যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে সুপারমার্কেটের সামনে গাড়ির ধাক্কায় ৮২ বছর বয়সী এক নারী নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় ভেনেজুয়েলার এক নাগরিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে অবস্থান করছিলেন বলে পুলিশের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। নিহত নারীর পরিবার এখন ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তির জবাবদিহি ও বিচার দাবি করছে।
গত ১৭ মে পানামা সিটি বিচ এলাকায় একটি সুপারমার্কেটের সামনে গাড়ি পার্কিংয়ের স্থান দিয়ে নিজের গাড়ির দিকে যাচ্ছিলেন ডেবোরা মারফি। রাস্তা পার হওয়ার নির্ধারিত স্থানে থাকা অবস্থায় একটি গাড়ি তাকে ধাক্কা দেয়। ধাক্কায় তিনি মাটিতে পড়ে গেলেও গাড়িটি পেছনের দিকে চলতে থাকে এবং তার ওপর দিয়ে চলে যায় বলে তদন্ত নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
হাসপাতালে নেওয়ার পর মৃত্যু
দুর্ঘটনার পর মারফিকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। তবে গুরুতর আঘাতের কারণে পরে তার মৃত্যু হয়। পরিবারের কাছে তিনি শুধু একজন মা বা দাদি ছিলেন না, বরং একজন প্রাণবন্ত মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন, যিনি পরিবার ও আশপাশের মানুষের জীবনে গভীর প্রভাব রেখেছিলেন।
ঘটনার সময় গাড়িটি চালাচ্ছিলেন ২৬ বছর বয়সী কার্লোস সুয়ারেজ-কনত্রেরাস। তার সঙ্গে সামনের আসনে ছিলেন ২৯ বছর বয়সী লুইস সানাব্রিয়া। পুলিশের নথি অনুযায়ী, দুজনেই ভেনেজুয়েলায় জন্মগ্রহণ করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রে তাদের বৈধ অভিবাসন অবস্থান ছিল না।
চালকের বিরুদ্ধে মামলা
সুয়arez-কনত্রেরাসের বিরুদ্ধে বাতিল হওয়া চালকের অনুমতিপত্র নিয়ে গাড়ি চালানো এবং এর ফলে একজনের মৃত্যু ঘটানোর অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগটি তৃতীয় মাত্রার গুরুতর অপরাধ হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে। তিনি আদালতে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন।
তদন্ত নথিতে বলা হয়েছে, দুর্ঘটনার পর তার দেওয়া কিছু বক্তব্য পুলিশের কাছে সন্দেহজনক মনে হয়েছিল। তার জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের চালকের অনুমতিপত্র বাতিল করা হয়েছিল বলেও নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
অন্যদিকে, গাড়ির সামনের আসনে থাকা সানাব্রিয়া দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থল থেকে হেঁটে চলে যান। পরে পুলিশের অনুরোধে তিনি আবার সেখানে ফিরে আসেন। তার ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল বলে তদন্তে জানা যায়। পরে তাকে অভিবাসন কর্তৃপক্ষের হেফাজতে দেওয়া হয়।

পরিবার চায় জবাবদিহি
মারফির যমজ দুই মেয়ে জানিয়েছেন, তাদের মা ছিলেন অসাধারণ একজন বন্ধু, শিক্ষক, মা ও দাদি। তার জীবনে আরও অনেক স্মৃতি তৈরি হওয়ার কথা ছিল বলেও তারা আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন।
পরিবারের ভাষ্য, মারফি ছিলেন প্রাণবন্ত ও আলোকিত একজন মানুষ। তার রেখে যাওয়া স্মৃতি ও জীবনদর্শন এখন পরিবারের কাছে আরও মূল্যবান হয়ে উঠেছে।
মারফির এক নাতি পরিবারের সদস্যদের জন্য তার জীবনের বিভিন্ন ভাবনা ও স্মৃতির একটি সংকলন তৈরি করেছেন। সেখানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ভালো মানুষ রেখে যাওয়াকেই জীবনের অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে দেখেছিলেন মারফি।
যুক্তরাষ্ট্রে পথচারী মৃত্যুর উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্রে পথচারী দুর্ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ দীর্ঘদিনের। গাড়ি পেছনে নেওয়ার সময় চালকের পেছনের দিক ভালোভাবে না দেখা পার্কিং এলাকায় পথচারী দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
২০২৪ সালে দেশটিতে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজারের বেশি পথচারী নিহত হন এবং ৭১ হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হন। একই বছরে ফ্লোরিডায় পথচারী-সম্পর্কিত ১০ হাজারের বেশি দুর্ঘটনা ঘটে এবং এসব ঘটনায় শত শত মানুষের মৃত্যু হয়।
মারফির মৃত্যুর ঘটনায় আগামী ১৭ আগস্ট ফ্লোরিডার বে কাউন্টি আদালতে অভিযুক্ত সুয়ারেজ-কনত্রেরাসের আদালত কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। তার আইনজীবী অবশ্য দাবি করেছেন, অভিযোগের আওতাধীন কোনো অপরাধ তার মক্কেল করেননি এবং ঘটনাটি একটি দুঃখজনক দুর্ঘটনা, অপরাধমূলক ঘটনা নয়।
মারফির পরিবার অবশ্য বলছে, তারা ঘটনার পূর্ণ জবাবদিহি নিশ্চিত করতে চায় এবং তাদের প্রিয় মানুষটির মৃত্যুর জন্য ন্যায়বিচার দেখতে চায়।
ফ্লোরিডার সুপারমার্কেটের সামনে গাড়িচাপায় ৮২ বছরের ডেবোরা মারফির মৃত্যু এবং এ ঘটনায় এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলার ঘটনা আবারও পার্কিং এলাকায় পথচারীদের নিরাপত্তা ও দায়িত্বশীলভাবে গাড়ি চালানোর গুরুত্ব সামনে এনেছে।
মারফির পরিবার এখন অপেক্ষা করছে আদালতের সিদ্ধান্তের জন্য—যাতে তাদের মায়ের মৃত্যুর ঘটনায় প্রকৃত দায় নির্ধারিত হয় এবং তারা ন্যায়বিচার পান।
মারফির মৃত্যুর ঘটনায় গাড়িচালকের বিরুদ্ধে মামলা, অভিবাসন অবস্থান এবং পরিবারের বিচার দাবিকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে যুক্তরাষ্ট্রে সড়ক নিরাপত্তা ও অভিবাসন আইন প্রয়োগের বিষয়টিও।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















