নিকারাগুয়ার দীর্ঘদিনের শাসক ড্যানিয়েল ওর্তেগা দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন আর হবে না—এমন ঘোষণা দিয়ে তিনি দেশটির গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছেন।
৮০ বছর বয়সী ওর্তেগা গত ১৯ জুলাই ঘোষণা দেন, বিরোধী দলগুলো আর কখনো নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার সুযোগ পাবে না। তার এমন বক্তব্যকে নিকারাগুয়ায় আনুষ্ঠানিক একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার দিকে বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নির্বাচনের নামে নিয়ন্ত্রণ
নিকারাগুয়ার নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। সর্বশেষ ২০২১ সালের নির্বাচনের আগে ওর্তেগার সাতজন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। ফলে ওই নির্বাচন কতটা অবাধ ও গ্রহণযোগ্য ছিল, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়।
ওর্তেগা এর আগে ১৯৭৯ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। দীর্ঘ বিরতির পর ২০০৬ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে আবার প্রেসিডেন্ট হন। এরপর ধীরে ধীরে তিনি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করেছেন।
পরিবারকেন্দ্রিক ক্ষমতার বিস্তার
ওর্তেগার শাসনে পারিবারিক ক্ষমতার বিস্তারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তার স্ত্রী রোসারিও মুরিয়োকে সহ-প্রেসিডেন্টের নতুন পদে বসানো হয়েছে। এতে ওর্তেগার পর ক্ষমতা তার স্ত্রীর হাতে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এমনকি তাদের পাঁচ ছেলের কারও হাতে ভবিষ্যতে ক্ষমতা যাওয়ার সম্ভাবনাও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের আলোচনায় রয়েছে। ফলে নিকারাগুয়ায় গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও পরিবারকেন্দ্রিক শাসন আরও শক্তিশালী হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের চাপের সম্ভাবনা
ওর্তেগার সাম্প্রতিক বক্তব্যের পর নিকারাগুয়ার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ২১ জুলাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি মুরিয়ো-ওর্তেগা সরকারের ওপর চাপ তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন।
গণতন্ত্রের মৌলিক নীতিগুলো বাধাগ্রস্ত করে কোনো দেশের পক্ষে অন্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখা উচিত নয়—এমন বার্তাই দেওয়া হয়েছে। ফলে নিকারাগুয়ার ওপর কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে ওর্তেগার সামনে বড় সুযোগও আছে
নিকারাগুয়ার শাসক শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক চাপ এড়িয়ে যেতে পারেন—এমন আশঙ্কাও রয়েছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সব সময় কর্তৃত্ববাদী নেতাদের সঙ্গে সংঘাতে যেতে আগ্রহী নন; রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ অনুযায়ী তাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার নজিরও রয়েছে।
মধ্য আমেরিকার আরেক দেশ এল সালভাদরের প্রেসিডেন্ট নায়িব বুকেলের ক্ষেত্রেও একই ধরনের রাজনৈতিক প্রবণতা দেখা গেছে। দেশটির আইনসভা গত বছর প্রেসিডেন্টের মেয়াদসংক্রান্ত সীমা তুলে দেয়। চলতি বছরের জুলাইয়ে বুকেলের দল ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের জন্য তাকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থী হিসেবে নিশ্চিত করেছে।
গণতন্ত্রের জন্য নতুন সতর্কবার্তা
নিকারাগুয়া যদি সত্যিই প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন পুরোপুরি বাদ দিয়ে একদলীয় ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যায়, তাহলে লাতিন আমেরিকার গণতন্ত্রের জন্য এটি হবে গুরুত্বপূর্ণ ও উদ্বেগজনক ঘটনা।
নির্বাচনের সুযোগ সীমিত হওয়া শুধু একটি দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়; এর প্রভাব পড়ে জনগণের অধিকার, বিরোধী মত, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপরও। নিকারাগুয়ার আগামী দিনের রাজনীতি তাই এখন শুধু দেশটির জনগণের নয়, পুরো অঞ্চলের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নিকারাগুয়ায় ড্যানিয়েল ওর্তেগার নির্বাচন বাতিলের ঘোষণা দেশটিকে একদলীয় শাসনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যা গণতন্ত্র ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন সংকেত।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















