১০:২৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬
স্বাস্থ্যকর খাদ্য কেন এখনও নাগালের বাইরে? যুক্তরাষ্ট্রে আফগান অভিবাসীদের তথ্য সংগ্রহ ঘিরে নতুন উদ্বেগ, জোরালো হচ্ছে বিতর্ক যুক্তরাষ্ট্রে কমছে সহিংস অপরাধ, স্বস্তি ফিরছে শহরগুলোতে সাবেক রাষ্ট্রপতি হামিদ ও সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্রে সুপারমার্কেটের সামনে গাড়িচাপায় ৮২ বছরের নারী নিহত, বিচারের দাবিতে পরিবার ডেঙ্গুতে আরও ৩ মৃত্যু, দেশে প্রাণহানি বেড়ে ৪৩ সিলেটে গাছ থেকে তরুণের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার, মৃত্যুর কারণ নিয়ে তদন্ত মুম্বাইয়ের গল্পে গুলজারের ৭৬ বছর: যে শহর এক কিশোর অভিবাসীকে কবি বানিয়েছে পাঁচ বইয়ে পাঁচ ভুবনের যাত্রা, ইতিহাস থেকে ভবিষ্যৎ—পাঠকের জন্য নতুন পাঁচ ঠিকানা সৌদি আরবকে পরমাণু জ্বালানি সমৃদ্ধকরণে ছাড়, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রশ্ন—‘আমাদের নয় কেন?’

যুক্তরাষ্ট্রে কমছে সহিংস অপরাধ, স্বস্তি ফিরছে শহরগুলোতে

যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে সহিংস অপরাধের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। বিশেষ করে হত্যাকাণ্ড ও গাড়ি ছিনতাইয়ের ঘটনায় বড় ধরনের পতন দেখা যাচ্ছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় হত্যাকাণ্ডের হার গড়ে ১৮ শতাংশ কমেছে। অপরাধ কমার এই ধারা বছরের শেষ পর্যন্ত অব্যাহত থাকলে ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে জাতীয় হত্যার হার এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যেতে পারে

করোনাভাইরাস মহামারির সময় যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে সহিংস অপরাধ হঠাৎ বেড়ে গিয়েছিল। সেই সময়ের ভয় ও অনিশ্চয়তা এখন অনেকটাই কমে এসেছে। শহরগুলোর রাস্তায়, বসতিপূর্ণ এলাকায় এবং বিভিন্ন জনপরিসরে অপরাধের হার কমার যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তির খবর।

তবে অপরাধ কেন এত দ্রুত কমছে, তার উত্তর এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কৌশল, নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার, অপরাধ প্রতিরোধে স্থানীয় উদ্যোগ এবং মহামারির পর সমাজের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা—সব মিলিয়েই এই পরিবর্তন ঘটছে বলে মনে করা হচ্ছে।

হত্যাকাণ্ডে বড় ধরনের পতন

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের অপরাধের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ৩৬টি বড় ও মাঝারি শহরে হত্যাকাণ্ডের হার গত বছরের একই সময়ের তুলনায় গড়ে ১৮ শতাংশ কমেছে।

ওয়াশিংটন, আটলান্টা, ফিলাডেলফিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেস, ডেট্রয়েট, বাল্টিমোর ও নিউইয়র্কের মতো বড় শহরেও হত্যাকাণ্ড কমেছে। শুধু হত্যাকাণ্ড নয়, প্রাণঘাতী নয় এমন গুলিবর্ষণ এবং গুরুতর হামলার ঘটনাও কিছুটা কমেছে।

এই পতনকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে, কারণ মহামারির সময় যুক্তরাষ্ট্রের অনেক শহরে সহিংস অপরাধ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। সেই তুলনায় বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটাই ভিন্ন।

অপরাধের এই ধারাবাহিক পতন যদি বছরের বাকি সময়েও বজায় থাকে, তাহলে ২০২৬ সালের শেষে যুক্তরাষ্ট্রে হত্যাকাণ্ডের জাতীয় হার গত এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে কম পর্যায়ে পৌঁছানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

গাড়ি ছিনতাইয়ে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন

অপরাধ কমার সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো উদাহরণ হলো গাড়ি ছিনতাই। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় গাড়ি ছিনতাইয়ের ঘটনা ৪৭ শতাংশ কমেছে।

আরও বড় বিষয় হলো, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে গাড়ি ছিনতাইয়ের হার ২০২৩ সালের সর্বোচ্চ পর্যায়ের তুলনায় ৭৩ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে এই অপরাধের চিত্র আমূল বদলে গেছে।

আবাসিক বাড়িতে চুরি এবং মোটরগাড়ি চুরির ঘটনাও গত কয়েক বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ের তুলনায় অর্ধেকের বেশি কমেছে।

এতে বোঝা যাচ্ছে, শুধু হত্যাকাণ্ড নয়, বিভিন্ন ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রের অনেক শহরে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছে।

মহামারির পর বদলে গেছে অপরাধের সুযোগ

অপরাধের ওঠানামার কিছু কারণ সহজেই বোঝা যায়। মহামারির সময় মানুষ যখন দীর্ঘ সময় ঘরে ছিল, তখন আবাসিক বাড়িতে চুরির সুযোগ কমে গিয়েছিল। একইভাবে অনেক দোকান বন্ধ থাকায় দোকান থেকে চুরির ঘটনাও কম হয়েছিল।

কিন্তু পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর কিছু অপরাধ আবার বেড়ে যায়। বিশেষ করে গাড়ি ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ কেন মহামারির সময়ে এত দ্রুত বেড়েছিল এবং পরে কেন একইভাবে দ্রুত কমে যাচ্ছে, সেটি এখনো পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা কঠিন।

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, মানুষের চলাফেরা, সামাজিক আচরণ, পুলিশের কার্যক্রম, অপরাধের সুযোগ এবং প্রযুক্তির পরিবর্তন—সবকিছুর ওপর অপরাধের হার নির্ভর করে। ফলে একটি মাত্র কারণ দিয়ে এত বড় পরিবর্তন ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।

Experts share advice on understanding D.C. crime rates : NPR

কোনো একটি কারণকে দায়ী করা যাচ্ছে না

অপরাধ কমার এই প্রবণতা যুক্তরাষ্ট্রের নানা ধরনের শহরে দেখা যাচ্ছে। বড় শহর থেকে মাঝারি শহর—বিভিন্ন জায়গাতেই সহিংস অপরাধ কমেছে।

এ কারণে কোনো একটি রাজনৈতিক দলের নীতি, নির্দিষ্ট আইন বা একটি বিশেষ পুলিশি কর্মসূচিকে এই পতনের একমাত্র কারণ হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকেরা।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কৌশলে পরিবর্তন এসেছে। অনেক শহর এখন অপরাধ ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আগে থেকেই সহিংসতা ঠেকানোর চেষ্টা করছে। কোথাও নির্দিষ্ট এলাকায় লক্ষ্যভিত্তিক পুলিশি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। কোথাও স্থানীয় পর্যায়ে সহিংসতা প্রতিরোধের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।

আবার বন্দুক সহিংসতাকে শুধু অপরাধ হিসেবে না দেখে জনস্বাস্থ্যের সমস্যা হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে। ফলে পুলিশি ব্যবস্থার পাশাপাশি সামাজিক ও স্থানীয় উদ্যোগও গুরুত্ব পাচ্ছে।

প্রযুক্তিও বদলে দিচ্ছে অপরাধ দমন

অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির ব্যবহারও দ্রুত বাড়ছে। নজরদারি ক্যামেরা, মুখ শনাক্ত করার ব্যবস্থা, গাড়ির নম্বরপ্লেট শনাক্তকারী প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো নতুন প্রযুক্তি তদন্তের কাজকে দ্রুততর করছে।

আগে কোনো অপরাধের তদন্তে যে সময় লাগত, এখন অনেক ক্ষেত্রে প্রযুক্তির কারণে তা কমে এসেছে। অপরাধস্থলের ছবি, ভিডিও এবং বিভিন্ন তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ করে সন্দেহভাজন ব্যক্তি বা গাড়ি শনাক্ত করার সুযোগ বাড়ছে।

তবে প্রযুক্তির ব্যবহারই যে অপরাধ কমার প্রধান কারণ, এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যাচ্ছে না। কারণ একই সময়ে সামাজিক পরিবর্তন, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং মানুষের আচরণেও পরিবর্তন এসেছে।

সব জায়গায় পরিস্থিতি এক নয়

যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক চিত্র স্বস্তির হলেও সব শহরে অপরাধ কমেনি। কয়েকটি শহরে বরং হত্যাকাণ্ড বেড়েছে।

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় নরফোকে হত্যাকাণ্ডের হার ৬৪ শতাংশ বেড়েছে। সান ফ্রান্সিসকোতে বেড়েছে ৫৫ শতাংশ, ডালাসে ৩০ শতাংশ এবং সল্ট লেক সিটিতে ২০ শতাংশ।

এই পরিসংখ্যান দেখিয়ে দেয়, জাতীয় পর্যায়ে অপরাধ কমলেও প্রতিটি শহরের পরিস্থিতি একই নয়। কোনো কোনো এলাকায় স্থানীয় সমস্যা, সামাজিক পরিস্থিতি কিংবা আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার পার্থক্যের কারণে অপরাধের প্রবণতা ভিন্ন হতে পারে।

পারিবারিক সহিংসতা ও যৌন নিপীড়নে ভিন্ন চিত্র

সব ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে অবশ্য একই ধরনের পতন দেখা যায়নি।

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ শতাংশ বেড়েছে। যৌন নিপীড়নের ঘটনাও বেড়েছে ৩ শতাংশ।

তবে পারিবারিক সহিংসতার হার এখনো মহামারির আগের সময়ের তুলনায় কম রয়েছে। অর্থাৎ সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা বৃদ্ধি ঘটলেও দীর্ঘ সময়ের তুলনায় পরিস্থিতি পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরে যায়নি।

মাদক-সম্পর্কিত অপরাধের রিপোর্টও ১২ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু এখানেও মহামারির আগের সময়ের তুলনায় হার কম।

মাদক-সম্পর্কিত অপরাধের পরিসংখ্যানকে আবার কিছুটা সতর্কতার সঙ্গে দেখতে হয়। কারণ এ ধরনের ঘটনায় গ্রেপ্তার অনেকাংশে পুলিশের নীতি, অগ্রাধিকার এবং স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।

২০২৩ সাল থেকেই পরিবর্তনের ইঙ্গিত

যুক্তরাষ্ট্রে হত্যাকাণ্ড কমার বর্তমান প্রবণতা একেবারে নতুন নয়। ২০২৩ সাল থেকেই এই পতন শুরু হয়েছে বলে তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে।

মহামারির প্রভাব ধীরে ধীরে কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে সহিংস অপরাধও কমতে শুরু করে। এরপর বিভিন্ন প্রশাসনের সময়েও সেই পতন অব্যাহত রয়েছে।

এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কারণ এর অর্থ হলো, অপরাধ কমার পেছনে কোনো একক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে সহজে দায়ী করা যাচ্ছে না। বরং সময়ের সঙ্গে একাধিক পরিবর্তন একসঙ্গে কাজ করছে।

নির্ভরযোগ্য তথ্যের গুরুত্ব বাড়ছে

অপরাধের হার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক বিতর্ক দীর্ঘদিনের। জননিরাপত্তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্যও রয়েছে। ফলে কোন নীতি বাস্তবে কাজ করছে এবং কোনটি করছে না, তা বোঝার জন্য দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের প্রয়োজন আরও বেড়েছে।

অপরাধের সরকারি পরিসংখ্যান প্রকাশে অনেক সময় বেশি সময় লাগে। ফলে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বুঝতে গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের জন্য দ্রুত পাওয়া তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বর্তমান প্রবণতা সেই অর্থে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে—অপরাধ কমছে, কিন্তু কেন কমছে তার উত্তর এখনো পুরোপুরি জানা নেই।

সামনে আরও স্বস্তির সম্ভাবনা

২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসের তথ্য যদি বছরের বাকি সময়ের প্রবণতারও ইঙ্গিত হয়ে থাকে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রে সহিংস অপরাধের ক্ষেত্রে আরও বড় পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।

বিশেষ করে হত্যাকাণ্ডের হার যদি বর্তমান গতিতে কমতে থাকে, তাহলে বছরের শেষে জাতীয় পর্যায়ে এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন হার দেখা সম্ভব হতে পারে।

তবে এই পরিস্থিতিকে স্থায়ী পরিবর্তন হিসেবে দেখার আগে আরও সময়ের তথ্য প্রয়োজন। কারণ অপরাধের হার সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মানুষের জীবনযাপন, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং নানা স্থানীয় বিষয়ের সঙ্গে বদলে যেতে পারে।

সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এখন যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। মহামারির পর সহিংস অপরাধের যে ভয়াবহ উত্থান মানুষকে উদ্বিগ্ন করেছিল, তার অনেকটাই এখন পিছনে পড়ে গেছে। কিন্তু অপরাধ কমার এই গল্পের পুরো কারণ এখনো অজানা। আর সেই কারণ খুঁজে বের করাই আগামী দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রে সহিংস অপরাধের হার দ্রুত কমছে। হত্যাকাণ্ড ও গাড়ি ছিনতাইয়ে বড় পতনের কারণে ২০২৬ সালে শত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন হত্যার হার দেখা যেতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

স্বাস্থ্যকর খাদ্য কেন এখনও নাগালের বাইরে?

যুক্তরাষ্ট্রে কমছে সহিংস অপরাধ, স্বস্তি ফিরছে শহরগুলোতে

০৯:০৫:৩৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে সহিংস অপরাধের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। বিশেষ করে হত্যাকাণ্ড ও গাড়ি ছিনতাইয়ের ঘটনায় বড় ধরনের পতন দেখা যাচ্ছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় হত্যাকাণ্ডের হার গড়ে ১৮ শতাংশ কমেছে। অপরাধ কমার এই ধারা বছরের শেষ পর্যন্ত অব্যাহত থাকলে ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে জাতীয় হত্যার হার এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যেতে পারে

করোনাভাইরাস মহামারির সময় যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে সহিংস অপরাধ হঠাৎ বেড়ে গিয়েছিল। সেই সময়ের ভয় ও অনিশ্চয়তা এখন অনেকটাই কমে এসেছে। শহরগুলোর রাস্তায়, বসতিপূর্ণ এলাকায় এবং বিভিন্ন জনপরিসরে অপরাধের হার কমার যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তির খবর।

তবে অপরাধ কেন এত দ্রুত কমছে, তার উত্তর এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কৌশল, নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার, অপরাধ প্রতিরোধে স্থানীয় উদ্যোগ এবং মহামারির পর সমাজের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা—সব মিলিয়েই এই পরিবর্তন ঘটছে বলে মনে করা হচ্ছে।

হত্যাকাণ্ডে বড় ধরনের পতন

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের অপরাধের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ৩৬টি বড় ও মাঝারি শহরে হত্যাকাণ্ডের হার গত বছরের একই সময়ের তুলনায় গড়ে ১৮ শতাংশ কমেছে।

ওয়াশিংটন, আটলান্টা, ফিলাডেলফিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেস, ডেট্রয়েট, বাল্টিমোর ও নিউইয়র্কের মতো বড় শহরেও হত্যাকাণ্ড কমেছে। শুধু হত্যাকাণ্ড নয়, প্রাণঘাতী নয় এমন গুলিবর্ষণ এবং গুরুতর হামলার ঘটনাও কিছুটা কমেছে।

এই পতনকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে, কারণ মহামারির সময় যুক্তরাষ্ট্রের অনেক শহরে সহিংস অপরাধ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। সেই তুলনায় বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটাই ভিন্ন।

অপরাধের এই ধারাবাহিক পতন যদি বছরের বাকি সময়েও বজায় থাকে, তাহলে ২০২৬ সালের শেষে যুক্তরাষ্ট্রে হত্যাকাণ্ডের জাতীয় হার গত এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে কম পর্যায়ে পৌঁছানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

গাড়ি ছিনতাইয়ে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন

অপরাধ কমার সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো উদাহরণ হলো গাড়ি ছিনতাই। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় গাড়ি ছিনতাইয়ের ঘটনা ৪৭ শতাংশ কমেছে।

আরও বড় বিষয় হলো, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে গাড়ি ছিনতাইয়ের হার ২০২৩ সালের সর্বোচ্চ পর্যায়ের তুলনায় ৭৩ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে এই অপরাধের চিত্র আমূল বদলে গেছে।

আবাসিক বাড়িতে চুরি এবং মোটরগাড়ি চুরির ঘটনাও গত কয়েক বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ের তুলনায় অর্ধেকের বেশি কমেছে।

এতে বোঝা যাচ্ছে, শুধু হত্যাকাণ্ড নয়, বিভিন্ন ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রের অনেক শহরে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছে।

মহামারির পর বদলে গেছে অপরাধের সুযোগ

অপরাধের ওঠানামার কিছু কারণ সহজেই বোঝা যায়। মহামারির সময় মানুষ যখন দীর্ঘ সময় ঘরে ছিল, তখন আবাসিক বাড়িতে চুরির সুযোগ কমে গিয়েছিল। একইভাবে অনেক দোকান বন্ধ থাকায় দোকান থেকে চুরির ঘটনাও কম হয়েছিল।

কিন্তু পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর কিছু অপরাধ আবার বেড়ে যায়। বিশেষ করে গাড়ি ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ কেন মহামারির সময়ে এত দ্রুত বেড়েছিল এবং পরে কেন একইভাবে দ্রুত কমে যাচ্ছে, সেটি এখনো পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা কঠিন।

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, মানুষের চলাফেরা, সামাজিক আচরণ, পুলিশের কার্যক্রম, অপরাধের সুযোগ এবং প্রযুক্তির পরিবর্তন—সবকিছুর ওপর অপরাধের হার নির্ভর করে। ফলে একটি মাত্র কারণ দিয়ে এত বড় পরিবর্তন ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।

Experts share advice on understanding D.C. crime rates : NPR

কোনো একটি কারণকে দায়ী করা যাচ্ছে না

অপরাধ কমার এই প্রবণতা যুক্তরাষ্ট্রের নানা ধরনের শহরে দেখা যাচ্ছে। বড় শহর থেকে মাঝারি শহর—বিভিন্ন জায়গাতেই সহিংস অপরাধ কমেছে।

এ কারণে কোনো একটি রাজনৈতিক দলের নীতি, নির্দিষ্ট আইন বা একটি বিশেষ পুলিশি কর্মসূচিকে এই পতনের একমাত্র কারণ হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকেরা।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কৌশলে পরিবর্তন এসেছে। অনেক শহর এখন অপরাধ ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আগে থেকেই সহিংসতা ঠেকানোর চেষ্টা করছে। কোথাও নির্দিষ্ট এলাকায় লক্ষ্যভিত্তিক পুলিশি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। কোথাও স্থানীয় পর্যায়ে সহিংসতা প্রতিরোধের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।

আবার বন্দুক সহিংসতাকে শুধু অপরাধ হিসেবে না দেখে জনস্বাস্থ্যের সমস্যা হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে। ফলে পুলিশি ব্যবস্থার পাশাপাশি সামাজিক ও স্থানীয় উদ্যোগও গুরুত্ব পাচ্ছে।

প্রযুক্তিও বদলে দিচ্ছে অপরাধ দমন

অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির ব্যবহারও দ্রুত বাড়ছে। নজরদারি ক্যামেরা, মুখ শনাক্ত করার ব্যবস্থা, গাড়ির নম্বরপ্লেট শনাক্তকারী প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো নতুন প্রযুক্তি তদন্তের কাজকে দ্রুততর করছে।

আগে কোনো অপরাধের তদন্তে যে সময় লাগত, এখন অনেক ক্ষেত্রে প্রযুক্তির কারণে তা কমে এসেছে। অপরাধস্থলের ছবি, ভিডিও এবং বিভিন্ন তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ করে সন্দেহভাজন ব্যক্তি বা গাড়ি শনাক্ত করার সুযোগ বাড়ছে।

তবে প্রযুক্তির ব্যবহারই যে অপরাধ কমার প্রধান কারণ, এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যাচ্ছে না। কারণ একই সময়ে সামাজিক পরিবর্তন, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং মানুষের আচরণেও পরিবর্তন এসেছে।

সব জায়গায় পরিস্থিতি এক নয়

যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক চিত্র স্বস্তির হলেও সব শহরে অপরাধ কমেনি। কয়েকটি শহরে বরং হত্যাকাণ্ড বেড়েছে।

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় নরফোকে হত্যাকাণ্ডের হার ৬৪ শতাংশ বেড়েছে। সান ফ্রান্সিসকোতে বেড়েছে ৫৫ শতাংশ, ডালাসে ৩০ শতাংশ এবং সল্ট লেক সিটিতে ২০ শতাংশ।

এই পরিসংখ্যান দেখিয়ে দেয়, জাতীয় পর্যায়ে অপরাধ কমলেও প্রতিটি শহরের পরিস্থিতি একই নয়। কোনো কোনো এলাকায় স্থানীয় সমস্যা, সামাজিক পরিস্থিতি কিংবা আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার পার্থক্যের কারণে অপরাধের প্রবণতা ভিন্ন হতে পারে।

পারিবারিক সহিংসতা ও যৌন নিপীড়নে ভিন্ন চিত্র

সব ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে অবশ্য একই ধরনের পতন দেখা যায়নি।

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ শতাংশ বেড়েছে। যৌন নিপীড়নের ঘটনাও বেড়েছে ৩ শতাংশ।

তবে পারিবারিক সহিংসতার হার এখনো মহামারির আগের সময়ের তুলনায় কম রয়েছে। অর্থাৎ সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা বৃদ্ধি ঘটলেও দীর্ঘ সময়ের তুলনায় পরিস্থিতি পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরে যায়নি।

মাদক-সম্পর্কিত অপরাধের রিপোর্টও ১২ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু এখানেও মহামারির আগের সময়ের তুলনায় হার কম।

মাদক-সম্পর্কিত অপরাধের পরিসংখ্যানকে আবার কিছুটা সতর্কতার সঙ্গে দেখতে হয়। কারণ এ ধরনের ঘটনায় গ্রেপ্তার অনেকাংশে পুলিশের নীতি, অগ্রাধিকার এবং স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।

২০২৩ সাল থেকেই পরিবর্তনের ইঙ্গিত

যুক্তরাষ্ট্রে হত্যাকাণ্ড কমার বর্তমান প্রবণতা একেবারে নতুন নয়। ২০২৩ সাল থেকেই এই পতন শুরু হয়েছে বলে তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে।

মহামারির প্রভাব ধীরে ধীরে কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে সহিংস অপরাধও কমতে শুরু করে। এরপর বিভিন্ন প্রশাসনের সময়েও সেই পতন অব্যাহত রয়েছে।

এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কারণ এর অর্থ হলো, অপরাধ কমার পেছনে কোনো একক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে সহজে দায়ী করা যাচ্ছে না। বরং সময়ের সঙ্গে একাধিক পরিবর্তন একসঙ্গে কাজ করছে।

নির্ভরযোগ্য তথ্যের গুরুত্ব বাড়ছে

অপরাধের হার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক বিতর্ক দীর্ঘদিনের। জননিরাপত্তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্যও রয়েছে। ফলে কোন নীতি বাস্তবে কাজ করছে এবং কোনটি করছে না, তা বোঝার জন্য দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের প্রয়োজন আরও বেড়েছে।

অপরাধের সরকারি পরিসংখ্যান প্রকাশে অনেক সময় বেশি সময় লাগে। ফলে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বুঝতে গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের জন্য দ্রুত পাওয়া তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বর্তমান প্রবণতা সেই অর্থে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে—অপরাধ কমছে, কিন্তু কেন কমছে তার উত্তর এখনো পুরোপুরি জানা নেই।

সামনে আরও স্বস্তির সম্ভাবনা

২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসের তথ্য যদি বছরের বাকি সময়ের প্রবণতারও ইঙ্গিত হয়ে থাকে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রে সহিংস অপরাধের ক্ষেত্রে আরও বড় পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।

বিশেষ করে হত্যাকাণ্ডের হার যদি বর্তমান গতিতে কমতে থাকে, তাহলে বছরের শেষে জাতীয় পর্যায়ে এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন হার দেখা সম্ভব হতে পারে।

তবে এই পরিস্থিতিকে স্থায়ী পরিবর্তন হিসেবে দেখার আগে আরও সময়ের তথ্য প্রয়োজন। কারণ অপরাধের হার সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মানুষের জীবনযাপন, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং নানা স্থানীয় বিষয়ের সঙ্গে বদলে যেতে পারে।

সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এখন যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। মহামারির পর সহিংস অপরাধের যে ভয়াবহ উত্থান মানুষকে উদ্বিগ্ন করেছিল, তার অনেকটাই এখন পিছনে পড়ে গেছে। কিন্তু অপরাধ কমার এই গল্পের পুরো কারণ এখনো অজানা। আর সেই কারণ খুঁজে বের করাই আগামী দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রে সহিংস অপরাধের হার দ্রুত কমছে। হত্যাকাণ্ড ও গাড়ি ছিনতাইয়ে বড় পতনের কারণে ২০২৬ সালে শত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন হত্যার হার দেখা যেতে পারে।