০৯:১৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রে কমছে সহিংস অপরাধ, স্বস্তি ফিরছে শহরগুলোতে সাবেক রাষ্ট্রপতি হামিদ ও সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্রে সুপারমার্কেটের সামনে গাড়িচাপায় ৮২ বছরের নারী নিহত, বিচারের দাবিতে পরিবার ডেঙ্গুতে আরও ৩ মৃত্যু, দেশে প্রাণহানি বেড়ে ৪৩ সিলেটে গাছ থেকে তরুণের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার, মৃত্যুর কারণ নিয়ে তদন্ত মুম্বাইয়ের গল্পে গুলজারের ৭৬ বছর: যে শহর এক কিশোর অভিবাসীকে কবি বানিয়েছে পাঁচ বইয়ে পাঁচ ভুবনের যাত্রা, ইতিহাস থেকে ভবিষ্যৎ—পাঠকের জন্য নতুন পাঁচ ঠিকানা সৌদি আরবকে পরমাণু জ্বালানি সমৃদ্ধকরণে ছাড়, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রশ্ন—‘আমাদের নয় কেন?’ ছোট ফ্ল্যাটে বড় স্বপ্ন, অবসরে ঘর সাজাতে লাখ লাখ টাকা খরচ চোখের সামনে যা দেখছেন, সব সত্য নয়: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বাড়ছে ভয়ংকর প্রতারণা

লেবনন পুনর্গঠনে বড় বাধা ভাঙা রাজনৈতিক ব্যবস্থা, সংকটে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব

লেবননকে আবার মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্য, পর্যটন ও ব্যাংকিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে শুধু অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ করলেই হবে না, বদলাতে হবে দেশটির দীর্ঘদিনের ভঙ্গুর রাজনৈতিক ব্যবস্থা। যুদ্ধ, অর্থনৈতিক ধস, ব্যাংকিং সংকট এবং রাজনৈতিক অচলাবস্থার পাশাপাশি সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব দেশটির ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

লেবননের অর্থমন্ত্রী আমের বিসাত মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে। সিরিয়ায় পুনর্গঠন শুরু হলে লেবননের বন্দর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। উপসাগরীয় দেশগুলোও জ্বালানি পাইপলাইন ও যোগাযোগ অবকাঠামো গড়তে লেবননকে ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু সেই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে দেশটির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দুর্বলতা কাটানো জরুরি।

বৈরুত বন্দরের ধ্বংসাবশেষ যেন লেবননের প্রতিচ্ছবি

২০২০ সালের ভয়াবহ বিস্ফোরণে বৈরুত বন্দর ধ্বংস হয়ে যায়। বিস্ফোরণে দুই শতাধিক মানুষ নিহত হন। দীর্ঘ সময় ধরে এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত আটকে থাকায় রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বন্দরের ক্ষতিগ্রস্ত শস্যভান্ডারের একটি অংশ এখনো ধ্বংসের স্মৃতি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নিহতদের স্বজনেরা সেটিকে স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন। বিনিয়োগকারীদের কাছে এটি লেবননের দীর্ঘ অচলাবস্থা ও দুর্বল রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি প্রতীক হয়ে উঠেছে।

২০১৯ সালের সরকারবিরোধী বিক্ষোভের পর দেশটি একের পর এক সংকটে পড়েছে। অর্থনৈতিক ধস, বন্দর বিস্ফোরণ এবং ইসরায়েলের সঙ্গে দীর্ঘ সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করেছে।

নতুন নেতৃত্ব, পুরোনো সমস্যার ভার

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দীর্ঘ রাজনৈতিক শূন্যতার পর জোসেফ আওন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। কয়েক দিনের মধ্যে নওয়াফ সালাম প্রধানমন্ত্রী হন। দুজনই প্রচলিত রাজনৈতিক গোষ্ঠীর বাইরে থেকে উঠে আসা নেতা।

ক্ষমতায় এসে তারা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা, সংস্কার এবং হিজবুল্লাহর সামরিক সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি দেন। সরকার হিজবুল্লাহর সামরিক শাখাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সহায়তা পাওয়ার পথ তৈরি করতে কিছু আইনও পাস করেছে। তবে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জায়গায় এখনো বড় ঘাটতি রয়েছে।

লেবননের সামনে মূল সংকটটি অনেকটা জটিল গিঁটের মতো। হিজবুল্লাহর অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ করতে আন্তর্জাতিক সহায়তা দরকার। আবার আন্তর্জাতিক দাতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা পেতে হলে আগে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করা সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ

দীর্ঘদিন ধরে হিজবুল্লাহ লেবননের ভেতরে অনেকটা আলাদা রাষ্ট্রের মতো কার্যক্রম চালিয়েছে। তাদের নিজস্ব বিদ্যালয়, হাসপাতাল, যুব কার্যক্রম এবং আর্থিক ব্যবস্থাও রয়েছে। ফলে বিশেষ করে শিয়া জনগোষ্ঠীর একটি অংশের মধ্যে সংগঠনটির শক্তিশালী সামাজিক ভিত্তি তৈরি হয়েছে।

তবে সাম্প্রতিক যুদ্ধ সেই ভিত্তিতেও চাপ তৈরি করেছে। অনেক মানুষ দীর্ঘ সংঘাতে ক্লান্ত। ইরানের প্রভাব নিয়েও লেবননের ভেতরে উদ্বেগ বাড়ছে।

সরকার ধীরে ধীরে হিজবুল্লাহর অস্ত্র সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। সামরিক শাখাকে বেআইনি ঘোষণা করা হয়েছে এবং অস্ত্র পরিবহনের অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত কঠিন। কারণ লেবননের সেনাবাহিনী এখনো সামরিক সক্ষমতায় হিজবুল্লাহর তুলনায় দুর্বল।

ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারও বড় প্রশ্ন

লেবননের রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার আরেকটি শর্ত হলো দক্ষিণাঞ্চল থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার। দুই দেশের মধ্যে এ বিষয়ে একটি সমঝোতা হয়েছে এবং দক্ষিণ লেবননের নির্দিষ্ট এলাকায় সেনা মোতায়েনের মাধ্যমে প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছে।

তবে সীমান্ত এলাকায় ইসরায়েলের সামরিক উপস্থিতি এবং নিয়মিত বিমান হামলা পরিস্থিতিকে জটিল করে রেখেছে। লেবননের কর্মকর্তাদের মতে, রাষ্ট্র যদি নিজের ভূখণ্ডে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে না পারে, তাহলে জনগণ ও বিনিয়োগকারীদের কাছে সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করা কঠিন হবে।

যুদ্ধের ক্ষতি অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করেছে

সাম্প্রতিক সংঘাতে লেবননের সরাসরি ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার বলে সরকারের হিসাব। এর আগে সংঘাতের ক্ষতি ছিল প্রায় ৮৫০ কোটি ডলার। সব মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ দেশটির মোট অর্থনীতির প্রায় ৪০ শতাংশের সমান।

চলতি বছর অর্থনৈতিক উৎপাদন ৭ থেকে ৮ শতাংশ কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর ফলে দেশটি আবার মন্দার দিকে যেতে পারে।

দক্ষিণ লেবননের বহু গ্রাম ধ্বংস হয়েছে। বহু মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়েছেন। যুদ্ধের মানবিক ক্ষতির পাশাপাশি পুনর্গঠনের বিশাল ব্যয় এখন সরকারের সামনে নতুন চাপ তৈরি করেছে।

ব্যাংকিং ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার ক্ষত এখনো শুকায়নি

লেবননের বর্তমান সংকটের শুরু শুধু যুদ্ধ থেকে নয়। ২০১৯ সালে দেশটির দীর্ঘদিনের আর্থিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। বিশাল সরকারি ঘাটতি সামাল দিতে দীর্ঘ সময় ধরে যে আর্থিক কাঠামো চালু রাখা হয়েছিল, ব্যাংকে নতুন আমানত কমে যাওয়ার পর সেটি আর টেকেনি।

এরপর বৈদেশিক মুদ্রা উত্তোলনে কঠোরতা, মূল্যস্ফীতি এবং মুদ্রার দ্রুত অবমূল্যায়ন শুরু হয়। দেশের অর্থনীতি সংকটের আগের আকারের প্রায় অর্ধেকে নেমে গেছে। বহু আমানতকারী এখনো নিজেদের অর্থ পুরোপুরি তুলতে পারছেন না।

মূল্যস্ফীতি একসময় ২২১ শতাংশে উঠেছিল। পরে তা কমে এলেও এখনো তা অনেক বেশি। দেশটির মুদ্রার মূল্যও আগের নির্ধারিত হারের তুলনায় প্রায় ৯৮ শতাংশ কমে গেছে।

সংস্কার ছাড়া আন্তর্জাতিক সহায়তাও অনিশ্চিত

লেবনন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সঙ্গে প্রায় ৩০০ কোটি মার্কিন ডলারের সহায়তা নিয়ে সমঝোতা করেছিল। কিন্তু প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন না হওয়ায় চূড়ান্ত অনুমোদন হয়নি।

ব্যাংকিং খাত সংস্কারে সরকার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। ব্যাংকের গোপনীয়তা আইন শিথিল করা হয়েছে এবং অকার্যকর ব্যাংক পুনর্গঠন বা বন্ধ করার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু ব্যাংক, আমানতকারী ও রাষ্ট্রের মধ্যে প্রায় ৮০০০ কোটি মার্কিন ডলারের ক্ষতি কীভাবে ভাগ হবে, সেই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।

বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থাতেও গভীর সংকট

অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য শুধু ব্যাংকিং সংস্কার যথেষ্ট নয়। দেশটির বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ অবকাঠামোও বড় সমস্যায় রয়েছে।

রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থা দিনে মাত্র কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে। ফলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে।

দুর্বল ইন্টারনেট ব্যবস্থা ব্যবসা ও প্রযুক্তি খাতের জন্য আরেকটি বাধা। অথচ লেবননের বিশ্ববিদ্যালয়, দক্ষ জনশক্তি ও উদ্যোক্তা সংস্কৃতির কারণে প্রযুক্তি খাতে সম্ভাবনা রয়েছে। নতুন উদ্যোগগুলো রোবোটিকস ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক তথ্যকেন্দ্রের জন্য হার্ডওয়্যার তৈরির মতো কাজেও এগোচ্ছে।

রাষ্ট্রের ভেতরের পুরোনো ক্ষমতার কাঠামোই মূল বাধা

লেবননের সবচেয়ে বড় সমস্যা সম্ভবত এখানেই। সরকার সংস্কারের কথা বললেও রাষ্ট্রের ভেতরের পুরোনো ক্ষমতাধর গোষ্ঠীগুলো এখনো শক্তিশালী।

হিজবুল্লাহর হাতে অস্ত্র রয়েছে, ব্যাংকিং সংস্কারে প্রভাবশালী স্বার্থগোষ্ঠীর বাধা রয়েছে এবং সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক নেতারা দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও সুযোগ নিজেদের প্রভাববলয়ের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছেন।

ফলে শুধু নতুন সরকার গঠন করলেই পুরোনো ব্যবস্থা বদলে যাচ্ছে না। বরং সেই ব্যবস্থা নিজেদের টিকিয়ে রাখার মতো শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।

লেবননের জন্য সার্বভৌমত্বের অর্থ তাই শুধু আকাশে বিদেশি ড্রোনের উপস্থিতি বন্ধ করা বা কোনো বিদেশি কূটনীতিককে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা নয়। এর অর্থ হলো দুর্বল রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ব্যবহার করে সুবিধা নেওয়া পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামো থেকে রাষ্ট্রকে মুক্ত করা।

বৈরুত বন্দরের ধ্বংসপ্রাপ্ত শস্যভান্ডার তাই শুধু একটি বিস্ফোরণের স্মৃতি নয়। সেটি যেন আজকের লেবননের প্রতিচ্ছবি—পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি, আবার পুনর্গঠিতও হয়নি; মাঝপথে থমকে থাকা একটি রাষ্ট্র।

জনপ্রিয় সংবাদ

যুক্তরাষ্ট্রে কমছে সহিংস অপরাধ, স্বস্তি ফিরছে শহরগুলোতে

লেবনন পুনর্গঠনে বড় বাধা ভাঙা রাজনৈতিক ব্যবস্থা, সংকটে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব

০৭:৪১:১৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬

লেবননকে আবার মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্য, পর্যটন ও ব্যাংকিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে শুধু অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ করলেই হবে না, বদলাতে হবে দেশটির দীর্ঘদিনের ভঙ্গুর রাজনৈতিক ব্যবস্থা। যুদ্ধ, অর্থনৈতিক ধস, ব্যাংকিং সংকট এবং রাজনৈতিক অচলাবস্থার পাশাপাশি সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব দেশটির ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

লেবননের অর্থমন্ত্রী আমের বিসাত মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে। সিরিয়ায় পুনর্গঠন শুরু হলে লেবননের বন্দর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। উপসাগরীয় দেশগুলোও জ্বালানি পাইপলাইন ও যোগাযোগ অবকাঠামো গড়তে লেবননকে ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু সেই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে দেশটির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দুর্বলতা কাটানো জরুরি।

বৈরুত বন্দরের ধ্বংসাবশেষ যেন লেবননের প্রতিচ্ছবি

২০২০ সালের ভয়াবহ বিস্ফোরণে বৈরুত বন্দর ধ্বংস হয়ে যায়। বিস্ফোরণে দুই শতাধিক মানুষ নিহত হন। দীর্ঘ সময় ধরে এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত আটকে থাকায় রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বন্দরের ক্ষতিগ্রস্ত শস্যভান্ডারের একটি অংশ এখনো ধ্বংসের স্মৃতি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নিহতদের স্বজনেরা সেটিকে স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন। বিনিয়োগকারীদের কাছে এটি লেবননের দীর্ঘ অচলাবস্থা ও দুর্বল রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি প্রতীক হয়ে উঠেছে।

২০১৯ সালের সরকারবিরোধী বিক্ষোভের পর দেশটি একের পর এক সংকটে পড়েছে। অর্থনৈতিক ধস, বন্দর বিস্ফোরণ এবং ইসরায়েলের সঙ্গে দীর্ঘ সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করেছে।

নতুন নেতৃত্ব, পুরোনো সমস্যার ভার

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দীর্ঘ রাজনৈতিক শূন্যতার পর জোসেফ আওন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। কয়েক দিনের মধ্যে নওয়াফ সালাম প্রধানমন্ত্রী হন। দুজনই প্রচলিত রাজনৈতিক গোষ্ঠীর বাইরে থেকে উঠে আসা নেতা।

ক্ষমতায় এসে তারা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা, সংস্কার এবং হিজবুল্লাহর সামরিক সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি দেন। সরকার হিজবুল্লাহর সামরিক শাখাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সহায়তা পাওয়ার পথ তৈরি করতে কিছু আইনও পাস করেছে। তবে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জায়গায় এখনো বড় ঘাটতি রয়েছে।

লেবননের সামনে মূল সংকটটি অনেকটা জটিল গিঁটের মতো। হিজবুল্লাহর অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ করতে আন্তর্জাতিক সহায়তা দরকার। আবার আন্তর্জাতিক দাতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা পেতে হলে আগে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করা সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ

দীর্ঘদিন ধরে হিজবুল্লাহ লেবননের ভেতরে অনেকটা আলাদা রাষ্ট্রের মতো কার্যক্রম চালিয়েছে। তাদের নিজস্ব বিদ্যালয়, হাসপাতাল, যুব কার্যক্রম এবং আর্থিক ব্যবস্থাও রয়েছে। ফলে বিশেষ করে শিয়া জনগোষ্ঠীর একটি অংশের মধ্যে সংগঠনটির শক্তিশালী সামাজিক ভিত্তি তৈরি হয়েছে।

তবে সাম্প্রতিক যুদ্ধ সেই ভিত্তিতেও চাপ তৈরি করেছে। অনেক মানুষ দীর্ঘ সংঘাতে ক্লান্ত। ইরানের প্রভাব নিয়েও লেবননের ভেতরে উদ্বেগ বাড়ছে।

সরকার ধীরে ধীরে হিজবুল্লাহর অস্ত্র সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। সামরিক শাখাকে বেআইনি ঘোষণা করা হয়েছে এবং অস্ত্র পরিবহনের অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত কঠিন। কারণ লেবননের সেনাবাহিনী এখনো সামরিক সক্ষমতায় হিজবুল্লাহর তুলনায় দুর্বল।

ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারও বড় প্রশ্ন

লেবননের রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার আরেকটি শর্ত হলো দক্ষিণাঞ্চল থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার। দুই দেশের মধ্যে এ বিষয়ে একটি সমঝোতা হয়েছে এবং দক্ষিণ লেবননের নির্দিষ্ট এলাকায় সেনা মোতায়েনের মাধ্যমে প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছে।

তবে সীমান্ত এলাকায় ইসরায়েলের সামরিক উপস্থিতি এবং নিয়মিত বিমান হামলা পরিস্থিতিকে জটিল করে রেখেছে। লেবননের কর্মকর্তাদের মতে, রাষ্ট্র যদি নিজের ভূখণ্ডে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে না পারে, তাহলে জনগণ ও বিনিয়োগকারীদের কাছে সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করা কঠিন হবে।

যুদ্ধের ক্ষতি অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করেছে

সাম্প্রতিক সংঘাতে লেবননের সরাসরি ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার বলে সরকারের হিসাব। এর আগে সংঘাতের ক্ষতি ছিল প্রায় ৮৫০ কোটি ডলার। সব মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ দেশটির মোট অর্থনীতির প্রায় ৪০ শতাংশের সমান।

চলতি বছর অর্থনৈতিক উৎপাদন ৭ থেকে ৮ শতাংশ কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর ফলে দেশটি আবার মন্দার দিকে যেতে পারে।

দক্ষিণ লেবননের বহু গ্রাম ধ্বংস হয়েছে। বহু মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়েছেন। যুদ্ধের মানবিক ক্ষতির পাশাপাশি পুনর্গঠনের বিশাল ব্যয় এখন সরকারের সামনে নতুন চাপ তৈরি করেছে।

ব্যাংকিং ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার ক্ষত এখনো শুকায়নি

লেবননের বর্তমান সংকটের শুরু শুধু যুদ্ধ থেকে নয়। ২০১৯ সালে দেশটির দীর্ঘদিনের আর্থিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। বিশাল সরকারি ঘাটতি সামাল দিতে দীর্ঘ সময় ধরে যে আর্থিক কাঠামো চালু রাখা হয়েছিল, ব্যাংকে নতুন আমানত কমে যাওয়ার পর সেটি আর টেকেনি।

এরপর বৈদেশিক মুদ্রা উত্তোলনে কঠোরতা, মূল্যস্ফীতি এবং মুদ্রার দ্রুত অবমূল্যায়ন শুরু হয়। দেশের অর্থনীতি সংকটের আগের আকারের প্রায় অর্ধেকে নেমে গেছে। বহু আমানতকারী এখনো নিজেদের অর্থ পুরোপুরি তুলতে পারছেন না।

মূল্যস্ফীতি একসময় ২২১ শতাংশে উঠেছিল। পরে তা কমে এলেও এখনো তা অনেক বেশি। দেশটির মুদ্রার মূল্যও আগের নির্ধারিত হারের তুলনায় প্রায় ৯৮ শতাংশ কমে গেছে।

সংস্কার ছাড়া আন্তর্জাতিক সহায়তাও অনিশ্চিত

লেবনন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সঙ্গে প্রায় ৩০০ কোটি মার্কিন ডলারের সহায়তা নিয়ে সমঝোতা করেছিল। কিন্তু প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন না হওয়ায় চূড়ান্ত অনুমোদন হয়নি।

ব্যাংকিং খাত সংস্কারে সরকার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। ব্যাংকের গোপনীয়তা আইন শিথিল করা হয়েছে এবং অকার্যকর ব্যাংক পুনর্গঠন বা বন্ধ করার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু ব্যাংক, আমানতকারী ও রাষ্ট্রের মধ্যে প্রায় ৮০০০ কোটি মার্কিন ডলারের ক্ষতি কীভাবে ভাগ হবে, সেই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।

বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থাতেও গভীর সংকট

অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য শুধু ব্যাংকিং সংস্কার যথেষ্ট নয়। দেশটির বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ অবকাঠামোও বড় সমস্যায় রয়েছে।

রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থা দিনে মাত্র কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে। ফলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে।

দুর্বল ইন্টারনেট ব্যবস্থা ব্যবসা ও প্রযুক্তি খাতের জন্য আরেকটি বাধা। অথচ লেবননের বিশ্ববিদ্যালয়, দক্ষ জনশক্তি ও উদ্যোক্তা সংস্কৃতির কারণে প্রযুক্তি খাতে সম্ভাবনা রয়েছে। নতুন উদ্যোগগুলো রোবোটিকস ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক তথ্যকেন্দ্রের জন্য হার্ডওয়্যার তৈরির মতো কাজেও এগোচ্ছে।

রাষ্ট্রের ভেতরের পুরোনো ক্ষমতার কাঠামোই মূল বাধা

লেবননের সবচেয়ে বড় সমস্যা সম্ভবত এখানেই। সরকার সংস্কারের কথা বললেও রাষ্ট্রের ভেতরের পুরোনো ক্ষমতাধর গোষ্ঠীগুলো এখনো শক্তিশালী।

হিজবুল্লাহর হাতে অস্ত্র রয়েছে, ব্যাংকিং সংস্কারে প্রভাবশালী স্বার্থগোষ্ঠীর বাধা রয়েছে এবং সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক নেতারা দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও সুযোগ নিজেদের প্রভাববলয়ের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছেন।

ফলে শুধু নতুন সরকার গঠন করলেই পুরোনো ব্যবস্থা বদলে যাচ্ছে না। বরং সেই ব্যবস্থা নিজেদের টিকিয়ে রাখার মতো শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।

লেবননের জন্য সার্বভৌমত্বের অর্থ তাই শুধু আকাশে বিদেশি ড্রোনের উপস্থিতি বন্ধ করা বা কোনো বিদেশি কূটনীতিককে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা নয়। এর অর্থ হলো দুর্বল রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ব্যবহার করে সুবিধা নেওয়া পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামো থেকে রাষ্ট্রকে মুক্ত করা।

বৈরুত বন্দরের ধ্বংসপ্রাপ্ত শস্যভান্ডার তাই শুধু একটি বিস্ফোরণের স্মৃতি নয়। সেটি যেন আজকের লেবননের প্রতিচ্ছবি—পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি, আবার পুনর্গঠিতও হয়নি; মাঝপথে থমকে থাকা একটি রাষ্ট্র।