যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত শত শত আফগান অভিবাসীর সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার উদ্যোগ ঘিরে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অভিবাসী অধিকারকর্মীদের আশঙ্কা, কল্যাণ ও সহায়তার প্রয়োজন বোঝার কথা বলে সংগ্রহ করা এসব ব্যক্তিগত তথ্য ভবিষ্যতে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ কিংবা বহিষ্কারের কাজে ব্যবহার হতে পারে।
৮০০ আফগান পরিবারের তথ্য নেওয়ার উদ্যোগ
যুক্তরাষ্ট্রের শরণার্থী পুনর্বাসন দপ্তর প্রায় ৮০০ আফগান অভিবাসীর সঙ্গে ফোনে কথা বলার উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো অভ্যন্তরীণ এক বার্তায় স্বেচ্ছাসেবকদের এসব পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের আহ্বান জানানো হয়েছে।
এই উদ্যোগে পরিবারগুলোর সদস্যদের নাম, পেশা, কোন ভাষায় কথা বলেন এবং অভিবাসনসংক্রান্ত অবস্থার মতো বিস্তারিত তথ্য নেওয়া হবে। আগামী ৭ আগস্ট পর্যন্ত এই যোগাযোগ কার্যক্রম চলার কথা রয়েছে। প্রতিটি ফোনালাপে প্রায় ৩০ মিনিট সময় লাগতে পারে।
সরকারি পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, আফগান পরিবারগুলোর সাধারণ সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা এবং তাদের আরও সহায়তা বা প্রয়োজনীয় সম্পদ দরকার কি না, তা বোঝাই এই তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্য।
তথ্য গোপন না থাকার বিষয়েই সবচেয়ে বেশি ভয়
তবে উদ্বেগের জায়গাটি তৈরি হয়েছে প্রশ্নপত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্তকে ঘিরে। এতে স্পষ্ট করা হয়েছে, সাক্ষাৎকারটি বেনামি নয় এবং সংগৃহীত তথ্য ১৫ বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করা হতে পারে।
অংশগ্রহণকারীদের জানানো হচ্ছে, চাইলে তারা কোনো প্রশ্নের উত্তর না-ও দিতে পারেন। তাদের যুক্তরাষ্ট্রের জীবনে মানিয়ে নেওয়ার অভিজ্ঞতা, পরিবারে থাকা সদস্যদের অবস্থা এবং কী ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন—এসব বিষয়েও প্রশ্ন করা হবে।
পরিবারের কোনো সদস্যের অভিবাসনগত অবস্থার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে সরকারি সুবিধা পাওয়ার যোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য সরকারি নথিতে থাকা পরিচিতি নম্বরও চাওয়া হতে পারে।
অভিবাসন নীতির পরিবর্তনে আতঙ্ক
সারাক্ষণ রিপোর্টের প্রতিবেদনে জানা যায়, আফগানদের নিয়ে এই উদ্যোগের সময়কালই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে আফগান অভিবাসন নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
২০২১ সালে তালেবান আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র বহু আফগানকে সরিয়ে নেয়। তাদের মধ্যে মার্কিন বাহিনীকে সহযোগিতা করা ব্যক্তি ও পরিবারও ছিলেন। সেই সময় দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়া আফগানদের পুনর্বাসনে বড় ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু পরবর্তী সময়ে নীতিতে পরিবর্তন আসে। আফগানিস্তান থেকে অভিবাসী ও অ-অভিবাসী ভিসা দেওয়ার কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে সাময়িকভাবে বসবাস ও কাজের অনুমতি পাওয়া কয়েক হাজার আফগানের সেই সুরক্ষা বাতিল করা হয়।
ফলে দেশটিতে থাকা অনেক আফগানের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
‘কল্যাণের তথ্য’ নাকি ভবিষ্যৎ বহিষ্কারের পথ?
শরণার্থী সহায়তা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে মূল প্রশ্নটি এখন এটাই—সরকার সত্যিই যদি আফগান পরিবারগুলোর সমস্যা জানতে চায়, তাহলে এত বিস্তারিত অভিবাসন তথ্য সংগ্রহের প্রয়োজন কেন?
অভিবাসী সহায়তাকারীদের আশঙ্কা, সরকারের হাতে এসব তথ্য চলে গেলে ভবিষ্যতে তা অভিবাসন আইন প্রয়োগের কাজে ব্যবহার করা হতে পারে। বিশেষ করে যাদের স্থায়ী বসবাসের অনুমতি নেই, তাদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি বলে মনে করছেন তারা।
সারাক্ষণ রিপোর্টের প্রতিবেদনে আরও জানা যায়, সরকারের ভেতরেও কিছু কর্মকর্তার মধ্যে তথ্য সংগ্রহের সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের একজন দাবি করেছেন। তার আশঙ্কা, ভবিষ্যতে এসব তথ্য ব্যবহার করে আফগানদের বহিষ্কারের পথ তৈরি হতে পারে।
পরিবারগুলোর আস্থা হারানোর আশঙ্কা
শরণার্থী সহায়তা সংগঠনগুলোর মতে, আফগানরা বর্তমানে এমনিতেই অত্যন্ত অনিশ্চিত অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। অনেকের পরিবারের সদস্য এখনো আফগানিস্তানে আটকে আছেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে তাদের নিজেদের বৈধ অবস্থাও অনেক ক্ষেত্রে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সরকারি কোনো উদ্যোগে ব্যক্তিগত তথ্য দিতে গিয়ে তারা ভয় পেলে সেটি সরকারের সঙ্গে তাদের আস্থার সম্পর্ককে আরও দুর্বল করতে পারে।
অভিবাসী সহায়তাকারীদের বক্তব্য, পরিবারগুলোর কল্যাণ জানতে চাইলে সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তা দেওয়া সম্ভব। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় এমন তথ্য সংগ্রহ করা হলে, যা পরে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত হতে পারে বলে মানুষ আশঙ্কা করে, তাহলে প্রকৃত প্রয়োজনের মানুষও সরকারের সঙ্গে কথা বলতে অনিচ্ছুক হয়ে পড়বেন।
আফগানদের জন্য সংকট আরও গভীর
যুক্তরাষ্ট্রে আফগানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের পেছনে সাম্প্রতিক কয়েকটি সিদ্ধান্তও বড় ভূমিকা রাখছে। একপর্যায়ে দেশটির প্রশাসন আফগানদের বেশ কিছু অভিবাসন আবেদন প্রক্রিয়াকরণও স্থগিত করে।
এ অবস্থায় নতুন করে পরিবারগুলোর সদস্যসংখ্যা, অভিবাসন অবস্থা, পেশা ও ব্যক্তিগত পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ অনেকের কাছেই স্বাভাবিক কল্যাণমূলক কর্মসূচির চেয়ে বেশি কিছু বলে মনে হচ্ছে।
সরকারি উদ্যোগের ঘোষিত লক্ষ্য যদি সত্যিই আফগান পরিবারগুলোর সমস্যা বোঝা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হয়, তাহলে সেই উদ্দেশ্য কতটা বাস্তবে প্রতিফলিত হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলোর জন্য তাই তথ্য সংগ্রহের এই উদ্যোগ শুধু একটি সরকারি জরিপ নয়; বরং তাদের নিরাপত্তা, বৈধ অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
আফগান অভিবাসীদের তথ্য সংগ্রহ ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রে উদ্বেগ বাড়ছে; কল্যাণের নামে নেওয়া ব্যক্তিগত তথ্য ভবিষ্যতে বহিষ্কারে ব্যবহারের আশঙ্কা করছেন অধিকারকর্মীরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















