলেই অর্থনৈতিক লাভ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
একই সঙ্গে বাণিজ্যিক অংশীদার বৈচিত্র্যও গুরুত্বপূর্ণ। একক ক্রেতার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা যেকোনো দেশের দরকষাকষির ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। প্রতিবেশী ভারতের আগ্রহ ভবিষ্যতে কিছু বিকল্প তৈরি করতে পারে, যদিও সেটি বাস্তব সম্ভাবনায় রূপ দিতে সুপরিকল্পিত কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন হবে।
স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। খনিজ আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং পরিবেশ পুনর্বাসনে ব্যয় করার ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। পাশাপাশি শ্রমিকদের নিরাপত্তা, মজুরি এবং কর্মপরিবেশ উন্নয়নের জন্য কার্যকর মানদণ্ড প্রণয়ন অপরিহার্য। খনি পরিচালনার অনুমতি, উৎপাদনের সীমা এবং পরিবেশগত জবাবদিহিও আরও শক্তিশালী করতে হবে।
সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, কৌশলগত সম্পদ থাকা আর সেই সম্পদকে কৌশলগত শক্তিতে রূপান্তর করা এক বিষয় নয়। আধুনিক বিশ্বে প্রকৃত সুবিধা পায় সেই দেশ, যে শুধু খনিজ উত্তোলন করে না, বরং পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলে নিজের অবস্থান সুসংহত করে, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গড়ে তোলে এবং জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে সম্পদ ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করে।
মিয়ানমারের বর্তমান বাস্তবতা এই বৈপরীত্যকেই স্পষ্ট করে। বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি রূপান্তরের জন্য দেশটির বিরল মৃত্তিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেই গুরুত্ব এখনো জাতীয় শক্তিতে রূপ নেয়নি। সম্পদ উত্তোলনের নিয়ন্ত্রণ আংশিকভাবে স্থানীয় বাস্তবতায় থাকলেও প্রযুক্তি, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বাজার এবং মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা অন্যের হাতে। ফলে কাঁচামালের উৎস হয়েও মিয়ানমার বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে নিম্নমূল্যের অবস্থানেই আটকে আছে।
আজকের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার যুগে সম্পদের মালিকানাই শেষ কথা নয়। দীর্ঘমেয়াদে সুবিধা তাদের হাতেই যায়, যারা সম্পদকে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করে, ন্যায্যভাবে বণ্টন করে এবং সুসংগঠিত নীতির মাধ্যমে ভবিষ্যতের কৌশলগত সম্পদে পরিণত করতে পারে। মিয়ানমারের জন্য সেই চ্যালেঞ্জ এখন আর শুধু অর্থনীতির নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনা, স্থানীয় অংশগ্রহণ এবং টেকসই উন্নয়নেরও পরীক্ষা।
ডেভিড এম. জে. 



















