১১:৫৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
পাকিস্তানে পেট্রোল ভর্তুকিতে ৩০০ বিলিয়ন রুপি ব্যয়, লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা নিয়ে প্রশ্ন পটিয়ায় কক্সবাজার এক্সপ্রেসের বগি লাইনচ্যুত, ঢাকা-চট্টগ্রামের সঙ্গে রেল যোগাযোগ বন্ধ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বাসভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব, দূরপাল্লায় ২০ পয়সা ও শহরে ১৮ পয়সা তৃতীয় দেশে নির্বাসন: পানামায় পাঠানো ইরানি খ্রিষ্টানের অনিশ্চিত জীবন জার্মানিতে ডানপন্থার উত্থানের জ্বালানি: হারিয়ে যাওয়া গৌরবের নস্টালজিয়া জিন্নাহর প্রতিকৃতি সরানোয় তাইয়েবকে হুমকির অভিযোগ, তদন্তের দাবি এডিপি বাস্তবায়নে পাঁচ বছরের সর্বনিম্ন হার, দুই মাসে অগ্রগতি মাত্র ১.৮৫ শতাংশ ডেঙ্গুতে আরও ৬ মৃত্যু, ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি ১,৬৫৫ বাংলাদেশকে পাকিস্তানের ছকে দেখলে ভারতেরই কৌশলগত ক্ষতি নাক থেকে অন্ত্র—শরীরের অদৃশ্য প্রতিরক্ষা দেয়াল, কীভাবে কাজ করে মিউকোসাল ইমিউন সিস্টেম?

জলবায়ু পরিবর্তনে কফি বিলুপ্তির শঙ্কা, হারিয়ে যাওয়া এক উদ্ভিদেই আশার আলো

কফির ভবিষ্যৎ কি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হুমকির মুখে? তাপমাত্রা বৃদ্ধি, খরা, অনিয়মিত বৃষ্টি, বন্যা ও তুষারপাতের মতো চরম আবহাওয়া ইতোমধ্যেই বিশ্বের কফি উৎপাদনে বড় চাপ তৈরি করেছে। তবে এই সংকটের মধ্যেও আশার আলো খুঁজছেন উদ্ভিদবিজ্ঞানী অ্যারন ডেভিস। তাঁর বিশ্বাস, বহু বছর হারিয়ে থাকা একটি বুনো কফি প্রজাতি ভবিষ্যতের কফি শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে পারে।

কফি চাষে বাড়ছে জলবায়ুর চাপ

বিশ্বে বড় পরিসরে প্রধানত আরাবিকা ও রোবাস্তা—এই দুই ধরনের কফি চাষ হয়। এর মধ্যে আরাবিকা স্বাদে জনপ্রিয় হলেও বেশি তাপমাত্রার প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। তাপমাত্রা বাড়তে থাকায় বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে কফি চাষের উপযোগী জমি কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ইথিওপিয়ায়, যাকে আরাবিকার জন্মভূমি বলা হয়, বৃষ্টির সময় বদলে যাওয়ায় ফুল ফোটার পর পরাগায়ন ব্যাহত হচ্ছে। কলম্বিয়ায় অতিরিক্ত গরমের কারণে কৃষকেরা ঠান্ডা আবহাওয়ার খোঁজে পাহাড়ের আরও উঁচু এলাকায় চলে যাচ্ছেন। ব্রাজিলেও খরা ও তীব্র শীতের কারণে কয়েক বছরে বিপুল পরিমাণ কফি নষ্ট হয়েছে।

এক গবেষণায় আশঙ্কা করা হয়েছিল, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক কফি উৎপাদন এলাকা চাষের অনুপযোগী হয়ে যেতে পারে।

হারিয়ে যাওয়া কফির খোঁজে ডেভিস

এই সংকট মোকাবিলায় নতুন ধরনের কফি উদ্ভিদের সন্ধানে নেমেছেন যুক্তরাজ্যের কিউ রয়্যাল বোটানিক গার্ডেনের উদ্ভিদবিজ্ঞানী অ্যারন ডেভিস। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের বুনো কফি প্রজাতি খুঁজে বেড়াচ্ছেন।

কয়েক বছর আগে তাঁর নজর পড়ে স্টেনোফাইলা নামের একটি বিরল কফি প্রজাতির দিকে। এই উদ্ভিদ একসময় পশ্চিম আফ্রিকার সিয়েরা লিওনে চাষ করা হতো। কিন্তু গত শতকের মাঝামাঝি সময়ের পর এটি প্রায় হারিয়ে যায়।

ডেভিসের কাছে কিউয়ের বিশাল উদ্ভিদ সংগ্রহশালায় সংরক্ষিত পুরোনো নমুনা ছিল। সেই নমুনা এবং ঐতিহাসিক নথি বিশ্লেষণ করে তিনি ধারণা করেন, সিয়েরা লিওনের কোথাও হয়তো উদ্ভিদটি এখনো টিকে আছে।

২০১৮ সালে মিলল জীবিত স্টেনোফাইলা

দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর ২০১৮ সালে ডেভিস ও তাঁর সহকর্মীরা সিয়েরা লিওনে জীবিত স্টেনোফাইলা উদ্ভিদের সন্ধান পান। পরে কেনেমার আশপাশের বনাঞ্চলে তাঁরা কয়েকটি পরিণত গাছও খুঁজে পান।

২০২০ সালের দিকে সেই গাছে কালচে ফল দেখা যায়। সেখান থেকে সংগ্রহ করা বীজ পাঠানো হয় যুক্তরাজ্যে। এরপর শুরু হয় এর স্বাদ ও সম্ভাবনা যাচাইয়ের কাজ।

পরীক্ষায় দেখা যায়, স্টেনোফাইলার কফিতে মিষ্টতা, মসৃণতা ও কোমল স্বাদের বৈশিষ্ট্য রয়েছে। প্রশিক্ষিত স্বাদ পরীক্ষকদের একটি দলকে দিয়ে করা পরীক্ষাতেও অনেকেই এটিকে আরাবিকা থেকে আলাদা করতে পারেননি।

ডেভিসের কাছে বিষয়টি ছিল বড় সাফল্য। কারণ স্টেনোফাইলা শুধু উষ্ণ ও অপেক্ষাকৃত শুষ্ক পরিবেশে টিকে থাকতে পারে না, এর স্বাদও উচ্চমানের কফির কাছাকাছি।

জলবায়ু সহনশীল কফিই হতে পারে ভবিষ্যৎ

ডেভিসের গবেষণার মূল লক্ষ্য শুধু নতুন একটি কফি প্রজাতি আবিষ্কার করা নয়। তিনি এমন উদ্ভিদ খুঁজছেন, যেগুলোর মধ্যে তাপ সহনশীলতা, খরা সহ্য করার ক্ষমতা কিংবা রোগ প্রতিরোধের মতো বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

তাঁর মতে, বুনো কফির জিনগত বৈশিষ্ট্য ভবিষ্যতের কফি চাষে কাজে লাগানো গেলে জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা সামলানো সহজ হতে পারে।

তবে কাজটি সহজ নয়। বিশ্বের শতাধিক বুনো কফি প্রজাতির মধ্যে অনেকগুলোই বন উজাড়, জলবায়ু পরিবর্তন, রোগ ও পোকার আক্রমণের কারণে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। অর্থাৎ ভবিষ্যতের কফি রক্ষার জন্য শুধু নতুন প্রজাতি খুঁজে পাওয়াই যথেষ্ট নয়, সেগুলো সংরক্ষণ করাও জরুরি।

The maverick scientist trying to save coffee from extinction | The Economist

কফি কি বিলাসপণ্যে পরিণত হবে?

বিশ্বে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ কফি পান করা হয়। একই সময়ে চীনের মতো বড় বাজারে কফির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। ফলে উৎপাদন কমে গেলে চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান আরও বড় হতে পারে।

এর প্রভাব ইতোমধ্যে দামের ওপর পড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি শ্রম ও অন্যান্য উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বিভিন্ন দেশে কফির দাম বেড়েছে।

ডেভিসের আশঙ্কা, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী এক দশকের মধ্যে কফি সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের পানীয় না থেকে অনেকের কাছে বিলাসপণ্যে পরিণত হতে পারে।

কৃষকরাও পড়ছেন অনিশ্চয়তায়

কফি চাষ এমনিতেই ঝুঁকিপূর্ণ ও কম মুনাফার ব্যবসা। বিশ্বের কোটি কোটি কফি চাষির একটি বড় অংশ খুব কম আয় দিয়ে জীবন চালান। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উৎপাদন আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়লে অনেক কৃষক কফির বদলে কলা বা পামজাতীয় তুলনামূলক নির্ভরযোগ্য ফসলের দিকে ঝুঁকতে পারেন।

কেউ কেউ কফি চাষই ছেড়ে দিতে পারেন। এতে একদিকে কৃষকদের জীবিকা হুমকিতে পড়বে, অন্যদিকে বিশ্ববাজারে কফির সরবরাহও কমে যেতে পারে।

গবেষণায় বিনিয়োগই বড় প্রশ্ন

কফি শিল্পের আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো গবেষণা ও উন্নয়নে তুলনামূলক কম বিনিয়োগ। দীর্ঘমেয়াদে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় নতুন জাত, উন্নত চাষপদ্ধতি ও রোগ প্রতিরোধের প্রযুক্তি তৈরিতে বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন।

ডেভিসের কাজ তাই শুধু একটি হারিয়ে যাওয়া উদ্ভিদকে ফিরিয়ে আনার গল্প নয়। এটি দেখিয়ে দিচ্ছে, প্রকৃতির ভাণ্ডারে থাকা অজানা উদ্ভিদ ভবিষ্যতের খাদ্য ও কৃষি নিরাপত্তায় কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

কফির ভবিষ্যৎ হয়তো লুকিয়ে আছে বুনো বনে

সিয়েরা লিওনের বনাঞ্চলে খুঁজে পাওয়া স্টেনোফাইলা এখনো বিশ্বজুড়ে বড় পরিসরে উৎপাদনের পর্যায়ে যায়নি। এর চাষ কতটা লাভজনক হবে, বিভিন্ন পরিবেশে এটি কতটা ভালো ফলন দেবে এবং বড় বাজারের চাহিদা পূরণ করতে পারবে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো খোঁজা হচ্ছে।

তারপরও এই উদ্ভিদ নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের চাপে যখন প্রচলিত কফির জাতগুলো ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে, তখন হারিয়ে যাওয়া একটি বুনো প্রজাতি হয়তো কফির ভবিষ্যৎ রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

প্রকৃতির গভীরে লুকিয়ে থাকা এমন উদ্ভিদ খুঁজে বের করা এবং সংরক্ষণ করা তাই শুধু বিজ্ঞানীদের কাজ নয়; এটি ভবিষ্যৎ খাদ্যব্যবস্থা ও কৃষি অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ।

জলবায়ু পরিবর্তনে কফি উৎপাদন বড় সংকটে পড়লেও হারিয়ে যাওয়া স্টেনোফাইলা প্রজাতি ভবিষ্যতের জলবায়ু সহনশীল কফির নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

পাকিস্তানে পেট্রোল ভর্তুকিতে ৩০০ বিলিয়ন রুপি ব্যয়, লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা নিয়ে প্রশ্ন

জলবায়ু পরিবর্তনে কফি বিলুপ্তির শঙ্কা, হারিয়ে যাওয়া এক উদ্ভিদেই আশার আলো

০৮:১২:৪২ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬

কফির ভবিষ্যৎ কি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হুমকির মুখে? তাপমাত্রা বৃদ্ধি, খরা, অনিয়মিত বৃষ্টি, বন্যা ও তুষারপাতের মতো চরম আবহাওয়া ইতোমধ্যেই বিশ্বের কফি উৎপাদনে বড় চাপ তৈরি করেছে। তবে এই সংকটের মধ্যেও আশার আলো খুঁজছেন উদ্ভিদবিজ্ঞানী অ্যারন ডেভিস। তাঁর বিশ্বাস, বহু বছর হারিয়ে থাকা একটি বুনো কফি প্রজাতি ভবিষ্যতের কফি শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে পারে।

কফি চাষে বাড়ছে জলবায়ুর চাপ

বিশ্বে বড় পরিসরে প্রধানত আরাবিকা ও রোবাস্তা—এই দুই ধরনের কফি চাষ হয়। এর মধ্যে আরাবিকা স্বাদে জনপ্রিয় হলেও বেশি তাপমাত্রার প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। তাপমাত্রা বাড়তে থাকায় বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে কফি চাষের উপযোগী জমি কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ইথিওপিয়ায়, যাকে আরাবিকার জন্মভূমি বলা হয়, বৃষ্টির সময় বদলে যাওয়ায় ফুল ফোটার পর পরাগায়ন ব্যাহত হচ্ছে। কলম্বিয়ায় অতিরিক্ত গরমের কারণে কৃষকেরা ঠান্ডা আবহাওয়ার খোঁজে পাহাড়ের আরও উঁচু এলাকায় চলে যাচ্ছেন। ব্রাজিলেও খরা ও তীব্র শীতের কারণে কয়েক বছরে বিপুল পরিমাণ কফি নষ্ট হয়েছে।

এক গবেষণায় আশঙ্কা করা হয়েছিল, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক কফি উৎপাদন এলাকা চাষের অনুপযোগী হয়ে যেতে পারে।

হারিয়ে যাওয়া কফির খোঁজে ডেভিস

এই সংকট মোকাবিলায় নতুন ধরনের কফি উদ্ভিদের সন্ধানে নেমেছেন যুক্তরাজ্যের কিউ রয়্যাল বোটানিক গার্ডেনের উদ্ভিদবিজ্ঞানী অ্যারন ডেভিস। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের বুনো কফি প্রজাতি খুঁজে বেড়াচ্ছেন।

কয়েক বছর আগে তাঁর নজর পড়ে স্টেনোফাইলা নামের একটি বিরল কফি প্রজাতির দিকে। এই উদ্ভিদ একসময় পশ্চিম আফ্রিকার সিয়েরা লিওনে চাষ করা হতো। কিন্তু গত শতকের মাঝামাঝি সময়ের পর এটি প্রায় হারিয়ে যায়।

ডেভিসের কাছে কিউয়ের বিশাল উদ্ভিদ সংগ্রহশালায় সংরক্ষিত পুরোনো নমুনা ছিল। সেই নমুনা এবং ঐতিহাসিক নথি বিশ্লেষণ করে তিনি ধারণা করেন, সিয়েরা লিওনের কোথাও হয়তো উদ্ভিদটি এখনো টিকে আছে।

২০১৮ সালে মিলল জীবিত স্টেনোফাইলা

দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর ২০১৮ সালে ডেভিস ও তাঁর সহকর্মীরা সিয়েরা লিওনে জীবিত স্টেনোফাইলা উদ্ভিদের সন্ধান পান। পরে কেনেমার আশপাশের বনাঞ্চলে তাঁরা কয়েকটি পরিণত গাছও খুঁজে পান।

২০২০ সালের দিকে সেই গাছে কালচে ফল দেখা যায়। সেখান থেকে সংগ্রহ করা বীজ পাঠানো হয় যুক্তরাজ্যে। এরপর শুরু হয় এর স্বাদ ও সম্ভাবনা যাচাইয়ের কাজ।

পরীক্ষায় দেখা যায়, স্টেনোফাইলার কফিতে মিষ্টতা, মসৃণতা ও কোমল স্বাদের বৈশিষ্ট্য রয়েছে। প্রশিক্ষিত স্বাদ পরীক্ষকদের একটি দলকে দিয়ে করা পরীক্ষাতেও অনেকেই এটিকে আরাবিকা থেকে আলাদা করতে পারেননি।

ডেভিসের কাছে বিষয়টি ছিল বড় সাফল্য। কারণ স্টেনোফাইলা শুধু উষ্ণ ও অপেক্ষাকৃত শুষ্ক পরিবেশে টিকে থাকতে পারে না, এর স্বাদও উচ্চমানের কফির কাছাকাছি।

জলবায়ু সহনশীল কফিই হতে পারে ভবিষ্যৎ

ডেভিসের গবেষণার মূল লক্ষ্য শুধু নতুন একটি কফি প্রজাতি আবিষ্কার করা নয়। তিনি এমন উদ্ভিদ খুঁজছেন, যেগুলোর মধ্যে তাপ সহনশীলতা, খরা সহ্য করার ক্ষমতা কিংবা রোগ প্রতিরোধের মতো বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

তাঁর মতে, বুনো কফির জিনগত বৈশিষ্ট্য ভবিষ্যতের কফি চাষে কাজে লাগানো গেলে জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা সামলানো সহজ হতে পারে।

তবে কাজটি সহজ নয়। বিশ্বের শতাধিক বুনো কফি প্রজাতির মধ্যে অনেকগুলোই বন উজাড়, জলবায়ু পরিবর্তন, রোগ ও পোকার আক্রমণের কারণে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। অর্থাৎ ভবিষ্যতের কফি রক্ষার জন্য শুধু নতুন প্রজাতি খুঁজে পাওয়াই যথেষ্ট নয়, সেগুলো সংরক্ষণ করাও জরুরি।

The maverick scientist trying to save coffee from extinction | The Economist

কফি কি বিলাসপণ্যে পরিণত হবে?

বিশ্বে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ কফি পান করা হয়। একই সময়ে চীনের মতো বড় বাজারে কফির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। ফলে উৎপাদন কমে গেলে চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান আরও বড় হতে পারে।

এর প্রভাব ইতোমধ্যে দামের ওপর পড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি শ্রম ও অন্যান্য উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বিভিন্ন দেশে কফির দাম বেড়েছে।

ডেভিসের আশঙ্কা, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী এক দশকের মধ্যে কফি সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের পানীয় না থেকে অনেকের কাছে বিলাসপণ্যে পরিণত হতে পারে।

কৃষকরাও পড়ছেন অনিশ্চয়তায়

কফি চাষ এমনিতেই ঝুঁকিপূর্ণ ও কম মুনাফার ব্যবসা। বিশ্বের কোটি কোটি কফি চাষির একটি বড় অংশ খুব কম আয় দিয়ে জীবন চালান। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উৎপাদন আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়লে অনেক কৃষক কফির বদলে কলা বা পামজাতীয় তুলনামূলক নির্ভরযোগ্য ফসলের দিকে ঝুঁকতে পারেন।

কেউ কেউ কফি চাষই ছেড়ে দিতে পারেন। এতে একদিকে কৃষকদের জীবিকা হুমকিতে পড়বে, অন্যদিকে বিশ্ববাজারে কফির সরবরাহও কমে যেতে পারে।

গবেষণায় বিনিয়োগই বড় প্রশ্ন

কফি শিল্পের আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো গবেষণা ও উন্নয়নে তুলনামূলক কম বিনিয়োগ। দীর্ঘমেয়াদে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় নতুন জাত, উন্নত চাষপদ্ধতি ও রোগ প্রতিরোধের প্রযুক্তি তৈরিতে বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন।

ডেভিসের কাজ তাই শুধু একটি হারিয়ে যাওয়া উদ্ভিদকে ফিরিয়ে আনার গল্প নয়। এটি দেখিয়ে দিচ্ছে, প্রকৃতির ভাণ্ডারে থাকা অজানা উদ্ভিদ ভবিষ্যতের খাদ্য ও কৃষি নিরাপত্তায় কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

কফির ভবিষ্যৎ হয়তো লুকিয়ে আছে বুনো বনে

সিয়েরা লিওনের বনাঞ্চলে খুঁজে পাওয়া স্টেনোফাইলা এখনো বিশ্বজুড়ে বড় পরিসরে উৎপাদনের পর্যায়ে যায়নি। এর চাষ কতটা লাভজনক হবে, বিভিন্ন পরিবেশে এটি কতটা ভালো ফলন দেবে এবং বড় বাজারের চাহিদা পূরণ করতে পারবে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো খোঁজা হচ্ছে।

তারপরও এই উদ্ভিদ নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের চাপে যখন প্রচলিত কফির জাতগুলো ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে, তখন হারিয়ে যাওয়া একটি বুনো প্রজাতি হয়তো কফির ভবিষ্যৎ রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

প্রকৃতির গভীরে লুকিয়ে থাকা এমন উদ্ভিদ খুঁজে বের করা এবং সংরক্ষণ করা তাই শুধু বিজ্ঞানীদের কাজ নয়; এটি ভবিষ্যৎ খাদ্যব্যবস্থা ও কৃষি অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ।

জলবায়ু পরিবর্তনে কফি উৎপাদন বড় সংকটে পড়লেও হারিয়ে যাওয়া স্টেনোফাইলা প্রজাতি ভবিষ্যতের জলবায়ু সহনশীল কফির নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।