সিঙ্গাপুরে অবসরজীবনের জন্য ছোট ফ্ল্যাট বেছে নেওয়া বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। তবে ছোট ঘর মানেই সাদামাটা জীবন—এমন ধারণা বদলে দিচ্ছেন অনেকেই। দুই কক্ষের ছোট ফ্ল্যাটকে নিজের স্বপ্নের বাড়িতে পরিণত করতে কেউ কেউ খরচ করছেন কয়েক লাখ টাকা।
৪৭ বর্গমিটারের ঘরে প্রায় ৭০ হাজার ডলারের সাজসজ্জা
৭৫ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত আইভি লিম ২০২৫ সালে সিঙ্গাপুরের পাসির রিস এলাকায় ৩০ বছরের জন্য দুই কক্ষের একটি ছোট ফ্ল্যাট নেন। ফ্ল্যাটটির জন্য তিনি ব্যয় করেন ৯৭ হাজার ৭৩১ সিঙ্গাপুর ডলার। এরপর ঘর সাজাতেই খরচ করেন আরও ৭০ হাজার ১২৬ ডলার।
মাত্র ৪৭ বর্গমিটার বা প্রায় ৫০৫ বর্গফুটের সেই ঘরকে তিনি সাজিয়েছেন ভূমধ্যসাগরীয় নকশায়। নরম খিলান, উষ্ণ আলো ও সাজানো সিঁড়ির আদলে তৈরি কাঠামোতে ছোট ফ্ল্যাটটি এখন অনেকটা অভিজাত অবকাশযাপনের বাড়ির মতো।
লিমের কাছে এই ব্যয় অপচয় নয়। তার মতে, বয়স বাড়লেই পুরোনো ধাঁচের ঘরে থাকতে হবে—এমন কোনো কথা নেই। জীবনের এই সময়টুকুও আনন্দ ও স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে কাটাতে চান তিনি।
ছোট ঘর, কিন্তু স্বপ্ন বড়
লিম একা নন। সিঙ্গাপুরে দুই কক্ষের ফ্ল্যাটে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে সংস্কার করার প্রবণতা বাড়ছে। অনলাইনে দেখা আকর্ষণীয় ছোট বাড়ির নকশা অনেক প্রবীণকে নিজেদের ঘর নতুনভাবে সাজাতে উৎসাহিত করছে।
আগে দুই কক্ষের একটি ফ্ল্যাট সাধারণভাবে সাজাতে প্রায় ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার সিঙ্গাপুর ডলার খরচ হতো। এখন শৌচাগার, মেঝে, দেয়াল, সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও আসবাবের বড় ধরনের পরিবর্তন করলে ব্যয় সহজেই ৫০ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
অনেকের চাহিদা এখন আরও স্পষ্ট—ছোট ফ্ল্যাট হলেও দেখতে যেন বড় আবাসিক ভবনের বিলাসবহুল ঘরের মতো হয়। এ ধরনের সংস্কারে অনেকেই ৩০ হাজার থেকে ৬০ হাজার ডলার পর্যন্ত খরচ করছেন। বড় প্রকল্পগুলোর ব্যয় ৪৫ হাজার থেকে ৮০ হাজার ডলার পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে।
বড় বাড়ি ছেড়ে ছোট ঘরে স্বস্তি
এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে জীবনের বাস্তব প্রয়োজনও। সন্তানরা বড় হয়ে আলাদা হয়ে যাওয়ার পর অনেক প্রবীণের বড় বাড়ির অতিরিক্ত কক্ষ আর প্রয়োজন হয় না। বরং বিশাল বাড়ি পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ করাই হয়ে ওঠে বাড়তি ঝামেলা।
লিমের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। আগে তিনি মায়ের সঙ্গে বড় একটি ফ্ল্যাটে থাকতেন। মা মারা যাওয়ার পর বাড়ির অনেক কক্ষই প্রায় অব্যবহৃত পড়ে থাকত। ফলে ছোট ঘরে চলে আসার পর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও দৈনন্দিন দেখভাল অনেক সহজ হয়েছে।
এখন তার নতুন ঘরটি জীবনের এই পর্যায়ের জন্য যথেষ্ট। এমনকি বিছানায় শুয়েই সমুদ্র দেখা যায়—যা তার কাছে বাড়তি আনন্দ।
৫৩ হাজার ডলারে জ্যাজের আবহ
৬৩ বছর বয়সী সেবাস্তিয়ানও বড় বাড়ি ছেড়ে দুই কক্ষের ফ্ল্যাটে উঠেছেন। আগের চার কক্ষের বাড়িতে সন্তানরা বড় হয়ে আলাদা হয়ে যাওয়ার পর একা থাকার জন্য ছোট ঘরকেই উপযুক্ত মনে করেন তিনি।
৪৫ বছরের জন্য ফ্ল্যাটটি নিতে তার খরচ হয়েছে ১ লাখ ৪৭ হাজার ডলার। ঘর সাজাতে আরও ব্যয় করেছেন ৫৩ হাজার ডলার।
তার ইচ্ছা ছিল একেবারে সাধারণ ঘর নয়, বরং জ্যাজ সংগীতের আবহে কিছুটা অভিজাত ও মানসম্মত পরিবেশ তৈরি করা। কাঠের বিকল্প মেঝে ও পরিকল্পিত আলোর ব্যবহারে ঘরটি এখন অনেকটা হোটেলের কক্ষের মতো। ছোট হওয়ায় রক্ষণাবেক্ষণ সহজ হলেও আগের মতো অনেক অতিথিকে একসঙ্গে আপ্যায়ন করা যায় না—এটাই তার একমাত্র অসুবিধা।
বড় ফ্ল্যাট বিক্রি করে আধুনিক ছোট ঘর
৬৩ বছর বয়সী ক্রিস্টিন অ্যাংয়ের গল্পও ভিন্ন নয়। রেডহিল এলাকার পাঁচ কক্ষের ফ্ল্যাট বিক্রি করে তিনি টেংগাহ এলাকায় দুই কক্ষের একটি ফ্ল্যাট নেন। প্রায় ৫০০ বর্গফুটের এই ঘরে তিনি ৯৯ বছরের মালিকানা সুবিধার জন্য ১ লাখ ৯৮ হাজার ডলার ব্যয় করেন।
মায়ের সঙ্গে থাকার জন্য তিনি ঘরটিকে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করে সাজিয়েছেন। সংস্কারে ব্যয় করেছেন আরও ৮০ হাজার ডলার এবং গৃহস্থালির সরঞ্জাম ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসে ২০ হাজার ডলার।
মুঠোফোনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যায় এমন আলো ও সুইচ, স্বয়ংক্রিয় পর্দা এবং পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকি আসবাবের নিচে চাকা রাখা হয়েছে, যাতে প্রয়োজন অনুযায়ী ঘরের বিন্যাস বদলানো যায়।
অ্যাংয়ের কাছে বড় বাড়ি ছেড়ে ছোট ঘরে আসা কোনো অবনমন নয়। বরং প্রয়োজন অনুযায়ী ঠিক মাপের জীবন বেছে নেওয়া।
শেষ জীবনের জন্য ‘স্বপ্নের বাড়ি’
৬৫ বছর বয়সী অ্যাঞ্জি লাম ও তার ৬৮ বছর বয়সী স্বামী ফিলিপ ইয়োহও বড় বাড়ি বিক্রি করে দুই কক্ষের ফ্ল্যাটে উঠছেন। তাদের তিন সন্তানই বড় হয়ে নিজেদের জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় দম্পতি মনে করেছেন, এখন ছোট ও সহজে রক্ষণাবেক্ষণযোগ্য ঘরই তাদের জন্য বেশি উপযোগী।
তারা এক মিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলারের বেশি দামে আগের বড় বাড়ি বিক্রি করে কভান এলাকায় দুই কক্ষের ফ্ল্যাট নিয়েছেন। ৪০ বছরের জন্য ফ্ল্যাটটির পেছনে খরচ হয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার ডলারের কম। তবে নতুন ঘর সাজাতে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৭০ হাজার থেকে ৮০ হাজার ডলার।
অ্যাঞ্জির কাছে এটি শুধু নতুন ঠিকানা নয়। তিনি এটিকে জীবনের শেষ বাড়ি হিসেবে সুন্দর, আরামদায়ক ও পরিচ্ছন্ন করে তুলতে চান। নতুন ঘরে যাওয়ার প্রস্তুতিতে বহু বছরের জমিয়ে রাখা জিনিসপত্রও বাদ দিয়েছেন তিনি।
প্রবীণদের আবাসনে নতুন ভাবনা
সিঙ্গাপুরে দুই কক্ষের নমনীয় মেয়াদের ফ্ল্যাট চালুর উদ্দেশ্য ছিল প্রবীণ ও ছোট পরিবারের জন্য তুলনামূলক সহজ আবাসনের সুযোগ তৈরি করা। ৫৫ বছর বা তার বেশি বয়সীরা প্রয়োজন অনুযায়ী ১৫ থেকে ৪৫ বছরের মেয়াদ বেছে নিতে পারেন।
চাহিদাও কম নয়। ২০২৬ সালের জুনের আবাসন আবেদনে ২ হাজার ২৮৭টি দুই কক্ষের নমনীয় মেয়াদের ফ্ল্যাটের বিপরীতে আবেদন পড়েছিল ৮ হাজার ৯৮৫টি।
২০২৬ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে এ ধরনের প্রায় ২০ হাজার ফ্ল্যাট দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যা আগের তিন বছরের তুলনায় প্রায় অর্ধেক বেশি।
তবে এই পরিসংখ্যানের পাশাপাশি আরও একটি পরিবর্তন স্পষ্ট হচ্ছে—প্রবীণদের ছোট ঘর এখন আর কেবল প্রয়োজনের আবাসন নয়। এটি হয়ে উঠছে ব্যক্তিত্ব, আরাম, নান্দনিকতা ও স্বাধীন জীবনযাপনের প্রতিফলন।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবন ছোট করে ফেলার বদলে অনেকেই এখন অপ্রয়োজনীয় জায়গা কমিয়ে জীবনের প্রয়োজনীয় আনন্দগুলোকে বড় করে তুলছেন। ছোট ফ্ল্যাটে তাই ঘর কম হলেও স্বপ্নের পরিমাণ কমছে না।
ছোট ফ্ল্যাটে বড় স্বপ্ন—সিঙ্গাপুরের প্রবীণদের এই নতুন জীবনধারা দেখাচ্ছে, অবসরের ঘরও হতে পারে রুচি, আরাম ও স্বপ্নের ঠিকানা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















