আফ্রিকায় আবারও শুরু হয়েছে শত কোটি ও হাজার কোটি ডলারের অবকাঠামো প্রকল্পের তোড়জোড়। বন্দর, রেলপথ, মহাসড়ক, বিদ্যুৎকেন্দ্র, তেল শোধনাগার ও জ্বালানি পরিবহন ব্যবস্থা ঘিরে বড় পরিকল্পনা হাতে নিচ্ছে বিভিন্ন দেশ। লক্ষ্য একটাই—অর্থনীতির গতি বাড়ানো, বাণিজ্য সহজ করা এবং বাইরের সংকটের ওপর নির্ভরতা কমানো। তবে বিপুল অর্থের সংস্থান, ঋণের চাপ, পরিবেশগত ঝুঁকি ও প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে।
লামু বন্দর ঘিরে নতুন আশার আলো
কেনিয়ার উত্তর উপকূলের লামু দীর্ঘদিন ধরে আফ্রিকার একটি উচ্চাভিলাষী কিন্তু অপূর্ণ অবকাঠামো পরিকল্পনার প্রতীক হয়ে ছিল। লামু বন্দরকে দক্ষিণ সুদান ও ইথিওপিয়ার বাজার এবং তেলক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত করতে বন্দর, পাইপলাইন, রেলপথ ও মহাসড়ক নির্মাণের যে বিশাল পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, তার সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার।
২০১২ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পকে আফ্রিকার অন্যতম বড় অবকাঠামো উদ্যোগ হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু বহু বছর পরও বন্দর ছাড়া পরিকল্পনার বড় অংশ বাস্তবায়িত হয়নি। এখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় অঞ্চলের দিকে যাওয়া অনেক জাহাজ লামুর দিকে ঘুরে আসায় বন্দরটি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। একই সঙ্গে ওই অঞ্চলের অবকাঠামো পরিকল্পনাও আবার আলোচনায় এসেছে।
একের পর এক বড় প্রকল্প
আফ্রিকার বড় প্রকল্পের নতুন ঢেউয়ের পেছনে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ কাজ করছে। ইথিওপিয়া ২০২৫ সালে আফ্রিকার সবচেয়ে বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প গ্র্যান্ড ইথিওপিয়ান রেনেসাঁ বাঁধের নির্মাণ শেষ করেছে। নাইজেরিয়ায় শিল্পপতি আলিকো দাঙ্গোতে লাগোসের কাছে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে একটি বিশাল তেল শোধনাগার চালু করেছেন।
এদিকে অ্যাঙ্গোলার আটলান্টিক উপকূলকে কঙ্গোর তামা অঞ্চল এবং ভবিষ্যতে জাম্বিয়ার সঙ্গে যুক্ত করার লক্ষ্যে বহুবিলিয়ন ডলারের লোবিতো করিডরও এগিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই উদ্যোগে সমর্থন দিচ্ছে।
ইথিওপিয়ায় অন্তত ১২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নতুন বিমানবন্দর নির্মাণের কাজও শুরু হয়েছে। নাইজেরিয়া পশ্চিম আফ্রিকার একটি বড় পরিবহন করিডর নিয়ে পুরোনো পরিকল্পনাকে আবার সক্রিয় করছে। পশ্চিম আফ্রিকার নেতারা নাইজেরিয়া থেকে মরক্কো পর্যন্ত প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনাও এগিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
অবকাঠামোতেই প্রবৃদ্ধির বড় সম্ভাবনা
আফ্রিকার অর্থনীতি দ্বিগুণ করতে অবকাঠামো খাতে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন। আগামী বছরগুলোতে মহাদেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে প্রতিবছর প্রায় ১৫৫ বিলিয়ন ডলার অবকাঠামো খাতে ব্যয় করা প্রয়োজন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রেলপথ নির্মাণেও গতি বেড়েছে। আফ্রিকাজুড়ে প্রায় ৭ হাজার কিলোমিটার রেলপথ বর্তমানে নির্মাণ বা উন্নয়ন পর্যায়ে রয়েছে। কয়েক বছর আগের তুলনায় এটি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
তবে প্রয়োজনের তুলনায় অর্থের জোগান এখনো বড় সমস্যা। সরকারি ঋণের বোঝা বাড়ছে, বৈদেশিক সহায়তা কমছে এবং বৈশ্বিক সুদের হারও চাপ তৈরি করছে। ২০২৫ সালে আফ্রিকার দেশগুলোকে ঋণের সুদ ও কিস্তি পরিশোধে প্রায় ৮৯ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হয়েছে বলে হিসাব করা হয়েছে।
বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর বাড়ছে নির্ভরতা
সরকারি অর্থের সীমাবদ্ধতার কারণে অবকাঠামো উন্নয়নে এখন বেসরকারি বিনিয়োগকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে আফ্রিকার বিভিন্ন খাতে প্রতিবছর সংগৃহীত বেসরকারি অর্থের পরিমাণ ১৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে উঠেছে।
২০২৫ সালে আফ্রিকায় বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার। দীর্ঘ সময়ের তুলনায় এটি ছিল অন্যতম উচ্চমাত্রার বিনিয়োগ।
দাঙ্গোতে শোধনাগারের মতো বড় প্রকল্পের সাফল্যও নতুন বিনিয়োগকারীদের উৎসাহ দিচ্ছে। পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা আফ্রিকার দেশগুলোকে নিজেদের জ্বালানি অবকাঠামো শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে।

চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিযোগিতার প্রভাব
আফ্রিকার বড় অবকাঠামো প্রকল্পে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতাও নতুন গতি তৈরি করছে। লোবিতো করিডরে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অর্থায়ন সংস্থা ৫৫০ মিলিয়ন ডলার সহায়তা দিচ্ছে। এর অন্যতম লক্ষ্য হলো গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের সরবরাহে চীনের ওপর নির্ভরতা কমানো।
ইথিওপিয়ার নতুন বিমানবন্দর প্রকল্পেও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ রয়েছে। আফ্রিকার অবকাঠামো খাতে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘদিনের প্রভাবের মধ্যে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র।
আন্তর্জাতিক ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মনোভাবেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। বড় প্রকল্পে ঝুঁকি নেওয়ার আগ্রহ আগের তুলনায় বেড়েছে। ফলে আফ্রিকার দেশগুলো নতুন করে বড় অবকাঠামো পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ পাচ্ছে।
বড় প্রকল্পে বড় ঝুঁকিও আছে
তবে মেগাপ্রকল্প মানেই সাফল্য—এমন নিশ্চয়তা নেই। জমি ব্যবহার, পরিবেশ ও স্থানীয় মানুষের অধিকার নিয়ে অনেক প্রকল্পেই বিরোধ তৈরি হচ্ছে। উগান্ডার কৃষকেরা তানজানিয়ার উপকূল পর্যন্ত একটি ৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের তেল পাইপলাইন নির্মাণের বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। তাদের অভিযোগ, প্রকল্পটি পানি ও পরিবেশব্যবস্থার ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে বড় অবকাঠামো প্রকল্প নির্ধারিত সময় ও ব্যয়ের মধ্যে শেষ করাও কঠিন। অনেক প্রকল্পের ব্যয় অনুমানের চেয়ে বেড়ে যায় এবং নির্মাণ শেষ হতে দীর্ঘ সময় লাগে।
আফ্রিকার ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও জটিল হতে পারে। কারণ একটি বন্দর বা রেললাইন একা কার্যকর হয় না। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ, সড়ক, সীমান্ত ব্যবস্থা, সরবরাহ নেটওয়ার্কসহ পুরো করিডরকে সমন্বিতভাবে গড়ে তুলতে হয়। একটি অংশ দুর্বল থাকলে পুরো প্রকল্পের কার্যকারিতাই ব্যাহত হতে পারে।
শুধু উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়, দরকার সক্ষমতা
তবু বড় প্রকল্পের সবকিছুকে ব্যর্থতার চোখে দেখার কারণ নেই। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে স্থানীয় দক্ষতা, নির্মাণ সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা তৈরি হতে পারে।
আফ্রিকার জন্য এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, বড় পরিকল্পনাগুলো কতটা বাস্তবসম্মতভাবে বাস্তবায়ন করা যায়। অর্থায়ন নিশ্চিত করা, দুর্নীতি ও অপচয় ঠেকানো, পরিবেশ রক্ষা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর সব অংশকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে পারলেই এই মেগাপ্রকল্পগুলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির শক্তিশালী ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
শুধু বড় স্বপ্ন দেখলেই হবে না; সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের মতো অর্থ, দক্ষতা, পরিকল্পনা ও দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতাই শেষ পর্যন্ত আফ্রিকার নতুন অবকাঠামো যুগের সাফল্য নির্ধারণ করবে।
আফ্রিকায় নতুন মেগাপ্রকল্পের জোয়ার অর্থনীতিকে দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করছে, তবে ঋণ, অর্থায়ন, পরিবেশ ও বাস্তবায়ন ঝুঁকি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















