১৬ বছর বয়সে একদিন একমুখী ট্রেনের টিকিট হাতে মুম্বাই এসেছিলেন গুলজার। তখন তিনি জানতেন না, জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ ও গভীর সম্পর্কটি তৈরি হতে চলেছে এই শহরের সঙ্গেই। ৭৬ বছর পর সেই মুম্বাই এখন তাঁর কাছে শুধু বসবাসের জায়গা নয়, বরং স্মৃতি, সাহিত্য, বন্ধুত্ব, সংগ্রাম আর সৃষ্টিশীলতার এক বিশাল ভুবন।
৯১ বছর বয়সে এসে কিংবদন্তি কবি, গীতিকার, লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা গুলজার তাঁর নতুন কবিতা ও ছোটগল্পের সংকলন ‘আমচি মুম্বাই’-তে সেই শহরকেই নতুন করে তুলে ধরেছেন। তাঁর চোখে মুম্বাই এমন এক শহর, যে কঠিন হলেও আপন করে নেয়, শাসন করলেও ছেড়ে যায় না।
১৬ বছরের কিশোর থেকে মুম্বাইয়ের গুলজার
গুলজারের মুম্বাই-যাত্রার শুরুটা ছিল অনেকটা আকস্মিক। দিল্লির সেন্ট স্টিফেনস কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েও পরিবারের সিদ্ধান্তে মাত্র ১৬ বছর বয়সে তাঁকে মুম্বাইয়ের ট্রেনে তুলে দেওয়া হয়। হাতে ছিল একমুখী টিকিট। গন্তব্যে পৌঁছানো ছাড়া যেন আর কোনো পথ ছিল না।
শহরে এসে তাঁর ঠিকানা হয় দাদারের কেম হাসপাতালের বিপরীতে একটি সাধারণ চাওলে। নতুন শহরে জীবনের শুরু ছিল কঠিন। কিন্তু সেই কঠিন সময়ের মধ্যেই তিনি খুঁজে পান মুম্বাইয়ের অন্য এক মুখ—যেখানে অপরিচিত মানুষও প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ায়।
তখনকার ইরানি খাবারের দোকানগুলো ছিল শহরের সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সামান্য টাকায় কিমা-পাউ খেয়ে দিন পার করা যেত। পথচারীদের জন্য পানির ব্যবস্থাও থাকত। রাতে অবশিষ্ট বিরিয়ানিও অনেক সময় অভুক্ত মানুষের জন্য রেখে দেওয়া হতো।
এই ছোট ছোট মানবিক অভিজ্ঞতাই গুলজারের মনে মুম্বাইকে অন্যরকম করে গড়ে দেয়।
‘এই শহর বড় ভাইয়ের মতো’
মুম্বাইকে গুলজার তুলনা করেছেন একজন বড় ভাইয়ের সঙ্গে। তাঁর ভাষায়, শহরটি মানুষকে কাছে রাখে, প্রয়োজনমতো সামলায়, কখনো ধমকও দেয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছেড়ে যায় না।
এই সম্পর্কের মধ্যেই লুকিয়ে আছে মুম্বাইয়ের বিশেষ চরিত্র। শহরটি যেমন কঠোর, তেমনি আশ্রয়দাতা। এখানে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ নতুন স্বপ্ন নিয়ে আসে। কেউ কাজের সন্ধানে, কেউ শিল্পের টানে, আবার কেউ জীবনের নতুন সম্ভাবনা খুঁজতে।
গুলজারের নিজের জীবনও যেন সেই মুম্বাইয়ের গল্পেরই একটি অংশ।
বই, কবিতা আর শ্রমজীবী মানুষের শহর
গুলজারের স্মৃতিতে পুরোনো মুম্বাই ছিল শুধু কর্মব্যস্ত নগরী নয়, সাহিত্য ও সংস্কৃতিরও প্রাণকেন্দ্র। অল্প টাকায় বই কেনা যেত, কবিতা পাঠের আসর বসত, লেখক-কবিদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সরাসরি যোগাযোগ ছিল।
তখনকার মুম্বাইয়ে শ্রমজীবী মানুষের শক্তিশালী উপস্থিতিও ছিল। রাজনৈতিক সভা, শ্রমিক আন্দোলন এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ছিল শহরের দৈনন্দিন জীবনের অংশ।
সেই সময়ের কথা বলতে গিয়ে গুলজারের মনে পড়ে যায় কবি শৈলেন্দ্রের কথা। হিন্দি চলচ্চিত্রের গানে সাধারণ মানুষের জীবন ও অনুভূতিকে যে কবি অসাধারণভাবে তুলে ধরেছিলেন, তিনিও একসময় মাতুঙ্গার রেল ইয়ার্ডে কাজ করতেন।
অর্থাৎ সাহিত্য ও শ্রমজীবী জীবন তখন একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না। শহরের সংস্কৃতি তৈরি হতো সাধারণ মানুষের জীবন, স্বপ্ন ও সংগ্রামকে ঘিরেই।
বাংলা সাহিত্যের প্রভাবও ছিল গভীর
গুলজারের সাহিত্যিক জীবনকে বুঝতে গেলে বাংলা সাহিত্যের প্রভাবের কথাও সামনে আসে। চলচ্চিত্রে কাজ শুরুর সময় তিনি বিমল রায়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। রায়ের চলচ্চিত্রে বাংলা সাহিত্য ও গল্পের প্রভাব ছিল গভীর।
‘সুজাতা’, ‘বন্দিনী’, ‘দো বিঘা জমিন’ কিংবা ‘দেবদাস’-এর মতো চলচ্চিত্রের পেছনে বাংলা সাহিত্যিক ঐতিহ্যের ছাপ রয়েছে। ফলে গুলজারের সাহিত্যবোধে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হওয়াটা ছিল স্বাভাবিক।
উর্দু, পাঞ্জাবি, হিন্দি ও বাংলার নানা শব্দ, ছন্দ ও অনুভূতি তাঁর লেখায় এক ধরনের নিজস্ব ভাষার জন্ম দিয়েছে। মুম্বাইয়ের বহুভাষিক পরিবেশ সেই সৃষ্টিশীলতাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

সাহিত্য কখনো ছেড়ে যাননি
গুলজারের সঙ্গে কথোপকথনে তাঁর সাহিত্যজীবন নিয়ে একটি বিষয় বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে—তিনি মনে করেন না যে কখনো সাহিত্য থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন।
চলচ্চিত্র তাঁর জীবনে এসেছে, তাঁকে স্থিরতা ও পরিচিতি দিয়েছে। কিন্তু বই ও লেখালেখিই ছিল তাঁর মূল আশ্রয়। চলচ্চিত্রের দীর্ঘ কর্মজীবনের মধ্যেও সাহিত্য তাঁর সঙ্গ ছাড়েনি।
এই কারণেই তাঁর নতুন সংকলনকে শুধু মুম্বাই নিয়ে লেখা বই হিসেবে দেখলে হয়তো পুরো বিষয়টি ধরা যাবে না। এটি একই সঙ্গে একজন শিল্পীর দীর্ঘ জীবন, একটি শহরের পরিবর্তন এবং সময়ের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক বদলে যাওয়ার গল্প।
বদলে যাওয়া মুম্বাইয়ের জন্য আক্ষেপ
গুলজারের স্মৃতির মুম্বাই আর আজকের মুম্বাই এক নয়। তাঁর চোখে শহরটি এখন অনেক বেশি কঠিন, প্রতিযোগিতামূলক এবং বাজারকেন্দ্রিক।
সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন এসেছে শ্রমজীবী মানুষের জীবন ও সামাজিক মর্যাদায়। একসময় দারিদ্র্যের মধ্যেও শ্রমজীবী মানুষের যে আত্মমর্যাদা ছিল, এখন তার জায়গায় অনেক ক্ষেত্রে লজ্জাবোধ তৈরি হয়েছে—এমন আক্ষেপই উঠে এসেছে তাঁর কথায়।
তবু পুরোনো মুম্বাইকে তিনি কেবল স্মৃতির শহর হিসেবে দেখেন না। সেই শহরের মানুষ, লেখক, কবি, শ্রমিক, খাবারের দোকান আর সাহিত্যিক আড্ডা তাঁর সৃষ্টিশীলতার ভিত তৈরি করেছে।
লেখকদের বন্ধুত্বে আরও বড় হয়েছে শহর
মুম্বাইয়ে বসবাসের কারণে গুলজারের সঙ্গে মারাঠি সাহিত্যিকদেরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়। পি. এল. দেশপাণ্ডে, ভি. ভি. শিরওয়াড়কর এবং কবি-সমালোচক দিলীপ চিত্রের মতো ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ তাঁর সাহিত্যিক জগৎকে আরও বিস্তৃত করেছে।
তাঁর কাছে লেখালেখি শুধু একা বসে শব্দ সাজানোর বিষয় নয়। অন্য লেখকের সঙ্গে দেখা করা, কথা বলা, বন্ধুত্ব তৈরি করা এবং তাঁদের ভাবনা থেকে নতুন কিছু শেখাও সৃষ্টিশীলতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মুম্বাই তাই শুধু একটি শহর নয়
গুলজারের নতুন বইয়ের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ সম্ভবত এখানেই—মুম্বাইকে তিনি দূর থেকে দেখা কোনো স্বপ্নের শহর হিসেবে তুলে ধরেননি। বরং তিনি দেখেছেন একজন অভিবাসী কিশোরের চোখ দিয়ে, যে শহরটির কঠিন বাস্তবতার মধ্যেই নিজের জীবন গড়ে তুলেছে।
সেই কিশোর পরে হয়ে উঠেছেন উপমহাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী কবি ও গীতিকার। কিন্তু এত বছর পরও তাঁর স্মৃতিতে মুম্বাইয়ের সবচেয়ে উজ্জ্বল ছবি তৈরি হয়েছে মানুষের ছোট ছোট আচরণ, সাহিত্যিক আড্ডা, শ্রমজীবী মানুষের জীবন এবং বহুভাষিক সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে।
‘আমচি মুম্বাই’ তাই কেবল একটি শহরকে নিয়ে লেখা সংকলন নয়। এটি এক শহরের সঙ্গে একজন মানুষের আজীবন সম্পর্কের গল্প—যেখানে অভিবাসন আছে, সংগ্রাম আছে, ভালোবাসা আছে এবং আছে সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া একটি নগরীর দীর্ঘ স্মৃতি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















