যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সৌদি আরবের পরমাণু সহযোগিতা নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় নতুন করে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। সৌদি আরবকে নিজ ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সুযোগ দেওয়ার সম্ভাবনা সামনে আসার পর সিউলের প্রশ্ন, একই ধরনের অধিকার চাইলে দক্ষিণ কোরিয়াকে এতদিন কেন বাধা দেওয়া হয়েছে?
দক্ষিণ কোরিয়া কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র। দেশটি বিশ্বের অন্যতম বড় বেসামরিক পারমাণবিক শক্তি হিসেবে গড়ে উঠলেও নিজস্ব পারমাণবিক জ্বালানির জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের অনুমতির ওপর নির্ভরশীল।
দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে ক্ষোভ
সত্তরের দশকে দক্ষিণ কোরিয়া গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর চাপ প্রয়োগ করে। পরে দক্ষিণ কোরিয়া পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিতে যুক্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের আওতায় আসে। তারপরও নিজস্ব পারমাণবিক চুল্লির জ্বালানি তৈরির জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অনুমতি পায়নি দেশটি।
দক্ষিণ কোরিয়ার অসন্তোষ আরও বেড়েছে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র সক্ষমতা বৃদ্ধির কারণে। একদিকে উত্তর কোরিয়া ক্রমেই শক্তিশালী পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার গড়ে তুলছে, অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়াকে নিজস্ব জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
সৌদি আরবের জন্য নতুন সুযোগ কেন?
যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের সাম্প্রতিক সমঝোতায় সৌদি ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যদিও এর বাস্তবায়ন নিয়ে এখনও কিছু শর্ত ও অনিশ্চয়তা রয়েছে, তবু বিষয়টি দক্ষিণ কোরিয়ায় গভীর আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সিউল মনে করছে, সৌদি আরবকে যদি এমন সুবিধা দেওয়া হয়, তাহলে দক্ষিণ কোরিয়ার দীর্ঘদিনের দাবিও নতুন গুরুত্ব পাওয়ার কথা। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সরাসরি চুক্তিটি নিয়ে মন্তব্য না করলেও যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক জ্বালানি নীতির পরিবর্তন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানিয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার চাহিদা কী
দক্ষিণ কোরিয়া মূলত নিজস্ব পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সক্ষমতা চায়। একই সঙ্গে ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করার সুযোগও চায় দেশটি।
দেশটিতে ইতোমধ্যে ২৬টি পারমাণবিক চুল্লি চালু রয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও চুল্লি নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বিদ্যুতের বাড়তে থাকা চাহিদার কারণে পারমাণবিক শক্তির ওপর দেশটির নির্ভরতা আরও বাড়তে পারে।
ব্যবহৃত জ্বালানি সংরক্ষণও দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য বড় সমস্যা। ঘনবসতিপূর্ণ দেশে পারমাণবিক বর্জ্য রাখার জায়গা নিয়ে পরিবেশগত ও রাজনৈতিক চাপ রয়েছে। পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা চালু হলে এই চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব বলে মনে করছে সিউল।
পারমাণবিক সাবমেরিন নিয়েও আলোচনা
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার আলোচনায় পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিনও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দক্ষিণ কোরিয়া আগামী এক দশকের মধ্যে নিজস্ব পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন চালুর লক্ষ্য নিয়েছে।
এ ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যাতে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের আশঙ্কা কম থাকে। তবে সাবমেরিনের জ্বালানি কোথা থেকে এবং কীভাবে সরবরাহ হবে, আর দক্ষিণ কোরিয়া নিজ ভূখণ্ডে সমৃদ্ধকরণ বা পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ স্থাপনা পরিচালনা করতে পারবে কি না—এসব প্রশ্ন এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি।
বাড়ছে ‘নিজস্ব পারমাণবিক সক্ষমতা’র আলোচনা
যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ওপর দক্ষিণ কোরিয়ার দীর্ঘদিনের নির্ভরতা থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটির রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ মানুষের একাংশের মধ্যে নিজস্ব পারমাণবিক প্রতিরোধ সক্ষমতা গড়ে তোলার আলোচনা বেড়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার বারবার বলেছে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে যেতে চায় না। কিন্তু উত্তর কোরিয়ার ক্রমবর্ধমান পারমাণবিক হুমকি এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে সম্ভাব্য পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগের কারণে পরিস্থিতি বদলাচ্ছে।
বিশেষ করে ওয়াশিংটন যদি মিত্রদের সঙ্গে নিরাপত্তা ও কৌশলগত বিষয়ে আগের তুলনায় বেশি লেনদেনভিত্তিক অবস্থান নেয়, তাহলে দক্ষিণ কোরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক নিরাপত্তা ছাতার ওপর আস্থা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠতে পারে।
সাত দশকের জোটে নতুন চাপ
দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক প্রায় সাত দশকের পুরোনো। কিন্তু পারমাণবিক জ্বালানি সমৃদ্ধকরণের অধিকার নিয়ে সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সমঝোতা সেই সম্পর্কের ভেতরে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
সিউল এখন চাইছে, ওয়াশিংটন তাদের সঙ্গে আলোচনায় শুধু রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি না দিয়ে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও ব্যবহৃত জ্বালানি পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের বিষয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত দিক।
সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক সমঝোতা শেষ পর্যন্ত কীভাবে বাস্তবায়িত হয়, সেটিই এখন দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ এর ওপর নির্ভর করতে পারে সিউল-ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের পারমাণবিক সহযোগিতার ভবিষ্যৎ এবং দুই দেশের কৌশলগত আস্থার সম্পর্ক।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















