প্রযুক্তির দ্রুত উন্নতির সঙ্গে অনলাইন প্রতারণার ধরনও বদলে যাচ্ছে। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি করা হচ্ছে বিশ্বাসযোগ্য নকল ভিডিও, কণ্ঠস্বর ও পরিচয়। ফলে পরিচিত ব্যক্তি, সরকারি কর্মকর্তা কিংবা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তার কণ্ঠ ও চেহারা ব্যবহার করে মানুষকে সহজেই প্রতারণার ফাঁদে ফেলা সম্ভব হচ্ছে।
সিঙ্গাপুরের ৬৯ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত মার্টিন এনজি গত বছরের জুলাইয়ে মোবাইলে গান দেখার সময় এমনই একটি ভিডিও বিজ্ঞাপন দেখেছিলেন। সেখানে দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ নেতা লি সিয়েন লুংয়ের মতো দেখতে একজনকে আকর্ষণীয় ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিয়োগের প্রস্তাব দিতে দেখা যায়।
প্রথম দেখায় ভিডিওটি বেশ বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছিল। তবে কিছুক্ষণ পর এনজির সন্দেহ হয়। বিশেষ করে ভিডিওতে ব্যবহৃত কণ্ঠস্বর ছিল যান্ত্রিক এবং উচ্চারণে ছিল অস্বাভাবিকতা। তিনি বুঝতে পারেন, এটি সম্ভবত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি করা নকল ভিডিও।
এক বছরে আরও নিখুঁত হচ্ছে নকল ভিডিও
এনজির আশঙ্কা, প্রযুক্তির দ্রুত উন্নতির কারণে ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রতারণা শনাক্ত করা আরও কঠিন হবে। গত এক বছরে তিনি সরকারি কর্মকর্তাদের পরিচয় ব্যবহার করে তৈরি বেশ কিছু নকল ভিডিও দেখেছেন, যেগুলো আগের তুলনায় অনেক বেশি বাস্তবসম্মত বলে মনে হয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি বা পরিবর্তিত ছবি, ভিডিও ও অডিওকে সাধারণভাবে ডিপফেক বলা হয়। প্রতারকেরা এখন এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিচিত ব্যক্তির মুখ ও কণ্ঠস্বর নকল করছে। ফলে শুধু চোখে দেখা বা কানে শোনা তথ্যের ওপর নির্ভর করে সত্য-মিথ্যা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় প্রতারণার গতি ও পরিসর বাড়ছে
সারাক্ষণ রিপোর্ট: সাইবার অপরাধ নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সরঞ্জাম সহজলভ্য হয়ে যাওয়ায় প্রতারকেরা আগের চেয়ে দ্রুত, বড় পরিসরে এবং আরও নিখুঁতভাবে প্রতারণা চালাতে পারছে।
২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত একটি আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাইবার অপরাধীদের অনলাইন যোগাযোগমাধ্যমে ডিপফেক নিয়ে আলোচনা ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে প্রায় ৬০০ শতাংশ বেড়েছিল।
সিঙ্গাপুরে ২০২৫ সালে মোট ৩৭ হাজার ৩০৮টি প্রতারণার ঘটনা নথিভুক্ত হয়। এসব ঘটনায় ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৯১৩ দশমিক ১ মিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার। যদিও দেশটির পুলিশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা প্রতারণাকে আলাদা শ্রেণিতে হিসাব করে না।
শুধু মুখ বা কণ্ঠ নয়, পুরো পরিস্থিতি যাচাই জরুরি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ভিডিওতে কখনো মুখের অস্বাভাবিকতা, ঠোঁটের সঙ্গে কথার মিল না থাকা কিংবা কণ্ঠে যান্ত্রিক ভাবের মতো বিষয় চোখে পড়তে পারে। কিন্তু প্রযুক্তি আরও উন্নত হওয়ায় এসব লক্ষণ সব সময় থাকবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
তাই কোনো ভিডিও দেখে সেটি সত্য না মিথ্যা বোঝার চেষ্টা করার পাশাপাশি পুরো পরিস্থিতি যাচাই করা জরুরি। বিশেষ করে কোনো বিনিয়োগে অস্বাভাবিক বেশি বা নিশ্চিত লাভের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে কি না, ব্যক্তিগত বা ব্যাংক হিসাবের তথ্য চাওয়া হচ্ছে কি না কিংবা দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে কি না—এসব বিষয়কে সতর্কতার সংকেত হিসেবে দেখতে হবে।
বিশ্বাস অর্জন করেই ফাঁদে ফেলছে প্রতারকেরা
প্রতারকেরা শুধু নকল ভিডিও ব্যবহার করছে না। পরিচিতি, কর্তৃত্ব ও বিশ্বাসযোগ্যতার আবহ তৈরি করেও তারা মানুষকে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করছে।
২০২৫ সালের মার্চে সিঙ্গাপুরে এমন একটি ঘটনায় একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের অর্থ বিভাগের একজন পরিচালক প্রায় ৫ লাখ মার্কিন ডলার হারাতে বসেছিলেন। তিনি মনে করেছিলেন, প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা ও কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে তিনি ভিডিও বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন।
কিন্তু বাস্তবে বৈঠকে থাকা ব্যক্তিদের পরিচয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে নকল করা হয়েছিল। ওই পরিচালককে প্রতিষ্ঠানের হিসাব থেকে বিপুল অর্থ অন্য একটি করপোরেট ব্যাংক হিসাবে পাঠাতে বলা হয়। তিনি তা করেনও। পরে আরও বড় অঙ্কের অর্থ পাঠানোর নির্দেশ পেয়ে তার সন্দেহ হয়।
পরবর্তীতে ব্যাংককে বিষয়টি জানানো হলে প্রতারণার ঘটনা ধরা পড়ে। পাঠানো অর্থের একটি অংশ হংকংয়ের ব্যাংক হিসাবে চলে গেলেও দুই দেশের কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় তা উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
তাড়াহুড়ো করানোই বড় অস্ত্র
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতারকেরা প্রথমে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর বিশ্বাস তৈরি করে। এরপর জরুরি পরিস্থিতির কথা বলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে চাপ দেয়। এতে ভুক্তভোগীর যাচাই করার সুযোগ কমে যায়।
তাই অনলাইনে কোনো ভিডিও, ফোনকল, বার্তা বা বৈঠকে পরিচিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করা হলেও সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বাস না করে থামা, যাচাই করা এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি যোগাযোগ করা জরুরি।
এনজির সহজ সতর্কতার নিয়ম
ডিপফেক ভিডিও দেখার পর মার্টিন এনজি এখন অনলাইনে পাওয়া তথ্য আরও সতর্কভাবে যাচাই করেন। সরকারি বাজেটসংক্রান্ত ভিডিও দেখার পরও তিনি সরাসরি বিশ্বাস না করে সরকারি ওয়েবসাইটের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছেন।
তার অনুসরণ করা সহজ নিয়ম হলো—অনলাইনে পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরকারি ওয়েবসাইটে মিলিয়ে দেখা এবং প্রয়োজনে পরিবারের বিশ্বস্ত সদস্যের সঙ্গে আলোচনা করা।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যত উন্নত হচ্ছে, প্রতারণার চেহারাও তত নিখুঁত হচ্ছে। তাই এখন শুধু চোখ-কান দিয়ে সত্য যাচাই করাই যথেষ্ট নয়। অনলাইনে কোনো তথ্য যত বিশ্বাসযোগ্যই মনে হোক, অর্থ, ব্যক্তিগত তথ্য বা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে একবার থেমে যাচাই করাই হতে পারে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















