আফ্রিকার সড়কে দ্রুত বাড়ছে বৈদ্যুতিক যানবাহনের উপস্থিতি। জ্বালানির দাম বাড়া, আমদানি ব্যয় কমানোর প্রয়োজন এবং পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণের তাগিদে বিশেষ করে দুই ও তিন চাকার বৈদ্যুতিক যান জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
ইথিওপিয়ায় বৈদ্যুতিক যানবাহনের বড় উত্থান
ইথিওপিয়া আফ্রিকার বৈদ্যুতিক যানবাহন ব্যবহারের ক্ষেত্রে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। ২০২৪ সালে অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিনচালিত গাড়ি আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপের পর দেশটিতে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
দেশটির পরিবহন মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ২০২৫ সালে ইথিওপিয়ার সড়কে প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার বৈদ্যুতিক যান চলাচল করেছে। তবে এই সংখ্যা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। অন্য সরকারি হিসাবগুলোতে একই সময়ে সক্রিয় বৈদ্যুতিক যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ১৫ হাজার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও কয়েক বছরের মধ্যে প্রায় শূন্য থেকে এই পর্যায়ে পৌঁছানোকে বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জ্বালানির দামই বদলে দিচ্ছে মানুষের সিদ্ধান্ত
বৈদ্যুতিক যান কেনার ক্ষেত্রে প্রাথমিক খরচ তুলনামূলক বেশি হলেও দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি ব্যয় অনেক কম। ফলে পেট্রোলের দাম যত বাড়ছে, ততই চালকদের কাছে বৈদ্যুতিক যান আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
ইথিওপিয়ায় জ্বালানি ভর্তুকি কমানোর পর পেট্রোলের দাম বেড়ে যায়। এতে অনেক মানুষ জ্বালানি সাশ্রয়ী বৈদ্যুতিক যান বেছে নিতে শুরু করেন। আফ্রিকার অন্যান্য দেশেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
২০২৫ সালের মে পর্যন্ত এক বছরে আফ্রিকায় দুই ও তিন চাকার বৈদ্যুতিক যান বিক্রি ৩৮ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে বৈদ্যুতিক গাড়ির বিক্রি বেড়েছে ২৮ শতাংশ।
যুদ্ধের প্রভাবেও বাড়ছে বৈদ্যুতিক যানের চাহিদা
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা আফ্রিকায় বৈদ্যুতিক যান ব্যবহারের প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। ইথিওপিয়াভিত্তিক বৈদ্যুতিক যান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান দোদাইয়ের উদ্যোক্তার মতে, চলতি বছরে তাদের বৈদ্যুতিক বাইকের চাহিদা গত বছরের তুলনায় দুই থেকে তিন গুণ বেড়েছে।
আফ্রিকার অন্যতম বড় বৈদ্যুতিক যান নির্মাতা স্পাইরোরও দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তাদের ১ লাখ ১৪ হাজারের বেশি বৈদ্যুতিক বাইক এখন আফ্রিকার বিভিন্ন সড়কে চলছে। গত বছরের ডিসেম্বরের তুলনায় এ সংখ্যা ৬৮ শতাংশ বেশি।
দক্ষিণ আফ্রিকাতেও বৈদ্যুতিক গাড়ির বিক্রি বাড়ছে। চলতি বছর সেখানে প্রায় ৮ হাজার ৩০০ বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রির পূর্বাভাস রয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। তবে দেশটির মোট গাড়ি বিক্রির তুলনায় এই সংখ্যা এখনো ছোট।
ব্যাটারি বদলের অবকাঠামো গড়ে উঠছে
বৈদ্যুতিক যান জনপ্রিয় হওয়ার সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থা। আফ্রিকার অনেক দেশে এখনো বড় শহরের বাইরে পর্যাপ্ত চার্জিং সুবিধা নেই।
এই সমস্যার সমাধানে ব্যাটারি বদল কেন্দ্র তৈরি করা হচ্ছে। ইথিওপিয়ায় দোদাই প্রতি মাসে নতুন ব্যাটারি বদল কেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা করছে। এতে চালকদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। খালি ব্যাটারির পরিবর্তে দ্রুত চার্জ করা ব্যাটারি নেওয়া যাবে।
স্পাইরোও পূর্ব আফ্রিকাজুড়ে এমন অবকাঠামো গড়ে তুলছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী বছরের মাঝামাঝি সময়ে কেনিয়া থেকে উগান্ডা হয়ে রুয়ান্ডা পর্যন্ত বৈদ্যুতিক বাইকে যাতায়াত সম্ভব হতে পারে।

আফ্রিকায় তৈরি হবে বৈদ্যুতিক যানের যন্ত্রাংশ
শুধু যানবাহন আমদানি নয়, আফ্রিকায় বৈদ্যুতিক যান তৈরির শিল্পও গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। স্পাইরো কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র, ইথিওপিয়া, কেনিয়া ও নাইজেরিয়ায় বড় উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা করছে।
প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন দেশে বৈদ্যুতিক বাইকের যন্ত্রাংশ তৈরি করে পরে মহাদেশের ছোট কারখানাগুলোতে সেগুলো সংযোজনের পরিকল্পনা করছে। ব্যাটারি কেনার পেছনে চলতি বছর প্রায় ৪০ কোটি ডলার ব্যয় হতে পারে, যা আগামী বছর প্রায় ১০০ কোটি ডলারে পৌঁছানোর লক্ষ্য রয়েছে।
এতে আফ্রিকায় ব্যাটারি উৎপাদনের কারখানা স্থাপনে নতুন বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। স্থানীয় উৎপাদন বাড়লে ভবিষ্যতে বৈদ্যুতিক যান তৈরির খরচও কমে আসতে পারে।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো
তবে আফ্রিকার বৈদ্যুতিক যানবাহন বিপ্লব এখনো অনেক বাধার মুখে। নিকট ভবিষ্যতে দুই চাকার বৈদ্যুতিক যানই সবচেয়ে দ্রুত বিস্তার লাভ করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সাধারণ বৈদ্যুতিক গাড়ির দাম এখনো অধিকাংশ মানুষের নাগালের বাইরে।
এ ছাড়া গাড়ির জন্য প্রয়োজনীয় চার্জিং কেন্দ্র নির্মাণ ব্যয়বহুল। আফ্রিকার অনেক দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাও দুর্বল। তাই নির্ভরযোগ্য চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তুলতে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার বড় ধরনের উন্নয়ন প্রয়োজন।
সরকারের জন্যও বড় অর্থনৈতিক সুযোগ
বৈদ্যুতিক যানবাহনের প্রসার শুধু চালকদের খরচ কমাবে না, সরকারের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আফ্রিকার বহু দেশকে বিপুল অর্থ ব্যয় করে জ্বালানি আমদানি করতে হয়। বৈদ্যুতিক যান বাড়লে সেই আমদানির ওপর চাপ কমবে এবং সরকারের অর্থ সাশ্রয় হতে পারে।
একই সঙ্গে শহরের বায়ুদূষণ কমবে, জ্বালানি ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা বাড়বে এবং নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
আফ্রিকার বৈদ্যুতিক যানবাহনের পরিবর্তন তাই শুধু পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগ নয়; এটি চালকদের ব্যয় কমানো, সরকারের অর্থ সাশ্রয় এবং স্থানীয় শিল্প গড়ে তোলার একটি বড় অর্থনৈতিক সুযোগও হয়ে উঠছে।
বৈদ্যুতিক যানবাহনের প্রসার আফ্রিকার জ্বালানি ব্যয় কমিয়ে পরিবেশবান্ধব পরিবহন ও নতুন শিল্পের পথ খুলে দিচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















