যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্রাজিলবিরোধী শুল্কনীতি উল্টো দেশটির সবচেয়ে জনপ্রিয় ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা ‘পিক্স’-এর প্রতি মানুষের ভালোবাসা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে সুবিধা পাচ্ছেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা।
১৫ জুলাই ট্রাম্প প্রশাসন ব্রাজিলের বিভিন্ন পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগের তালিকায় ব্রাজিলের বাণিজ্যনীতি ছাড়াও দেশটির ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা পিক্সের বিষয়টি উঠে আসে। তবে ব্রাজিলে এই আক্রমণকে অনেকেই নিজেদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ওপর চাপ হিসেবে দেখছেন।
পিক্স কেন এত জনপ্রিয়
ব্রাজিলের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০২০ সালে পিক্স চালু করে। এর মাধ্যমে খুব দ্রুত ও বিনা খরচে অর্থ লেনদেন করা যায়। অল্প সময়ের মধ্যেই এটি ব্রাজিলের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।
বর্তমানে দেশটির প্রায় ১৭ কোটি মানুষ পিক্স ব্যবহার করেন, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশ। দেশটির মোট অর্থপ্রদানের অর্ধেকেরও বেশি এখন এই ব্যবস্থার মাধ্যমে হচ্ছে।
পিক্স চালুর পর ব্রাজিলের বিপুলসংখ্যক মানুষ আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় এসেছে। একই সময়ে নগদ টাকা ও চেকের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে ঠেকানোর অভিযোগ কতটা যুক্তিসংগত
ট্রাম্প প্রশাসনের অভিযোগ, পিক্সের মাধ্যমে ব্রাজিল বিদেশি অর্থপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠানকে অসুবিধায় ফেলছে। কিন্তু পিক্সের নিয়মে দেশি ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আলাদা কোনো বৈষম্য নেই।
ব্রাজিলে অনুমোদিত এবং সেখানে কার্যক্রম পরিচালনাকারী যেকোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান একই শর্তে পিক্সের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। বড় ব্যাংকগুলোর জন্য গ্রাহকদের পিক্স সুবিধা দেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও আন্তর্জাতিক অর্থপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে এমন বাধ্যবাধকতা নেই।
ফলে পিক্সকে বিদেশি প্রতিষ্ঠানবিরোধী সুরক্ষাবাদী ব্যবস্থা হিসেবে দেখার যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
কম খরচের লেনদেনে চাপের মুখে কার্ড ব্যবসা
পিক্সের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে লেনদেনের খরচে। ব্রাজিলে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে ব্যবসায়িক লেনদেনে সাধারণত অর্থপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ২ শতাংশ পর্যন্ত ফি দিতে হয়। বিপরীতে পিক্সের মাধ্যমে অর্থ পাঠানোর খরচ প্রায় নেই বললেই চলে।
এর ফলে বড় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে স্থানীয় অর্থপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠান—সবাইকে নিজেদের নেওয়া ফি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। পিক্স অন্য ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা ধ্বংস করেনি; বরং নগদ টাকা ও চেকের ব্যবহার কমিয়ে পুরো অর্থপ্রদানের বাজারকে আরও বড় করেছে।
পিক্স চালুর পর প্রতি প্রান্তিকে নগদ টাকা তোলার সংখ্যা প্রায় ৪৬ শতাংশ কমেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, এই ব্যবস্থা চালুর পর অন্তত ৭ কোটি মানুষ আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশ করেছেন।

ট্রাম্পের চাপেই রাজনৈতিক সুবিধা লুলার
ব্রাজিলের রাজনীতিতে পিক্স এখন শুধু অর্থ লেনদেনের ব্যবস্থা নয়, জাতীয় গর্বেরও বিষয় হয়ে উঠেছে। আর এখানেই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সুবিধা পাচ্ছেন লুলা।
অক্টোবরে ব্রাজিলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা। এর আগে ডানপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোর সঙ্গে একটি বড় জালিয়াতি কেলেঙ্কারির যোগসূত্র নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এর মধ্যেই পিক্সকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ লুলার জন্য নতুন রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছে।
লুলা নিজেকে পিক্স এবং ব্রাজিলের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের রক্ষক হিসেবে তুলে ধরতে পারছেন। রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত ব্রাজিলে যে কয়েকটি বিষয়ে সাধারণ মানুষের ব্যাপক সমর্থন রয়েছে, পিক্স তার অন্যতম।
ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এখন বলসোনারোর জন্য অস্বস্তির
পিক্স নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থানের কারণে সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর পরিবারও রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে। কারণ বলসোনারো পরিবারের সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে।
২ জুলাই বলসোনারো পিক্সকে চীন ও রাশিয়ার মতো দেশগুলোর অর্থপ্রদান ব্যবস্থার সঙ্গে সংযোগ না দেওয়ার প্রস্তাব দেন। লুলা দ্রুত এর সমালোচনা করে অভিযোগ করেন, এতে ব্রাজিলের স্বার্থের চেয়ে বিদেশি স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প ও বলসোনারোকে নিয়ে নানা ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ ছড়িয়ে পড়ে। ফলে পিক্সকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে।
ব্রাজিলের সাফল্য কি অন্য দেশ অনুসরণ করতে পারবে
পিক্সের সাফল্য দেখে লাতিন আমেরিকার অন্য দেশগুলো একই ধরনের ব্যবস্থা চালু করতে চাইতে পারে। তবে ব্রাজিলের অভিজ্ঞতা হুবহু অন্য দেশে প্রয়োগ করা সহজ নয়।
পিক্সের পেছনে ছিল শক্তিশালী ও মানুষের আস্থাভাজন কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বড় ব্যাংকগুলোকে ব্যবস্থাটিতে যুক্ত করার সক্ষমতা এবং এমন একটি বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার, যেখানে বহু মানুষ তখনও নগদ অর্থের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন।
এই ব্যবস্থা তৈরি ও পরীক্ষাতেও কয়েক বছর সময় লেগেছে। ফলে একই ধরনের পরিস্থিতি লাতিন আমেরিকার অন্য দেশগুলোতে পাওয়া কঠিন।
ট্রাম্পের শুল্ক ও চাপের উদ্দেশ্য যদি পিক্সের প্রভাব কমানো হয়ে থাকে, এখন পর্যন্ত ফলাফল বরং উল্টো। ব্রাজিলীয়দের কাছে পিক্স আরও বেশি জাতীয় গর্বের প্রতীক হয়ে উঠছে। আর সেই আবেগকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিকভাবে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করছেন লুলা।
ব্রাজিলের ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা পিক্সকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ শেষ পর্যন্ত দেশটির অর্থনীতি ও রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
ট্রাম্পের শুল্ক হামলা ব্রাজিলের জনপ্রিয় পিক্স লেনদেন ব্যবস্থার প্রতি মানুষের সমর্থন আরও বাড়িয়েছে এবং প্রেসিডেন্ট লুলাকে রাজনৈতিক সুবিধা দিয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















